বিশেষ প্রতিনিধি
‘ছয় মাস খেত কাম করছি, অখন কোন গুছাত ধান বাড়াইছে, কোনটাত বাড়াইছে না, গত কয়েকদিন ধইরা জমিনের দিকে চাইয়া চাইয়া কাটাইছি, আর ছয় সাত দিন গেলেই ধান কাটা গেল নে, সকালে ঘুম থাকি উইট্টা গিয়া দেখি সব খেত ডুবি গেছে। ঋণ কইরা ৩৫ হাজার টেকা আইন্না খেত করছি, অখন ঋণ কিলা দেই, খাইয়া বাঁচি কেমনে।’ সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার ডুবে যাওয়া ছোট কানলার হাওরপাড়ের বিরামপুরের কৃষক জাহাঙ্গীর আলম আফসোস করতে করতে এমন কথা বলছিলেন। হাওরপাড়ে দাঁড়িয়ে একইভাবে হা—হুতাশ করছিলেন একই গ্রামের সুজাত মিয়া নামের আরেক কৃষক।
ফসল হারিয়ে হাওরপাড়ে দাঁড়িয়ে কাঁদছিলেন ষাটোর্ধ্ব পারভিন বেগম। বললেন, ‘অখন বাইচ্ছা—কাইচ্ছা লইয়া খাইয়া বঁচতাম কিলা’।
স্থানীয় কৃষকদের দাবি ছোট কানলার হাওরে দুই থেকে তিন’শ হেক্টর জমি আছে। কোন ধানই পাকেনি। সোমবার সকালে সুরমা নদীর পানি অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে বড় কানলার হাওরের এই অংশে (ছোট কানলা) ঢুকেছে।
এই নিয়ে গত তিনদিনের উজানের ঢলে (ভারতের মেঘালয়— চেরাপুঞ্জি থেকে নেমে আসা পানিতে) কয়েকটি ছোট হাওর ডুবেছে। হাওরগুলো হচ্ছে, তাহিরপুরের টাঙ্গুয়া, সুনামগঞ্জ সদরের ছোট কানলা এবং ছাতকের গুয়া পাকুয়া, শাল্লার বাঘার হাওর ও কলার হাওর। পারভিন বেগমের মতোই চোখের পানি ঝরাচ্ছেন এসব হাওরপাড়ের কৃষক কৃষাণীরা।
উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ী ঢলে সুনামগঞ্জে নদীর পানি হাওরের বিপদ সীমা ছুঁই ছুঁই করছে। সোমবার বিকাল ৬ টায় সুনামগঞ্জ শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া সুরমা নদীর পানি ষোলঘর পয়েন্টে বিপদসীমার দশমিক ২৪ সেন্টিমিটার নীচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। ওই পয়েন্টে নদীর পানির উচ্চতা ছিল ৫.৮১ সেন্টিমিটার। ২০১৭ ইংরেজির পর গত কয়েক বছর নদীর পানি চার এপ্রিলে এমন উচ্চতায় প্রবাহিত হয় নি।
নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় জেলার বড় ৪২ টি হাওরসহ ছোট বড় প্রায় দেড়শ’ বোরো ফসলের হাওর হুমকিতে পড়েছে। দিরাইয়ের বরাম হাওর, তাহিরপুরের গুরমা এক্সটেনসন, মাটিয়ান হাওর, বিশ^ম্ভরপুরের করচা, জামালগঞ্জের হালির হাওরসহ সীমান্ত উপজেলার নদী তীরবর্তী হাওরের ফসল রক্ষা নিয়ে উদ্বিগ্ন কৃষক। অসময়ে নির্মিত দুর্বল বাঁধ নিয়ে উৎকণ্ঠা আরো বেশি কৃষকদের।
সোমবার বিকালে শাল্লা উপজেলার বাঘার হাওরে নদীর পানি প্রবেশ করে। কৃষকদের চোখের সামনেই ডুবে যায় জমির ধান। এই হাওরে ৮০ ভাগ জমি চাষাবাদ করেন দামপুরের কৃষকরা। কিছু জমি রয়েছে খল্লি গ্রামের কৃষকদের।
খবর পেয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবু তালেব, ভাইস চেয়ারম্যান দিপু রঞ্জন দাস, কৃষি অফিসের লোকজন হাওরে যান। কিন্তু পানির প্রবল ে¯্রাতের কারণে বাঁধ রক্ষা করা যায় নি ।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, সোমবার বিকালে শাল্লার দাড়াইন নদীতে ৬ ইঞ্চি পানি বেড়েছে। ২—৩ দিন এভাবে পানি বাড়লে ছোট ছোট অনেক হাওর তলিয়ে যাওয়ার আশংকা রয়েছে। এই হাওরগুলো হচ্ছে শাল্লা সদরের জোয়ারিয়া, কৌইয়া, কোনারবন, পুইট্টা, নাইপতার চর।
শাল্লা উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান দিপু রঞ্জন দাস বলেন, বাঘার হাওরটিকে রক্ষা করা যায় নি। নদীর পার নিচু হওয়ায় পানির প্রবল চাপে বাঁধ ভেঙে যায়। এই হাওরে ৪—৫শ’ একর জমি ছিল বলে কৃষকরা জানিয়েছেন।
শাল্লা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আবু তালেব বলেন, নদীর পানি দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় বাঘার হাওরটি পানিতে তলিয়ে গেছে। হাওরটি রক্ষার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করেও পারা যায় নি।
বিশ^ম্ভরপুরের করচার হাওরপাড়ের পদ্মনগরের কৃষক সুবল দেব নাথ এবার নিজের ২০ একর জমির মধ্যে ১৪ একর চাষাবাদ করেছেন। অন্য জমি বর্গা দিয়েছেন।
বললেন, তিনদিন ধইরা ঘুম নাই। দেখতে দেখতে পানি বাড়ি যার। দৌখনাল বাতাসে মেঘ লইয়া যার মেঘালয়ের পাহাড়ে, পাহাড়ে বৃষ্টি দের—এই বৃষ্টির পানি রক্তি (রক্তি নদী) বায়দি নামের। দেড় হাত পানি বাড়লে সকল আপর বান্দেদি (আফর বাঁধ উপচে) পানি ঢুকবো। ইবার আপর বান্দে মাটিও কম দিছে।’
কৃষক সুবল দেব নাথ বললেন, এবার গোছায় ধান বেরুতেও বিলম্ব হয়েছে। ফাল্গুনের মধ্যভাগে বৃষ্টি না হওয়ায় ধান বেরুতে বিলম্ব হয়।
এই উপজেলার আঙ্গারুলি সোনার হাওরপাড়ের কৃষক মো. শাহিদ মিয়া বললেন, আঙ্গারুলি সোনার হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধের মাটি বইছে না (বসে নি), মার্চের মাঝামাঝি সময়ে কাজ করায় এই অবস্থা হয়েছে। আঙ্গারুলি নদী দিয়ে যেভাবে পাহাড়ী ঢলের পানি নামছে, সকলে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ—পরিচালক বিমল কুমার সোম বললেন, উজানের ঢলে নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে এই পর্যন্ত তিনটি ছোট হাওর ডুবেছে। হাওরগুলো হচ্ছে সুনামগঞ্জ সদরের ছোট কানলার হাওর, তাহিরপুরের টাঙ্গুয়া এবং ছাতকের গুয়া পাকুয়া হাওর। এই তিন হাওরে ১০৫ হেক্টর জমি ডুবেছে বলে জানান তিনি। শাল্লার ছোট দুটি হাওরে পানি ঢুকছে জানিয়ে ওখানে কি পরিমাণ ফসল ডুবেছে তা মঙ্গলবার জানাতে হবে। জেলায় এবার দুই লাখ ২২ হাজার ৮০৫ হেক্টর জমিতে বোরো চাষাবাদ করে ১৩ লাখ ৫২ হাজার ২২০ মে.টন ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
সুনামগঞ্জ পাউবো’র নির্বাহী প্রকৌশলী জহুরুল ইসলাম জানান, সুনামগঞ্জের উজানে ভারতের চেরাপুঞ্জি—মেঘালয়ে ভারী বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় সুনামগঞ্জের নদীগুলোতে পানি বেড়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় সুনামগঞ্জে বৃষ্টি হয়েছে মাত্র চার মিলিমিটার, কিন্তু ভারতের চেরাপুঞ্জিতে বৃষ্টি হয়েছে ১৫২ মিলিমিটার। এই বৃষ্টির পানি নীচের দিকে নামছে । সুনামগঞ্জে নদীর পানি ঘণ্টায় ঘণ্টায় বাড়ছে। সুরমা নদীর সুনামগঞ্জ পয়েন্টে হাওরের বিপদ সীমা ৬.০৫ সেন্টিমিটার। সোমবার বিকাল ৬ টায় ওই পয়েন্টে পানির উচ্চতা ছিল ৫. ৮১ সেন্টিমিটার।
জেলা প্রশাসক জাহাঙ্গীর হোসেন সোমবার দুপুরে জেলা হাওর রক্ষা বাঁধ নির্মাণ ও মনিটরিং কমিটির জরুরি সভায় হাওরের বাঁধ রক্ষায় নিয়োজিত প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সদস্যসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে ফসল রক্ষা বাঁধে অবস্থান নেবার নির্দেশ দিয়েছেন।