বিশেষ প্রতিনিধি ও আমিনুল ইসলাম
গুরমার বর্ধিতাংশের বাঁধটি শেষ পর্যন্ত রক্ষা হলো না। ধর্মপাশা ও তাহিরপুরের হাজারো কৃষকের পাকা—আধাপাকা ধান ডুবে সারা বছরের স্বপ্ন ভেঙে গেলো। রোববার বিকাল সাড়ে তিনটায় টাঙ্গুয়া হাওরের ওয়াচ টাওয়ারের পাশের অংশ ভেঙে হাওরে এমন বিপর্যয় দেখা দেয়। গত ১৫ দিন ধরে গুরমার বর্ধিতাংশের এই বাঁধটি রক্ষার চেষ্টা করছিলেন স্থানীয় কৃষক, জনপ্রতিনিধিসহ প্রশাসনের দায়িত্বশীলরা।
গুরমা বর্ধিতাংশের বাঁধে ১৩ টি পিআইসি এবার বাঁধের কাজ করেছে। বরাদ্দ ছিল প্রায় আড়াই কোটি টাকা। এই বাঁধে ফসল রক্ষা হয় তাহিরপুর উপজেলার নোয়াল, গলগলিয়া, পানা, বলাইচাতল, উলান, জিনারিয়া, মানিকখিলা, গায়েরকিত্তা এবং ধর্মপাশা—মধ্যনগর উপজেলার কলমা ও হুরি বিলের। বাঁধটি গুরমার হাওরের মুল বাঁধটিকেও সুরক্ষা দেয়। রোববার সকালে হঠাৎ করে বাঁধের একাংশ দেবে উপর দিয়ে পানি প্রবেশ করতে থাকে। হাওরে পানি প্রবেশ শুরু হলে নিরুপায় হয়ে যান বাঁধের কাজে থাকা কৃষকসহ সংশ্লিষ্ট সকলেই। কৃষকরা বাঁধ ছেড়ে হাওরের দিকে ছুটতে থাকেন, জমিতে থাকা নিজের পাকা ধান ঘরে তুলে আনার চেষ্টা ছিল তাদের। সেই চেষ্টাও বৃথা যায়। কিছুক্ষণের মধ্যে ভেসে যায় হাওর।
হাওরপাড়ের পাঠাবুকা, ভবানীপুর, সন্তোষপুর, মানিকটিলা, রামসিংহপুর, লামাগাঁও, উক্তিয়ারগাঁও, নোয়াগাঁও, বলাইকান্দি, গোলাভারি, গাঞ্জাইল, মোয়াজ্জেমপুরসহ অসংখ্য গ্রামের কৃষকরা এসময় আহাজারি— হা—হুতাশ করতে থাকেন।
সন্তোষপুরের কৃষক রণি সরকার বললেন, ১৫ দিন ধরে বাঁধে কাজে ছিলাম। আগামীকাল (সোমবার) জমির পাকা ধান কাটবো ঠিক করে রাখি। এরমধ্যেই বাঁধটি (রোববার) ভেঙে সারা বছরের কষ্ট বিফলে যায়। এখন কিভাবে সারা বছর খেয়ে বেঁচে থাকবো।
এই গ্রামের রতন সরকার জানালেন, গত দুদিন ধরেই চিন্তা করছিলাম আধাপাকা ধানই কেটে নেবো। কিন্তু বাঁধের অবস্থা খারাপ হওয়ায় ওখানে কাজে ছিলাম। এখন বাঁধও গেছে, গেছে ধানও। বললেন, অখন গাঁও ছাইড়া টাউনে যাওন লাগবো, নাইলে কাম (কাজ) পাইতাম নায় খাইয়ার অভাবে বাঁচতাম নায়।
মোয়াজ্জেমপুরের কৃষক প্রভাত সরকার বললেন, ফসল কাটা শুরু হয়েছিল কেবল, এরমধ্যেই কপাল ভাঙলো আমাদের।
এই বাঁধটি ২০১৭ সালের প্রলয়ংকরীর বন্যার আগে পর্যন্ত নির্মাণ হতো ইউনিয়ন পরিষদের আর্থিক সহায়তায়। একসময় উন্নয়ন সংগঠন সিএনআরএস’এর আর্থিক সহায়তায়ও বাঁধটি নির্মাণ করেছেন কৃষকরা। চারদিন আগে বাঁধ রক্ষার কাজে থাকা কৃষকরা বলেছিলেন, বাঁধটি নদীর পাড়ঘেষে করায় এই বিপদ হয়েছে। নির্মাতাদের ভুলে হাজারো কৃষকের ঘুম হারাম হয়েছে।
রামসিংহপুরের কৃষক তারা মিয়া বলেন, বাঁধটি পাড়ের অংশ থেকে ক্রমেই সরিয়ে নদীর দিকে আনা হয়েছে। যাতে স্লোপের অংশের মাপ নেয়ার সময় বেশি মাটি দেখাতে পারে। নদীতে পানি আসার পরই বাঁধ দেবে যায়। বিপদ হয় আমাদের। বাঁধের পিআইসি ও যারা তদারকির দায়িত্বে ছিল তাদের বিচার হওয়া জরুরি।
কৃষকরা জানালেন, বাঁধে ধস ও ফাটল দেখা দেবার পর যেভাবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তর্ারা এসেছেন বাঁধ নির্মাণের সময় সেভাবে তাদের দেখা যায় নি।
স্থানীয় দক্ষিণ শ্রীপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আলী আহমদ মুরাদ বললেন, তিন এপ্রিল থেকে বাঁধ রক্ষার লড়াই শুরু করেছিলাম। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং জেলা প্রশাসকসহ জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারাও আমাদের সঙ্গে ছিলেন। শেষ পর্যন্ত পারলাম না। রোববার সকালে বাঁধের ২৭ নম্বর পিআইসির অংশ দেবে যায়। প্রথমে উপর দিয়ে পানি প্রবেশ শুরু হয়। কয়েকঘণ্টা এভাবে পানি যেতে যেতে বিকাল সাড়ে তিনটায় বাঁধটি ভেঙে ডুবে যায় হাওর।
রোববারও বাঁধ রক্ষার লড়াইয়ে উপস্থিত ছিলেন প্রশাসনের কর্মকর্তারা। জেলা স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ—পরিচালক জাকির হোসেন বললেন, বাঁধটি রক্ষার জন্য গত ১৫ দিন হয় দিনে রাতে পালাক্রমে অবস্থান ছিল জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ সকলের। কিন্তু শেষপর্যন্ত টেকানো গেলো না বাঁধ। জানালেন, অন্য বাঁধগুলো রক্ষার চেষ্টা করছেন তারা।
গেল তিন দিনে উজানে (মেঘালয় ও চেরাপুঞ্জি) ও সুনামগঞ্জে বৃষ্টি হওয়ায় নদীর পানি বেড়েছে। রোববার সুনামগঞ্জ শহরের ষোলঘর পয়েন্টে সুরমার পানি হাওরের বিপদসীমার মাত্র ১৭ সেন্টিমিটার নীচ দিয়ে ৫. ৮৮ সেন্টিমিটার উচ্চতায় যাচ্ছিল।
এদিকে, নদীর পানি বাড়ায় তাহিরপুরের শনির হাওরের বৈজ্ঞানি স্লুইস গেট দিয়ে পানি চঁুইয়ে হাওরে প্রবেশ করছে। জগন্নাথপুরের বেতাউকা খালের বাঁধে ফাটল দেখা দিয়েছে। জামালগঞ্জের মহালিয়া হাওরের হিজলা পাশ^র্বর্তী বাঁধের বুরুঙ্গা দিয়ে পানি চুঁইছে। শাল্লার বরাম হাওরের ২৪,২৫ ও ২৬ ও ভান্ডা বিলের ১২ নম্বর পিআইসির বাঁধ এবং ছায়ার হাওরের শাল্লা সেতু হতে মুক্তারপুর সেতু পর্যন্ত বাঁধ নিয়ে উৎকণ্ঠায় রয়েছেন কৃষকরা।