- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

অঞ্চল আলোকিত করার স্বপ্নে বিভোর তারা

বিশেষ প্রতিনিধি
তাঁরা শিক্ষা সংগ্রামী। অভাব অনটনের সংসারের খরচ চালাতে টিউশনি করছে, আবার দেশের স্বনামধন্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনাও চালিয়ে যাচ্ছে। এবার রমজানের ছুটিতে বাড়িতে এসে এলাকার তিন ইউনিয়নের প্রায় দুই’শ শিক্ষার্থীকে ১৫ দিন ফ্রি পড়াচ্ছে। সুনামগঞ্জ জেলা শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া সুরমার উত্তরপাড়ের ১৩ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর উদ্যোগে খুশী উত্তরপাড়বাসী। এলাকায় প্রশংসায় ভাসছে এই তরুণরা।
জেলার সীমান্ত জনপদ সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার সুরমা, জাহাঙ্গীরনগর ইউনিয়নের বাসিন্দাদের বেশিরভাগেই কিশোরগঞ্জ, কুমিল্লা, ময়মনসিংহসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মাইগ্রেশন বা অভিপ্রায়ণ করে এখানে এসে বসতি স্থাপন করেছেন বহু আগে থেকেই। এখানকার বাসিন্দাদের সংগ্রামী মানুষ হিসেবেই চিনেন সুনামগঞ্জ জেলাবাসী। একসময় ওই অঞ্চলে শিক্ষার হার ছিল একেবারেই কম। এখন সেই দুর্নাম গুছিয়ে নিয়েছেন পরিশ্রমী মানুষদের সন্তানরা। ওখানকার গ্রামে গ্রামে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেছে। এলাকায় ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, পুলিশ ও সিভিল প্রশাসনের উচ্চপদে কাজ করছেন অনেকে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আছেন বিভিন্ন গ্রামেই।
এই শিক্ষা সংগ্রামীদের ১৩ জনের উদ্যোগ নিয়ে উত্তর সুরমাজুড়েই আলোচনা আছে।
এলাকার ইসলামপুর এলাকার বাসিন্দা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাপ্লাইড ক্যামিকেল এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী কাওসার আহমদ, ভৈষারপাড়ের বালুচর এলাকার বাসিন্দা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী সামসুল আলম, ভৈষারপাড় এলাকার বাসিন্দা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও বিচার বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আহমেদ কবির হৃদয়, একই এলাকার বাসিন্দা শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^ বিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী এসএম তরিকুল ইসলাম, ঢালাগাঁওয়ের বাসিন্দা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী কাজী যোবায়ের আহমদ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী এলাকার তেরাপুর গ্রামের বাসিন্দা সারোয়ার হোসেন শাওন, বেলাবর হাটির বাসিন্দা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও বিচার বিভাগের তয় বর্ষের শিক্ষার্থী আতিক উল্লাহ্, স্থানীয় কুমিল্লাপাড়া-নারায়ণতলার বাসিন্দা সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্য বিজ্ঞান অনুষদ’এর চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী জহিরুল ইসলাম, নারায়ণতলার বাসিন্দা হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী সাইফুল ইসলাম, ঝরঝরিয়ার বাসিন্দা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী নোমান আহমদ, ইসলামপুরের বাসিন্দা সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে বিএসসি সম্পন্ন করে বের হওয়া শিক্ষার্থী কামরুজ্জামান ভুঁইয়া, বৈষাড়পাড়ের বাসিন্দা বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ বিদ্যা বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী আসক আলী, বেরিগাঁওয়ের বাসিন্দা শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী জাহিদুল ইসলামই ফ্রি-সেমিনার’এর উদ্যোক্তা। নিজ এলাকাকে আলোকিত করার স্বপ্নে বিভোর তারা।
এলাকার মধ্যবর্তী স্থান মতিউর রহমান কলেজে ২০ রমজান থেকে শুরু হয় ফ্রি-সেমিনার। কলেজের ইতিহাসের শিক্ষক মো. মাঈনুদ্দিন ও এলাকার মেডিকেল কলেজের আরেক শিক্ষার্থীও (নাম প্রচার না করতে অনুরোধ করেছেন) এই আয়োজনে সার্বক্ষণিক সহযোগিতা করেছেন।
উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, এলাকার বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া অন্য শিক্ষার্থীরা যোগাযোগ রাখছেন, ঈদের ছুটিতে বাড়িতে ফিরলেই এখানে ক্লাস নেবে তারা।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এই আয়োজনের অন্যতম উদ্যোক্তা কাওসার আহমেদ বললেন, পাঁচ ভাইবোনের সংসারে আমি সবার। এইচএসসিতে ভর্তি হবার পরই টিউশনি শুরু করেছিলাম। এলাকায় সামান্য বেতনে ছাত্র পড়িয়েছি। এখন রাজশাহীতে টিউশনি করে নিজের খরচ চালাই। পরিবারের খরচ মেটাতেও দিনমজুর বাবাকে সহযোগিতা করতে হচ্ছে। গেল বছর রমজানের ছুটিতে বাড়িতে আসলে, কিছু শিক্ষার্থী পড়তে আসে। আমি একাই তখন ‘ফ্রি’ পড়িয়েছি তাদের। এবার রমজানের ছুটিতে বাড়ি ফেরার আগে ১৫ দিন ফ্রি-সেমিনার করার আকাঙ্খা পুষণ করে একটা ভিডিও ক্লিপ ফেসবুকে পোস্ট করেছিলাম। আমি ও সামসুল আলমের আইডি থেকে সেটি পোস্ট করা হয়। ওখান থেকেই ব্যাপক সাড়া পেয়ে উৎসাহিত হই আমরা।
প্রথম দিকে নবম দশম শ্রেণির ইংরেজি গণিত এবং একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির আইসিটি ও ইংরেজি বিষয়ে দুই ঘণ্টার করে ১৫ দিনের ফ্রি- সেমিনার করার কথা জানিয়েছিলাম আমরা। এখন অন্যান্য বিষয়েও ক্লাস নেওয়া হচ্ছে। ২০ রমজানে প্রথম ক্লাসে এলাকার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ১৮০ জন শিক্ষার্থী অংশ নেয়। এখন গড় উপস্থিতি আছে ১৫০ জনের মত শিক্ষার্থী। আমাদের সঙ্গে এলাকার ১৩ জন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী প্রথমে যুক্ত হলেও আগামী দুই দিনের মধ্যে আরও শিক্ষার্থী এসে যুক্ত হতে পারেন। এলাকার বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া অন্যরাও ফোনে জানিয়েছে, তারা এই উদ্যোগে সামিল হতে চায়।

উত্তর সুরমার ফ্রি সেমিনারের উদ্যোক্তা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আহমেদ কবির হৃদয় বললেন, আমাদের এলাকার শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট পড়ার সুযোগ কম-আর্থিক অসঙ্গতিও আছে। ফ্রি- সেমিনার করার ঘোষণা দেবার পর ব্যাপক সাড়া মিলে। এলাকার শিক্ষার্থীদের আগ্রহ দেখে আমার মনে হয়েছে নিজের অঞ্চলকে আলোকিত করার এই উদ্যোগে আমিও সামিল হই।
শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তরিকুল ইসলাম বললেন, ভৌগলিক কারণেই আমরা পিছিয়ে। মেধা থাকলেও অনেক শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পারছে না। এই অবস্থায় এলাকার শিক্ষার্থীদের উচ্চ শিক্ষার পথ দেখাতে সাহস দিতেই এখানে যুক্ত হওয়া। আমাদের পরে এলাকার জুনিয়র ভাইয়েরা এখানে ঠিক একইভাবে ছুটির দিনে ফ্রি-সেমিনার সহ নানা উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে যাবে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী কাজী যোবায়ের আহমদ বললেন, এলাকার শিক্ষার্থীদের অনেকে ইংরেজি ভয় পায়। আমরা যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজির শিক্ষার্থী তারা এলাকার ছোট ভাই বোনদের ইংরজি ভীতি দূর করে দেবার চেষ্টা করছি।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সরোয়ার হোসেন শাওন বললেন, আমরা যখন এই এলাকা থেকে পড়াশুনা করেছি, তখন অনেক সুযোগই ছিল না। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার পরও প্রশ্ন করতে সাহস করতাম না। আমাদের চেষ্টা থাকবে আমাদের ছোট ভাই বোনেরা যাতে এমন সমস্যায় না পড়ে। উচ্চ শিক্ষার সুযোগ থেকে যাতে তারা বঞ্চিত না হয়।
ফ্রি- সেমিনার’এর শুরু’র দিন থেকেই এখানে এসে অংশ নিচ্ছে মঙ্গলকাটার বাসিন্দা সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী শুভ রহমান। বললো, আইসিটি ও ইংরেজির প্রত্যেকটি ক্লাসই ভালো লেগেছে তার। ক্লাসে তারা বেশি বেশি প্রশ্ন নিয়েছেন, পরে উত্তরে সেটি ভালো করে বুঝিয়ে দুর্বলতা’র দিক বুঝিয়েছেন। একই ধরণের মন্তব্য করলো ইসলামপুরের বাসিন্দা সুনামগঞ্জ সরকারি মহিলা কলেজের এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মার্জিয়া বেগম।
এলাকার কোণাগাঁওয়ের বাসিন্দা বাংলাদেশ মেডিকেল এসোসিয়েশন (বিএমএ’র) সুনামগঞ্জ জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক ডা. নুরুল ইসলাম বললেন, উদ্যোগটির খবর পেয়ে একদিনের ছুটি নিয়ে সিলেট থেকে ওখানে গিয়ে অভিভূত হয়েছি। উদ্যোক্তাদের সকলেই সাধারণ পরিবারের সন্তান। ইউনিভার্সিটি পড়ুয়া এসব তরুণরা কেউ পড়াচ্ছে ইংরেজি, কেউ হিসাব বিজ্ঞানের জটিল হিসাব-নিকাশ, কেউ সহজ করে বুঝিয়ে দিচ্ছে গণিত আবার কেউ উচ্চ শিক্ষার স্বপ্ন বুননের সহজতর উপায় নিয়ে কথা বলছে। আমার মনে হয়েছে অবহেলা বঞ্চনার শিকার উত্তর সুরমার স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীদের উচ্চ শিক্ষার পথ প্রদর্শক এসব তরুণরদের জয় হবেই।

  • [১]