ইয়াকুব শাহরিয়ার, দ.সুনামগঞ্জ
ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে ইতোমধ্যে পিছিয়ে নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। এজন্য নির্বাচনী প্রচারণায় অনেকটা ভাটা পড়েছে দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার ৮ ইউনিয়নেই। তবে, ভাটা পড়েনি কথিত মোবাইল সাংবাদিকদের ‘সাক্ষাৎকার বাণিজ্যে’। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান, মেম্বার কিংবা মহিলা মেম্বার পদে প্রার্থীতা ঘোষণা করেছেন এমন ব্যক্তিদের ‘টার্গেট’ করে ফোনে কল দেন ‘কতিপয় মোবাইল সাংবাদিক’। একবার ফোন রিসিভ না করলে আরেকবার, এমনকি অর্ধশতবার ফোন করে বিড়ম্বনায় ফেলছেন প্রার্থীদের। ফোনে সাড়া না দিলে না জানিয়েই হাজির হচ্ছেন প্রার্থীদের বাড়িতে। বাড়িতে না পেলে দোকানে। যেখানে পারছেন প্রার্থীদের পাকরাও করে ফেসবুক লাইভে প্রচার করছেন সাক্ষাৎকার। বিনিময়ে নিচ্ছেন ‘তেল খরচের’ নামে টাকা। এতে বিরক্ত হচ্ছেন প্রার্থীরা। এই অত্যাচারের কারণে মূল ধারার সাংবাদিকরা প্রার্থীদের তথ্য জানতে ফোন দিলে বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার পশ্চিম পাগলা ইউনিয়নে গত এক সপ্তাহ ধরে চলছে ফেসবুক লাইভ নামক এমন মোবাইল সাংবাদিকতার তা-ব! ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান জগলুল হায়দার, স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থী শাহিন মিয়া, ইউনিয়ন নির্বাচনে একাধিক মেম্বার পদপ্রার্থী ও বর্তমান মেম্বারদের স্বাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছে একটি অখ্যাত ফেসবুক টেলিভিশন।
সাক্ষাৎকার দেওয়া একাধিক ব্যক্তিদের সাথে কথা বলে জানা যায়, সাক্ষাৎকার নিতে আসা ব্যক্তিরা সকাল থেকেই মোবাইল ফোনে তাদের টার্গেটকৃত প্রার্থীদের ফোন দেওয়া শুরু করেন। প্রথমবার ফোন রিসিভ করার পর আর ফোন রিসিভ না করলে ক্রমাগত কল দিতে থাকেন তারা। এতেও সাড়া না মিললে প্রার্থীকে না জানিয়েই মানুষকে জিজ্ঞেস করতে করতে প্রার্থীর বাড়িতে হানা দেন কথিত ঐসব সাংবাদিকেরা। পরে সাংবাদিকতার কোনো নিয়মের তোয়াক্কা না করে আঞ্চলিক ও চলিত ভাষা মিশেলে চলে নানা রকমের আজগুবি প্রশ্নত্তোর পর্ব। আর এসব সাক্ষাৎকার ফেসবুকে প্রকাশের পর ভিডিও দেখে তত্ত্ব ও তথ্যের চেয়ে বিনোদনই বেশি পান ফেসবুক ব্যবহারকারীরা। এতে বিচলিত খোদ্ সাক্ষাৎকার দেওয়া ব্যক্তিরাও। তারা বলেন, আমাদের জেলা-উপজেলায় পরিচিত ভালো টিভি চ্যানেল ও পত্রিকার সাংবাদিক থাকতে এরা কারা এসে আমাদের পাগল করে সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন? পরে আবার তেল খরচও দিয়ে দিতে হয়!
পশ্চিম পাগলা ইউনিয়নে নৌকা প্রতীক প্রত্যাশী উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক নেতা বদরুল আলম টিপু বলেন, এরা কোত্থেকে যে আমাদের নাম্বার পায়? গত কয়েকদিন দিন ধরে আমাকে ফোন করছে। আমি বলেছি- ভাই, আমি সাক্ষাৎকার দিতে প্রস্তুত নই। দয়া করে আমাকে আর কল দিবেন না। সময় আসলে দেখা যাবে।
একই ঘটনায় তিক্ততা প্রকাশ করেছেন সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প প্রার্থী শাহিন মিয়া। তিনি দৈনকি সুনামগঞ্জের খবরকে বলেন, ফেসবুক ভিত্তিক একটি টিভি চ্যানেলের দু’একজন সাংবাদিক আমাকে কয়েকদিন ধরে ক্রমাগত ফোন করছেন। আমি বুঝতে পেরেছিলাম এরা মূলধারার সাংবাদিক নন। তাই দেখা করতে আগ্রহী ছিলাম না। আমার এক বন্ধুর মাধ্যমে এরা আমাদের বাড়ি চলে আসায় বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছিলাম।
পশ্চিম পাগলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নূরুল হক বলেন, আমাকে কয়েকদিন ধরে ফেসবুক সাংবাদিকরা ফোন দিচ্ছেন। আমি তাদেরকে সাক্ষাৎকার দেবো না বলার পরও যোগাযোগ করেই যাচ্ছেন।
দক্ষিণ সুনামগঞ্জ প্রেসক্লাবের সভাপতি, দৈনিক উত্তরপূর্ব ও এনটিভি ইউরোপের দক্ষিণ সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি কাজী জমিরুল ইসলাম মমতাজ বলেন, সংবাদ প্রচার হোক এটা অবশ্যই ইতিবাচক একটা দিক। এতে সাংবাদিকতার নীতিমালা মেনে হতে হবে। নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে সাংবাদিকতা কাম্য নয়। যারা এমনটা করছেন তাদেরকে অবশ্যই একটি নীতিমালার ভিতর আনার জন্য সংশ্লিষ্ট সকলকে অনুরোধ করছি।
সুনামগঞ্জ সচেতসন নাগরিক কমিটির সহ-সভাপতি এ্যাডভোকেট খলিল রহমান বলেন, নীতি-নৈতিকতা ও সাংবাদিকতার ইথিক্স’র ভিতরে থেকেই সাংবাদিকতা করা উচিৎ। ইদানিং লক্ষ করা যাচ্ছে একটি মহল সাংবাদিকতার এসব ধারার তোয়াক্কা না করে এই পেশাটাকে হেয় করছে। এজন্য সংশ্লিষ্ট সকলেকে সজাগ থাকতে হবে। এসব কতিপয় সাংবাদিক ও প্রচারমাধ্যমকে সাংবাদিকতার নীতিমালার আওতায় আনতে হবে। সেই সাথে যে সকল ব্যক্তিরা এমন প্রচারমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন তারাও সচেতন হতে হবে।
সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হায়াতুন নবী বলেন, আমরা খোঁজ খবর নিয়ে বিভিন্ন থানার অফিসার ইনচার্জদের সাথে কথা বলে এবং আইনের বিষয়টি দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।