- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

অনবদ্য সংগীত রচনায় বৈষ্ণব কবি রাধারমণ দত্ত

তুলিকা ঘোষ চৌধুরী
বর্ণে শব্দে সাদা কাগজের বুকে আঁচর কেটে কত শত কথা লিপিতে গাঁথা  হয়। ভাগ্যগুণে  কেউ কথাগুলো বাধাই করেন মোড়কে। কিন্তু যে সুর গেঁথে থাকে হৃদয়ের গহীনে তা সময়কে জয় করে, আলোড়ন তোলে হৃদয় থেকে হৃদয়ে।
তেমনি সাধনায় নিমগ্ন থেকে ও ভাবের সমুদ্র থেকে বৈষ্ণব কবি রাধারমণ দত্ত হাজারো মনি-মানিক্য, অকাতরে বিলিয়েছেন ভক্তদের মাঝে। ১৯ শতকের এক ক্ষণজন্মা  সংগীত ব্যক্তিত্বের নাম শ্রী রাধারমণ দত্ত পুরকায়স্থ।
আবহমান  বাংলার ধামইল গানের রচয়িতা এবং সহজিয়া দর্শনের দিকপাল কবি রাধারমণ দত্ত সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার আতুয়াজান পরগনার অন্তর্গত কেশবপুর নামক গ্রামে ১৮৩৩ মতান্তরে ১৮৩৪ সালে (১২৪০ মতান্তরে ১২৪১ বঙ্গাব্দ) বিখ্যাত দত্ত পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। বৈষ্ণব কবি রাধারমণ দত্ত এক সমুদ্রের মত, তাকে ধারণ করতে পারে না ভূমি। জনশ্রুত যে, রাধারমণ দত্ত কোন গান কাগজে কলমে লিপিবদ্ধ করেননি কখনও, মানুষের অন্তরে গভীর সুরের ঢেউ তাঁর সংগীতকে লোক থেকে লোকান্তরে পৌঁছে দিয়েছে। লোক সংগীতের বিশাল ভান্ডার জুড়ে তাঁর সৃষ্টি শতবছরের সীমানা পেরিয়েও রয়ে গেছে অব্যয়- অক্ষয়। বাংলাদেশের ৬৪ টি জেলার একটি সুনামগঞ্জ। এবং ফোকলোরের মূল্যবান ভান্ডার আমাদের এ অঞ্চল। জলজ প্রকৃতির আধার সুনামগঞ্জের দিগন্ত বিস্তৃত জলধার, সুনীল আকাশ, হিজল করচের ছায়া, মাঠে বুকে দখিনা হাওয়ার মাতম এ জনপদকে করেছে গানের পাখি এবং লোক সংস্কৃতির সমৃদ্ধ সম্ভারে সুশোভিত।
সুরমা- কালনি, যাদুকাটা- নলজুর, বিবিয়ানা সহ অসংখ্য নদী আর টাঙ্গুয়ার হাওর সহ সহ¯্রাধিক হাওরের বর্ণিল সমাবেশ মাটি ও মানুষকে দিয়েছে আলাদা স্বাতন্ত্র। এখানে তাই মরমি সাধকদের মেলা বসেছে। এরা অনেকেই আপন মনে গান রচনা করেন সুর দেন। কে রাখে তাঁদের খবর। কবিগুরু হাছনরাজার কথা উল্লেখ করায় বিশ্ববাসী জানতে পেরেছে অন্তত একজনকে।
কিন্তু এখানে আছেন শতাধিক মরমি কবি, যাঁদের সৃষ্টিসুধা কালের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ। তাঁদেরই একজন মরমী কবি রাধারমণ। তিনি প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসে সৃষ্টি করেন প্রায় ৩ হাজার গান। সব গান ছড়িয়ে আছে ভক্তদের, শিষ্য প্রশিষ্যদের মুখে মৃুখে। তাই অনেকটা হারিয়ে গিয়েছে লিপিবদ্ধ না থাকায়। তার ভিতরে সহ¯্রাধিক গান যে উদ্ধার করা গিয়েছে তাতে বিস্ময়ে অভিভূত হতে হয়। অসাধারণ বৈচিত্র্যপূর্ণ সে গানের ভান্ডার। এখানে মিলবে মহাসগরের কল্লোল, আকাশের রংধনু, ফিনিক ফোটানো জোছনা। ভালোবাসার ফুল, বজ্রচেরা রাত্তির আকুলতা, বাঁশির মনমাতানো মুর্চ্ছনা। রাধারমণ বাংলা ও সংস্কৃত ভাষায় রচনা করছেন কৃষ্ণলীলা কাব্য, পদ্ম পূরাণ, গোবিন্দ ভোগের গান, ভ্রমরপ্রীতি, ভারত সাবিত্রী ইত্যাদি। তার মাতার নাম শ্রী মতী সুবর্ণা দেবী। পিতা শ্রী রাধামাধব দত্ত। কবির স্ত্রীর নাম শ্রীমতি গুনময়ী দেবী। তাঁদের ৪ ছেলে, রাসবিহারী দত্ত, নদীয়া বিহারী দত্ত, রসিক বিহারী দত্ত, বিপিন দত্ত, নদীয়া বিহারী দত্ত, রসিক বিহারী দত্ত, বিপিন বিহারী দত্ত। অকালে মৃত্যুবরণ করেন তাঁর তিন পুত্র এবং স্ত্রী। স্ত্রী এবং পুত্র বিয়োগের পর রাধারমণ দত্ত সংসার ত্যাগী হন। ১২৯০ বঙ্গাব্দে তিনি সংসার জীবন অসার ভেবে মৌলভীবাজার এর ইটা পরগনার ঢেউপাশা গ্রামের প্রখ্যাত বৈষ্ণব গুরু রঘুনাথ ভট্টাচার্য্যরে নিকট দীক্ষা লাভ ও তার শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। শুরু হয় আর এক নতুন অধ্যায়। তিনি সৃষ্টিকর্তার স্বরূপ অনুসন্ধানে আত্মনিয়োগ করেন। তারই ধারাবাহিকতায় রঘুনাথ ভট্টাচার্যের শিষ্যত্ব গ্রহণের পর তিনি তাঁর জন্মস্থান জগন্নাথপুর উপজেলার নলুয়ার হাওয়ের তীরে আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন। সেখানে ধ্যানমগ্ন অবস্থায় বহু গান রচনা করেছেন। রাধারমণের গানের বৈচিত্র অনন্য সাধারণ। প্রার্থনা, গুরুতত্ত্ব, সহজিয়া, পূবর্রাগ, অনুরাগ, মনঃশিক্ষা, বিরহসহ নানা বৈচিত্র্যে তাঁর সৃষ্টি ঈর্ষা জাগানিয়া। শত শত গানে সাহিত্যমূল্য অত্যন্ত উচুঁমানের, শব্দ বিন্যাসে কবি দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। কবি রাধারমনকে কেউ বলেন বাউল কবি, কেউ বলেন বৈষ্ণব কবি, কেউ বলেন লোককবি। আমি বলি আমার প্রাণের কবি। কবি পরলোক গমন করেন ২৬ কার্তিক ১৩২২ বঙ্গাব্দে। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল প্রায় ৮২ বছর। কবির নিজের তো কিছু পাবার নেই, কিন্তু কবিকে সম্মান জানিয়ে আসুন আমরাই সম্মানিত হই, হই আলোকিত, আগামী প্রজন্মকে সুনামগঞ্জের এক ক্ষণজন্মা পুরুষের সাথে পরিচিত করে তুলি। যার সৃষ্টিকর্ম সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষায় অনবদ্য ভূমিকা পালন করছে এবং করবে পরম্পরায়।
লেখক: কণ্ঠশিল্পী ও শিক্ষক।

  • [১]