কেডি নাথন
তখন ঝটপট জবাবটা বলে দিয়েছিলেন, এখন বেশ পস্তাচ্ছেন, মেয়েটা যদি অন্য কিছু করে বসে এ নিয়ে হরনাথ বাবু বেশ চিন্তিত ।
হরনাথ বাবুর বয়েস ষাট ছুঁই ছুঁই, স্ত্রী গত হয়েছেন দুবছর হল, কিন্তু হরনাথ বাবু সেই তাগড়া জোয়ান বলা যায় ।
তার এখনও টানটান চামড়া, বিন্দুমাত্র অসুখ নেই তার শরীরে, চুল আর সুন্দর গোঁফ খানা যেন সেই ত্রিশ বছরের হরনাথই রয়ে গেছে, কোন কিছুই নষ্ট হয়নি । চোখে কেবল একটা চশমা, তবে ততো পাওয়ারেরও নয় ! তার স্ত্রীর ছোটখাটো অসুখ ছিল বলাটাও ভুল হবে, নানারকম পরীক্ষা নিরীক্ষা করেও কোন অসুখ ধরা পড়েনি, দিন দিন শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাচ্ছে !
যেদিন তাঁর স্ত্রী মারা যায় সেইদিন রাতে প্রবল ঝড় হয়েছিল, গাছের ডালপালাগুলি যেন এপাশ থেকে ওপাশে দৌঁড়তে লাগলো, উঠোনে জমতে লাগলো কড়িকাঠ মরা ডালপালা আর শুকনো পাতা । ছেলে তার বউ নিয়ে বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে, তখন থেকেই তারা তিনজনের পৃথিবীটা আলাদা হতে শুরু করেছে তার উপর গীতির অসুখ ধরা পড়ছে না !
বাদলা দিনে আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টি যেমন মাটিতে আছরে পড়ে, তাঁর বেলায় যেন পুরো আকাশটাই মাথায় এসে পড়লো ঠিক এমন অবস্থা !
মায়ের অসুস্থতা জানিয়ে ছেলেকে টেলিগ্রাম করা হয়েছে, কোন উত্তর আসেনি !
বাংলার কাকেরা বোধহয় বিলেতের ঠিকানা জানেনা ,নয়তো ঠিকই জবাবটা পৌঁছে যেত।
সেই রাতটা হরনাথ বাবু কেবল আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিলেন,আর মনে মনে কষ্ট গুনেছেন।
একটাই ছেলে ছিল ছেলেকে মানুষ বানানোর স্বপ্ন, মাকে নিজে থেকে চাকরি করে একখানা শাড়ি এনে দেবে, আর কোন স্বপ্ন নয় !
এই স্বপ্নটা ছিল আসলে গীতির, কিভাবে যে গীতির সব স্বপ্নগুলি তাঁর হয়ে যেতো !
কিন্তু আজ গীতি থেকে সে কতদূর।
চেয়ারে বসে বসে, বিকেলের মেয়েটার কথাই মনে পড়ছে!
কি আজবরে বাবা ,পা ছুঁয়ে কেন তাকে ভক্তি করলো কে জানে !
বিড়বিড় করে বলতে লাগলো স্যার আপনার কাছে কিছু কথা লুকিয়ে রাখতে এসেছি,,,আপনি আমাকে চিনেন না !
জবাবে বলছেন,,,, কি কথা ?
মেয়েটি বললো,,,,অনেক কথা ! আর লুকোবেইবা কেন ?
মেয়েটির চেখে মুখে ভয় লজ্জা আর বিস্ময় খেলা করছে,তিনি মেয়েটিকে বললেন রাস্তার মাঝে এখন কথা বলতে হবে না ,বাসায় আসো ।
মেয়েটির বয়স আঠাইশ,নাম ইরা ।
লাগছে মেয়েটি বেশ বুদ্ধিমান ,,
একসাথেই বাসায় আসলেন, তাকে বসার ঘরে বসতে বললেন হরনাথ।
মেয়েটি হঠাৎ বলে উঠলো, স্যার পানি খাব ।
হরনাথ বাবু আসলে আগে শিক্ষকতা করতেন, তাই সবাই মাষ্টারদা মাষ্টারদা বলে ডাকে, মেয়েটির জন্য নিজে কাঁচের গ্লাসে এক গ্লাস পানি নিয়ে এলেন।
বাইরে প্রচন্ড রোদ বেলা তখন আড়াইটা বাজে রাস্তার মোড়েই প্রথম এই মেয়েটার সাথে দেখা !
মেয়েটি এবার বলতে লাগলো,, জানেন স্যার আপনাকে কেন যেন আমার বেশ অসহায় মনে হয় !
হরনাথ বাবু স্বাভাবিক কথায়ই কপাল কুচকানোর স্বভাব তাই তিনি এই অস্বাভাবিক কথাটিতে কপাল কোচকালেন।
তিনি বললেন আমি অসহায় ? তাই নাকি?
কেন? আর কিভাবে,বলতো ?
মেয়েটা খানিকটা হাসলো, হাসিটা দারুনই বলা যায় !
মেয়েটির হাসিতে খানিকটা কষ্টের গন্ধও পাওয়া যায়।
মেয়েটি বললো, আচ্ছা স্যার আপনি খোলা মাঠের খালি বেঞ্চিতে গিয়ে বসে আকাশ দেখেন কেন?
আপনি পুকুর পাড়ে জলের গন্ধ মাখেন কেন?
আপনি কচিঘাসে খালি পা টা কেন ছুঁয়ান ?
আপনি চশমা খুলে আকাশপানে কেন কাঁদেন?
আমার এসবের উত্তর কি আমি পাব?
হরনাথ ভড়কে গেলেন, উত্তর দিলেন না !
সত্যিই মেয়েটি নিশ্চই তাকে বেশ কয়েকবছর ধরে ফলো করছে, এটা হয়তো মাত্র কয়েক বছর না,অনেক বছর ধরে !
হরনাথ বাবু খানিকটা কেশে বললেন, কেন এসেছো সেটা বল ? কোন দরকার? বা কোন কিছু নিতে এসেছো ?
মেয়েটি বলছে দেখুন স্যার আমি আপনাকে প্রশ্ন করেছি, উত্তর দিলে দেবেন নয়তো দেবেন না ! প্রশ্ন করবেন না (কথাটিতে রাগ জড়িত আছে এটা স্পষ্ট)
তিনি খানিকটা এদিক ওদিক তাকিয়ে বলছেন না আসলে আমার কোন কষ্ট নাই ! কষ্ট একটাই শূন্যতা কেন যেন আমাকে কামড়ে কামড়ে খায় এটা ছেলেবেলা থেকেই । যাকগে বাদ দাও এসব, তোমার কথা বল ! তুমি কি কর ? তোমার নামটাইতো জানা হলনা ?
ইরা শান্তভাবে জবাব দিলো,আমি ইরা, বয়েস আঠাইশ, আমি বাংলা সাহিত্যে অনার্স চতুর্থ বর্ষে পড়ছি, তখন হরনাথ বাবু খেয়াল করেননি,
ইরা ঠিক গীতির মতই হাতে তাঁতের চুড়ি পরেছে !
হরনাথ বাবু বললেন, তা এখানে আমার সাথে কি উদ্দেশ্যে কথা বলা, ব্যাপারটা বুঝলাম না ?
ইরা স্পষ্ট দেখছে, সহজ সরল মানুষটিকে !
এইমানুষটা বেশ কয়েকবছর ধরে স্ত্রীকে বাঁচানোর জন্য নিজের সর্বস্ব দিয়ে ফেলেছে, শুধু প্রাণটাই বাকি ছিলো !
প্রানটা না হয় ইরার জন্য রইলো।
ইরা জানেনা কেন যেন এইমানুষটকে সে দশবছর আগে ভালোবেসে ফেলেছে,,,,,,,,
সহজ সরল চলাফেরা, সব কিছু সুন্দর করে দেখার ইচ্ছা ।
মানুষটি যেন তার কাছে বিশেষ কিছু,,,
যখন সময় পেয়েছে তখনই মানুষটিকে ভেবেছে !
রিক্সা থেকে নেমে দশবছর আগের বসন্তের সন্ধ্যের সময় যখন রাস্তা ধরে একা একা হাঁটছিল তখন সে, খোলামাঠের দিকে তাকিয়ে দেখেছে একটা মানুষ চিৎকার করে বলছে, কবিতাটির কথা যেন এমন ছিল।
“আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টিধারা,
কদমস্নানে গঙ্গাপাড়া !
লাল ফড়িংয়ের শেষ বিকেলে,
হারিয়ে যেও আবার তবে,,
সন্ধ্যে যখন রাত্রি হবে,
ধার করব গ্রহতারা বু তুমি এসো, জড়িয়ে ধরে বাসবে ভাল
ক্লান্ত জীবন হৃদয় খুঁজে… আবার তুমি এসো !
প্রসঙ্গ পাল্টালো ইরা। বললো,,,আচ্ছা স্যার আপনি কি গান গাইতে পারেন?
হরনাথবাবুর প্রথমে খানিকটা বিরক্তি লেগেছিল,,এখন মেয়েটির সাথে কথা বলতে ভালই লাগছে ! মেয়েটির পরনে সবুজ জমিনের শাড়ি নয়,
একটা সবুজ জামা,,, লাগছে গীতি যেমন সবুজ শাড়ি পরতো ঠিক তেমনই শাড়ি পরেছে,,,,সবুজ জামা কিভাবে শাড়ি হয়ে গেলো হুট করে…..!
মেয়েটিকে তিনি জিজ্ঞেস না করে পারলেন না ! আচ্ছা তুমি শাড়ি পরতে পারো….?
মেয়েটি জবাব দিল, শাড়িই তো পড়েছি স্যার !
তিনি বললেন, খারাপ লাগছে না ভালই লাগছে ।
মেয়েটি এবার বললো,,,,,না স্যার আমি আসলে জামা পড়েছি শাড়ি না !
আপনার চোখের চশমাটা পাল্টাতে হবে,,,,,,,!
হরনাথ বাবু জবাব দিলেন,,,আমিতো স্পষ্টই দেখলাম তুমি শাড়ি পরেছো,,,আর তুমিইতো বললে যে শাড়ি পরেছো,,,তবে?