- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

অনেক কৃষক পরিবারে এবার কুরবানি হচ্ছে না

শহীদ নূর আহমদ
মুসলমান ধর্মাম্বলীদের দুটি ঈদের মধ্যে ইদুল আযহার তাৎপর্য ও গুরুত্ব অপরিসীম। এই ঈদে সামর্থ্যবানরা ধর্মীয় রীতি অনুসারে পশু কুরবানি করে থাকেন। হাওরাঞ্চলের বিত্তবান কৃষকরা ঘরে তুলা ধান বিক্রি করে গরু বা ছাগল কিনে অশেষ সোয়াব লাভের জন্য  কুরবানি দেন। কিন্তু এবার বোরো মৌসুমের শুরুতেই অকাল বন্যায় জেলার সকল হাওরের ফসল তলিয়ে যাওয়ায় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন জেলার উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত, নি¤œবিত্ত থেকে প্রান্তিক কৃষক পরিবার।
গেল বছর বাছাইকৃত পছন্দের গরু উচ্চ মূল্যে কিনে কুরবানি দিয়েছেন এমন অনেক পরিবারও এবার আর্থিক সংকটের কারণে কোরবানি দিবেন না। ঈদুল আযহাতে হাওরাঞ্চলে এমন অবস্থা এর আগে কখনো হয়নি এমন কথাও বলেছেন সামর্থবান কৃষকেরা।
দিরাই উপজেলার জগদল ইউনিয়নের জগদল গ্রামের কৃষক আকুল মিয়া। প্রতিবছর আড়াই থেকে তিনশ’ মন ধান গোলায় তুলতে পারেন। ধানের আয় থেকেই পরিবারের ব্যয় ও ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানের খরচ চালান তিনি। এই ধানের আয় থেকেই প্রতিবছর কুরবানি দিতেন আকুল মিয়া। গেল বোরো মৌসুমে ১৬ কেয়ার জমি চাষ করলেও অকাল বন্যায় হাওর তলিয়ে যাওয়ায় একমুঠো ধানও ঘরে তুলতে পারেননি এই বনেদি কৃষক। খেতের ফসল হারিয়ে পরিবারের জীবিকা নির্বাহ নিয়ে বিপাকে আছেন আকুল মিয়া। গত কুরবানির ঈদে ৩০ হাজার টাকা ব্যয়ে একটি গরু কুরবানি দিলেও এবার তা হচ্ছে না। ফসল ঘরে না উঠা ও হাতে টাকা না থাকায় কুরবানি’র সামর্থ্য হারিয়েছেন ধর্মপরায়ণ কৃষকরা। কুরবানি না দিতে পেরে আক্ষেপ করে আকুল মিয়া বলেন, ‘প্রতিবছর কুরবানি দেই। কিন্তু এবার ফসল তলিয়ে যাওয়ায় হাত একেবারে শূন্য । ঋণ করে কুরাবানি দিলে কুরবানি হয় না। তাই এবার কুরবানি দিতে পারছি না। ১৬ কেয়ার জমি চাষ করেছিলাম। একমুটো ধান তুলতে পারিনি। ফসল ঘরে তুলতে পারলে কুরবানি দেয়া থেকে বিরত থাকতাম না।
একই উপজেলার রাজানগর ইউনিয়নের আরেক কৃষক শিহাব উদ্দিন। বললেন, ‘অকাল বন্যায় তলিয়েছে ১ হাল জমির ফসল। ফসল তলিয়ে যাওয়ায় পরিবার পরিচালনায় হিমসিম খেতে হচ্ছে। কুরবানি দেবার মতো টাকা আমার নেই। ফসল তলিয়ে যাওয়ায় আমার মতো গ্রামের অনেকেই কুরবানি দিতে পারবেন না।’
গত কুরবানির ঈদে ৩৫ হাজার টাকায় গরু কিনে কুরবানি দিয়েছিলেন শনির হাওর পাড়ের বাসিন্দা বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার ফতেহপুর ইউনিয়নের অবসরপ্রাপ্ত  শিক্ষক মো. সিরাজুল ইসলাম। বছর দুয়েক হলো অবসরে গেছেন।  কিন্তু পেনশন ভাতা এখনও পাননি।  ১ ছেলে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিন হয় বেকার অবস্থায় আছে।  অকাল বন্যায় শনির হাওরে থাকা দেড় হাল জমির ফসল তলিয়ে যাওয়ায় আর্থিক সংকটে এই পরিবারটি । অভাবের মধ্যে থাকায় এবার কুরবানি না দেবার সিদ্ধান্তের কথা জানালেন সিরাজুল ইসলাম ।
সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘প্রতিবছর কুরবানি দিয়েছি, কিন্তু এবছর পরিবারের খরচ চালানোই দায়। নিজে অবসরে গেছি। ছেলেও টাকা পাঠায় না। পরিবারের খরচ ও অন্যান্য ব্যয় জমির আয় দিয়ে নির্বাহ হতো, এবারতো এক কেয়ার জমিও কাটতে পারিনি।  কুরবানি না দিতে পেরে খুব খারাপ লাগছে। প্রতিবছর আত্মীয় স্বজনকে গোস্ত পাঠিয়েছি, এবার সেটি করতে পারবো না চিন্তা করে খারাপ লাগছে।’
সদর উপজেলার গৌরারং ইউনিয়নের রেজাউল করিমের  ১০ হাল (৪০ একর) জমি অকাল বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। বৃহৎ পরিমাণ জমির ফসল হারিয়ে  টানাপুরণে যাচ্ছে দিনকাল। পারিবারিকভাবে প্রতিবছরই গরু কুরবানি দিলেও এবার এককভাবে কুরবানি দেওয়া হচ্ছে না তাদের। সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এলাকার কয়েকজন মিলিত হয়ে কুরবানি দেওয়ার।’
এই অবস্থা সুনামগঞ্জের সব কয়টি উপজেলার হাওরপাড়ের গ্রামগুলোতে। কৃষকরা বলেছেন, এবার ঈদুল আযহা আনন্দে বয়ে আনেনি হাওরপাড়ে।

  • [১]