বিশেষ প্রতিনিধি
শহরের কমপক্ষে এক হাজার গ্রাহক অনৈতিকভাবে এসি (এয়ার কন্ডিশনার) ব্যবহার করছেন। বিদ্যুৎ বিভাগও এদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নিচ্ছে না। এমনকি অভিযানও পরিচালনা করতে পারে না। এরা রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে প্রভাবশালী হওয়ায় এদের সংযোগও স্থানীয় বিদ্যুৎ বিভাগ বিচ্ছিন্ন করতে পারে না। এমনকি নোটিশও প্রদান করে না। মাঝে-মধ্যে অভিযান চালালেও নিরীহ এসি ব্যবহারকারী গ্রাহকদের সতর্ক করে দেওয়া হয় বা আবেদন করিয়ে কিলোওয়াট বাড়ানোর ব্যবস্থা করানো হয়। এসি ব্যবহারকারীদের সহযোগিতা করে বিদ্যুৎ অফিসেরই কিছু অসাধু কর্মচারী। এসি ব্যবহারকারী এই গ্রাহকদের জন্য শহরের কমপক্ষে ৭ হাজার গ্রাহককে ভোগান্তি পোহাতে হয়।
বিদ্যুৎ অফিসের দায়িত্বশীলরা জানান, সুনামগঞ্জ শহরে প্রায় ১০ হাজার বিদ্যুৎ গ্রাহক রয়েছেন। এদের প্রায় সকলেই বিদ্যুৎ লাইন নেবার সময় ২ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ ব্যবহারের আবেদন করে বিদ্যুৎ নিয়েছেন। এই গ্রাহকদের মধ্যেই অনৈকভাবে এসি ব্যবহার করছেন কমপক্ষে এক হাজার গ্রাহক। একটি এসি ব্যবহার করতে ৪ কিলোওয়াট বিদ্যুতের প্রয়োজন। এসি ব্যবহার করতে হলে সেই অনুযায়ি আবেদন করতে হয়। কিন্তু শহরের অনেক প্রভাবশালী রাজনীতিক, ব্যবসায়ী, চাকুরিজীবী, জনপ্রতিনিধি, আইনজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণি পেশার গ্রাহক রয়েছেন যারা অনুমতি বা বাসা বাড়ির বিদ্যুতের কিলোওয়াট না বাড়িয়েই এসি ব্যবহার করছেন। এ কারণে জাতীয় গ্রীড লাইন থেকে বিদ্যুৎ পেলেও অতিরিক্ত লোডে ট্রান্সফরমার বিকল হয়ে গত কয়েকদিন ধরেই দিন-রাত মিলে ১৫ থেকে ২০ বার বিদ্যুৎ আসা যাওয়ার যন্ত্রণা সইতে হয় মধ্য শহরের গ্রাহকদের।
একদিকে ছাতক-সুনামগঞ্জের জরাজীর্ণ ৩৩ কেভি বিদ্যুৎ লাইনে গরম বাড়লে এবং বৃষ্টি বা বজ্রপাত হলেই লাইনে ত্রুটি দেখা দিয়ে সঞ্চালন বন্ধ হয়ে যায়। অন্যদিকে অনৈতিকভাবে এসি ব্যবহারের কারণে পৌর এলাকার হাজীপাড়া, নতুনপাড়া, ষোলঘর, আলফাত স্কয়ার, পশ্চিম বাজার, কাজীর পয়েন্ট, হোসেন বখ্ত চত্বর ও ময়নার পয়েন্ট এলাকার ট্রান্সফরমার বার বার বিকল হচ্ছে। ট্রান্সফরমার বিকল হলে সংশ্লিষ্ট এলাকার বাসিন্দাদের দুর্দশার শেষ নেই। গরম ও বিদ্যুৎ যন্ত্রণায় যেন ওষ্ঠাগত প্রাণ।
বিদ্যুৎ অফিসের একজন প্রকৌশলী বলেন, ‘অবৈধ এসি ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না অনেক দিন ধরেই। একইভাবে ওয়ার্কশপসহ বিদ্যুৎ চালিত অনেক দোকানেই অবৈধভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার হচ্ছে। ২ কিলোওয়াটের অনুমতি নিয়ে ব্যবহার হচ্ছে ৮ মেগাওয়াট। এ কারণে একেকটি ট্রান্সফরমারের ২ কিলোওয়াটের ১০০ গ্রাহক চালানোর ক্ষমতা থাকলেও, গ্রাহকদের কেউ কেউ এসি ব্যবহার করায় ট্রান্সফরমার লোড টানতে পারছে না। অতিরিক্ত লোড হওয়ায় প্রায়ই ভেতরে থাকা ৩ টি তারের যে কোনটি গলে যাচ্ছে বা পুড়ে যাচ্ছে। এই পুড়ে যাওয়া তার মেরামত না করা পর্যন্ত পুরো এলাকার গ্রাহকদের অন্ধকারে থাকতে হচ্ছে’। এই প্রকৌশলীর মতে মধ্য শহরের ট্রান্সফরমার হওয়া প্রয়োজন যেখানে ১০০ গ্রাহক আছে, সেখানে ২০০ গ্রাহক চালানোর ক্ষমতা সম্পন্ন ট্রান্সফরমার বসিয়ে দেওয়া। কিন্তু সুনামগঞ্জ শহরের কোথাও অতিরিক্ত লোড বহনের ক্ষমতা সম্পন্ন ট্রান্সফরমার লাগানো নেই।
সুনামগঞ্জ বিদ্যুৎ বিভাগের প্রকৌশলী মো. কামরুজ্জামানকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি স্বীকার করেন প্রায় এক হাজার গ্রাহক অনুমতি ছাড়া অর্থাৎ লোড বাড়ানোর আবেদন ছাড়া এসি ব্যবহার করছেন। এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না কেন? এমন প্রশ্নের জবাবে কামরুজ্জামান বলেন,‘এরা সবাই প্রভাবশালী, কারো বিরুদ্ধে অভিযান হলে দায়িত্বশীল জনপ্রতিনিধিসহ প্রভাবশালীরাও ফোন দেন। এ কারণে আমরা কিছুই করতে পারি না’।
এই বিষয়গুলো জেলা উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির সভায় বা সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন কখনো, এই প্রশ্নের উত্তরে কামরুজ্জামান বলেন,‘জেলা উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির পরবর্তী সভায় এ বিষয়ে কথা বলবো আমি’।