নিরীহ দরজি কারিগর পর্যন্ত রেহাই পাচ্ছে না জঙ্গী গোষ্ঠীর হাত থেকে। গোপালগঞ্জের সাধুকে হত্যা করার পর টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার নিরীহ দর্জি কারিগর নিখিল চন্দ্র জোয়ার্দারকে নিজের দোকান থেকে ডেকে নিয়ে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে ও গলা কেটে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। আমেরিকান সাইট ইন্টিলিজেন্সের প্রচার মতে এই হত্যাকা-ে আন্তর্জাতিক মুসলিম সন্ত্রাসী সংগঠন আইএস জড়িত, যেরকম দেশের প্রায় প্রতিটি এরকম হত্যাকা-ে আইএস জড়িত বলে সাইট ইন্টিলেজেন্সে তথ্য প্রকাশ রীতিতে পরিণত হয়েছে। আইএস জড়িত থাকুক কিংবা না থাকুক সেটি বড় কোন বিষয় নয় সাধারণ মানুষের জন্য। মানুষের জন্য সবচাইতে বড় উদ্বেগের জায়গাটি হলো এরকম অচিহ্নিত ঝটিকা হত্যাকা-। হত্যাকারীরা প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই নিজেদের অভিন্ন পরিচয়ের ছাপ রাখছে। তারা বেছে বেছে হত্যা করছে সেইসব ব্যক্তিকে যারা ধর্ম বিশ্বাস কিংবা বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে ভিন্ন মতাবলম্বী। হন্তারকরা একই কায়দায় হঠাৎ এসে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে গোষ্ঠীটি নিজেদের অস্তিত্বের পরিচয় দিয়ে যায়। কিন্তু দুই বছর যাবত এরকম হত্যাকা- একের পর এক ঘটিয়ে আসলেও তাদের কোন পরিচয় উদঘাটনে ব্যর্থ হয়েছে শক্তিশালী রাষ্ট্র ব্যবস্থা। এই অনুঘাটনের ফলে জেঁকে বসেছে বায়বীয় আইএস জুজু। আমেরিকা গলা ফাটিয়ে তারস্বরে যত আইস’র অস্তিত্ব প্রমাণে মরিয়া আমাদের সরকার তত শক্তিশালীভাবে এটি অস্বীকার করে চলেছে। এই বাদানুবাদের সাথে মৃত্যুর মিছিল কেবল দীর্ঘই হচ্ছে। কে জানে এর শেষ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে। রহস্য উপন্যাসগুলোতে সিরিয়াল কিলিং এর রোমাঞ্চকর কাহিনী পাওয়া যায়, বাংলাদেশে ভিন্ন মতাবলম্বীদের নির্বিচারে ঠা-া মাথায় হত্যা করা ওই ধরনের সিরিয়াল কিলিংয়ের মতোই। যারা হত্যাকা-গুলো ঘটাচ্ছে তারা রীতিমতো প্রশিক্ষিত, উৎসর্গীকৃত, অস্ত্র ও অর্থ সমৃদ্ধ সর্বোপরি বিশাল নেটওয়ার্ক রয়েছে এদের। নতুবা ঝড়ের বেগে কোত্থেকে এসে হত্যাকা- ঘটিয়ে কোথায় হাওয়ায় মিলিয়ে যায় তা সরকারের বড় বড় এজেন্সি বের করতে পারছে না, এরকমটি হতে পারত না। সাধারণের নির্লিপ্ততাও দৃষ্টিকটুরকমভাবে প্রকাশিত। হত্যাকারীরা কোন আড়াল আবডাল রাখছে না। প্রকাশ্যে জনসমক্ষেই হত্যাকা- ঘটাচ্ছে তারা। কিন্তু কেউ বাধা দেওয়ার সাহস পাচ্ছে না। এই দুর্বৃত্তরা ক্রমশ রাষ্ট্রের চাইতে শক্তিশালী হিসাবে নিজেদের পরিণত করতে চাইছে। একটি স্বাধীন ও স্বার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্য এরকম অবস্থা সাংঘাতিক বেমানান বটে।
রাষ্ট্র যেসব কারণে অকার্যকর হয় তার অন্যতম হলো রাষ্ট্রের সদাসর্বদা সজাগ দৃষ্টি এড়িয়ে অন্তরালের কোন শক্তি যদি প্রাধান্য বিস্তার করে ফেলে। বাস্তবত তথাকথিত ধর্মীয় জঙ্গীগোষ্ঠী হিসাবে সন্দেহভাজন ওই হত্যাকারীরা আজ বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অস্তিত্বের জন্য সর্বপ্রধান হুমকি। এক/দুই জন অধ্যাপক, কয়েকজন মুক্তমনা, বেশ কিছু ধর্মীয় ভিন্ন মতাবলম্বী আর কিছু নিরীহ ধর্মীয় সংখ্যালঘু হত্যাকা- হয়তো সংখ্যাতাত্ত্বিক বিচারে কিংবা দেশে খুনখারাবির বাৎসরিক পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে যৎসামান্য। কিন্তু এটি যে একটি রাষ্ট্রের অস্তিত্বকে অস্বীকার করে অন্য একটি শক্তি বর্বর নির্মমতায় স্থান করে নিতে চাইছে সেটি হলো আসল উদ্বেগের জায়গা। জানি না রাষ্ট্র এ বিষয়ে কতোটা সচেতন রয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য থেকে অনুমিত হয় তিনি খুব বেশি উদ্বিগ্ন নন। কিন্তু সাধারণ নাগরিক হিসাবে আমরা এতে মোটেই নিশ্চিত হতে পারছি না।
আমরা সবার আগে চাই হত্যাকারী এবং তাদের মদদদাতাদের প্রকৃত পরিচয় জনসমক্ষে উদঘাটিত হোক। অপরাধীকে চিহ্নিত করা সম্ভব হলে এই অপশক্তিকে নির্মূল করা তেমন কঠিন হবে না। লুকোচুরির পরিবর্তে সরকারকে বরং জনগণকে প্রকৃত সত্য অবহিত করে জনগণের সহায়তায় এই অপশক্তি নির্মূলে সচেষ্ট হতে হবে।