গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত একটি সংবাদ থেকে জানা যায়, শুক্রবার রাতে পুলিশের অভিযানে জেলার তাহিরপুর ও দোয়ারাবাজার উপজেলা থেকে ১৯ জন জুয়াড়িকে আটক করা হয়েছে। আটক ১৯ জনের মধ্যে দুইজন নির্বাচিত ইউপি সদস্য রয়েছেন। এরা হলেন সদর উপজেলার রঙ্গারচর ইউনিয়নের ৩ নং ওয়ার্ডের সদস্য শওকত আলী ও দোয়ারাবাজারের মান্নারগাঁও ইউনিয়নের ৪ নং ওয়ার্ডের সদস্য সাব্বির আহমদ। অস্বাীকার করার উপায় নেই যে, দেশে নানা নামের ও প্রকারের জুয়া খেলার যথেষ্ট উপস্থিতি রয়েছে। বালক, যুবক ও বৃদ্ধদের অনেকে হরেক রকম জুয়ার নেশায় অভ্যস্ত। শহর গ্রাম সর্বত্রই এর প্রবল প্রতাপ। তাস, পাশা ধরনের সনাতনী জুয়ার পাশাপাশি এখন অনলাইনের বিভিন্ন অ্যাপসেও জমজমাট জুয়ার আসর বসে। রয়েছে খেলাকেন্দ্রিক জুয়া প্রবণতা। তরুণ যুবক সম্প্রদায়ের সর্বনাশের অন্যতম কারণ হলো এইসব জুয়া। জুয়া খেলায় আসক্তির কারণে টাকা সংগ্রহ করতে যেয়ে অনেক জুয়াড়ি অপরাধ কর্মকাণ্ডের সাথে যুক্ত হয়ে পড়ে। সামাজিক অপরাধ বৃদ্ধির পিছনে জুয়া আসক্তিকে বহুলাংশে দায়ী করা যায়। বহু পরিবার ধ্বংস হয়ে যায় পরিবারের জুয়াসক্ত সন্তানের সর্বনাশা কর্মকাণ্ডে। সবচাইতে উদ্বেগের বিষয় হলো জুয়া খেলার সাথে সম্পর্কিত হয়ে পড়েছেন সমাজের দায়িত্বশীল ও নেতৃত্ব দানকারী ব্যক্তিবর্গও। আলোচ্য সংবাদসূত্রে দুই ইউপ সদস্যকে জুয়ার আসর থেকে আটক করার ঘটনা এর বড় প্রমাণ। আমাদের সামাজিক অধঃপতন কোথায় গিয়ে ঠেকেছে তার একটি মানদণ্ড হতে পারে এ ঘটনা।
আমরা সর্বাবস্থায় উন্নত নৈতিকতার ব্যক্তিদেরই জনপ্রতিনিধিত্বের আসনে দেখতে পছন্দ করি। কিন্তু তা কি পাওয়া যায়? স্থানীয় সরকারের নিম্ন পর্যায়ের দুই সদস্য হয়তো তাসের আসর থেকে আটক হয়েছেন কিন্তু একটু সচেতনভাবে পর্যবেক্ষণ করলেই দেখা যাবে, জনপ্রতিধিগণের একটি অংশ এখন নানা ধরনের অনৈতিকতার সাথে যুক্ত হয়ে পড়েছেন। সমাজে নেতৃস্থানীয় এবং সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত ব্যক্তিগণ যখন ভালো কোনো দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারেন না তখন সেই সমাজ যে অন্ধকারের গহ্বরে ঢুকে পড়বে তাতে আর আশ্চর্য কি। এর নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া একটি সমাজের সব জায়গায় পড়তে বাধ্য। আমরা মুখে নীতিকথার ফুলঝড়ি ছুটাই। অন্যকে উপদেশ দানে একেবারে আদর্শবানের পরাকাষ্ঠায় পরিণত হই। কিন্তু নিজেরা এর কোনো কিছুই পালন করি না। তখন এইসব নীতিকথা হাস্যকরই হয়ে উঠে না বরং রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য ভয়ংকর ক্ষতিকর প্রপঞ্চে পরিণত হয়। আমাদের চারপাশে এখন দৃষ্টান্ত দেয়ার মত চরিত্র কমতে কমতে নাই হয়ে যাচ্ছে। কাকে দেখে শিখবে মানুষ? এই ঘাটতি দূর করা সুকঠিন বটে।
ব্যক্তির মানস গঠনে রাষ্ট্রের আর্থ—সামাজিক চরিত্রের সরাসরি সম্পর্ক বিদ্যমান। আজ যখন কিছুটা ক্ষমতা আছে এমনসব মানুষের মন্দ আচরণ ছাড়া আমরা কিছুই দেখতে পাই না তখন বুঝতে পারি রাষ্ট্রকাঠামোটিও নীতি—নৈতিকতাযুক্ত সমাজ গঠনের উপযুক্ত নয়। অথচ আমরা একটি ন্যায়ানুগ সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশায় একাত্তরে দেশটি স্বাধীন করেছিলাম। কার্যত এখন দেখা যাচ্ছে দেশটি যথেচ্ছারের স্বাধীনতা ভোগ করার ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। এ থেকে অবশ্যই আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। এজন্য সমাজের সর্বস্তরে প্রতিটি মানুষকে এখন সব ধরনের অন্যায় অপকর্মের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। কথায় আছে অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে তব ঘৃণা তারে তৃণ সম দহে। অন্যায়কে সহ্য করে নির্বিকার থাকার যে বিনাশী মানস গড়ে উঠেছে তার পরিবর্তন করে এ সবের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে। তবেই শান্তি আসবে পরিবারে, সমাজে ও রাষ্ট্রে। তখন এমন জুয়াসক্ত ব্যক্তিরা আর জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ পাবেন না। আমরাও জুয়ার আসর থেকে জনপ্রতিনিধি আটকের মতো দুর্ভাগ্যজনক সংবাদের পাঠক হব না।