- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

অন্য ভাবনা…

বিদ্যুৎ সমাচার
সুখেন্দু সেন
অনেক অনেক দিন আগে কোন এক শুভক্ষণে বেঞ্জামিন ফ্লাংকলিন যখন মেঘের দেশের এই চমকিত বস্তুটিকে মাটির পৃথিবীতে টেনে আনলেন তখন থেকেই সেটি শিল্পবিপ্লবের প্রধান অনুসঙ্গ হয়ে ঢুকে গেল সভ্যতার রন্দ্রে রন্দ্রে, ঘরে ঘরে মানুষের নিত্য ব্যবহারে। আকাশের এই বিদ্যুৎ শুধু আর মেঘের দেশেরই রইল না, ধরে বেঁধে পোষ মানানো হলো। হলো বাণিজ্যিকীকরণ। শনৈ: শনৈ: উন্নতি হলো শিল্পের। বদলে গেল গ্রহবাসীর জীবনধারা। মানবজীবনে রক্ত চলাচলের মতোই প্রয়োজনীয় হয়ে গেল বিদ্যুৎ।
আমাদের দেশেও কোন এ্ক কুক্ষণে বিদ্যুতের ব্যবহার শুরু হয়েছিল, তাও শতবর্ষ আগে। ক্রমে নগর-বন্দর, শিল্প-বণিজ্য ছাড়িয়ে চলে এলো মাঠে-ঘাটে, কৃষ্ িক্ষেত্রে। উন্নয়নের মাপকাঠি হয়ে খাম্বা খুঁটি উঁকি দিল প্রত্যন্ত গ্রামে প্রান্তরে। বিদ্যুতের যোগান না থাকলেও খুঁটি রইল তারের ঝুঁটি মাথায় নিয়ে।
বিদ্যুৎ নির্ভরতার বহুকাল পেরিয়ে গেলেও আমাদের তাবৎ ঝানু ঝানু পরিকল্পনাবিদ-উন্নয়নবিদ-প্রকৌশলবিদ-রাজনীতিবিদেরা বিদ্যুৎকে তেমন পোষ মানাতে পারেননি। দিতে পারেননি প্রয়োজনীয় যোগান, নিশ্চিত করতে পারেননি উপযুক্ত রক্ষণাবেক্ষণ। ঝড়ে যথারীতি নির্বাসিত বিদ্যুৎ। এটি অস্বাভাবিক নয়। ঝড়ে আম পড়বে, ডাল ভাঙবে, খুঁটি হেলে পড়বে, উপড়ে যাবে, তার দুলবে বিদ্যুৎ থাকে কি করে। কিন্তু আমাদের খেয়ালী বিদ্যুতের চরিত্র যে বড় বিচিত্র। বাতাসের এতোটুকু ছোঁয়াতেই হয়ে যায় বেপাত্তা, শীতে কুকড়ে যায়, বৃষ্টিতে চুপসে যায়, বসন্ত সমীরণে শিহরিত হয়ে মরমে মরে যায়। পূর্বপুরুষের ডাক শুনলে তো রক্ষে নেই। পড়িমড়ি করে কোথায় যে ছুটে পালায়, তার ঠিকানা থাকে না। তারে কাক বসলেও লোডশেডিং।
লোডশেডিংয়েরও একটা নিয়ম থাকে, আছে মাত্রা। এক ঘন্টা, দু’ ঘন্টা, হতে পারে তিন ঘন্টা। মানুষ প্রস্তুত থাকবে সাধ্যমতো লন্টন, কুপি, মোমবাতি নিয়ে। উপায় যখন নেই তা মানিয়ে নিতে হবে। বাধ্য হয়েই স্বাদ নিবে হারানো দিনের। ঐতিহ্য অনুরাগীরা লন্টন, লেমের স্মৃতি রোমন্থন করে পরিত্যক্ত বস্তুগুলির মাহাত্ম্যের নব-মূল্যায়ন করবেন। আরো নষ্টালজিক যারা, রাতের লোডশেডিংয়ে আদিম অন্ধকার উপভোগে তৃপ্ত হবেন। ভাবুকেরা প্রকৃতির জ্যো¯œায় অবগাহন করবেন। বিদ্যুতের মহিমায় অতীত-বর্তমানের মধ্যে এক সেতুবন্ধন রচনা করে বিদ্যুৎ বিভাগও আহ্লাদিত হতে পারেন। তাতে কারো কোন ক্ষতি নেই। কিন্তু মানুষকে বোকা বানিয়ে চঞ্চলা বিদ্যুৎ এমন লুকোচুরি খেলবে, ঘন্টায় চারবার যাবে তিনবার আসবে এ কেমন নিষ্ঠুর রসিকতা। এ অবস্থায় ছকে বাঁধা নাগরিক জীবন পদে পদে হোছট খায়। দৈনন্দিন পরিকল্পনা ভেস্তে যায়, ছাত্রের পড়াশোনা লাটে উঠে, রোগীর উচাটন বাড়ে। খরতাপে পাখা বন্ধ, ফ্রিজ বন্ধ, টিভি বন্ধ, পৌরসভার পানি সরবরাহ বন্ধ, মিলবন্ধ, কলবন্ধ, চার্জহীন ব্যাটারী, বাতিহীন রাতি। বিত্তশালীদের আইপিএস-সেটিও আর কুলিয়ে উঠতে পারে না।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভুক্তভোগীদের তীব্র মন্তব্য, বিদ্যুৎ বিভ্রাটে জন দুর্ভোগের চিত্র স্থানীয় পত্র-পত্রিকার পাতায় ফুটে উঠলেও আমাদের হর্তাকর্তা নেতামন্ত্রীদের মুখে কেবলই উন্নয়নের খই ফুটছে। উৎপাদনের রেকর্ড, মেগাওয়াটের হিসেব-নিকেশ নিয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তুলেই খান্ত দেন নাÑকাড়াকাড়ি, হুড়োহুড়ি লেগে যায় সঞ্চালন লাইনের উদ্বোধন নিয়েও।
বর্তমানে দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, নীতি-নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ, সেবা, দেশপ্রেম, সবকিছুতেই কেবল লোডশেডিংয়ের অন্ধকার নয়, তলিয়ে যাচ্ছে ঘোর অমানিশার অতল কৃষ্ণগহ্বরে। যে অন্ধকার থেকে মুক্তি না পেলে উন্নয়ন শুধু বাণিজ্যিক কৌশল আর অপরাজনীতিতেই সীমাবন্ধ থাকবে। সাধারণ মানুষ যে তিমিরে সেই তিমিরেই থেকে যাবে।

  • [১]