বিন্দু তালুকদার
নদী মাতৃক দেশ বাংলাদেশ। নদী তীরেই গড়ে উঠেছিল সভ্যতা ও বন্দর। এক সময় যাতায়াতের প্রধান বাহন ছিল নৌকা, লঞ্চ ও স্টিমার। পরে আস্তে আস্তে সড়ক ব্যবস্থা চালু হলে নৌপথের উপর চাপ কমে যায়।
জেলার দিরাই এলাকায় সড়ক যোগাযোগ স্থাপনের জন্য অপরিকল্পিত সেতু নির্মাণ করে গত কয়েক বছর ধরে মরা সুরমার নৌ-পথকে গলা টিপে হত্যা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। জেলার দিরাইয়ে মরা সুরমা নদীর উপর তিনটি সেতু অপরিকল্পিতভাবে নির্মাণ করা হয়েছে বলে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এলাকার লোকজন।
এলজিইডির দিরাই উপজেলা প্রকৌশলী ইফতেকার হোসেন জানিয়েছেন, মরা সুরমায় যেসব স্থানে ব্রিজ নির্মাণ করা হয়েছে তার নকশা প্রণয়ন হয়েছে এলজিইডির প্রধান কার্যালয় থেকে। তবে নদীতে ব্রিজ নির্মাণে জেলা পাউবোসহ অন্যান্য বিভাগের সাথে আন্ত বিভাগীয় সমন্বয় হয়নি বলে জানা গেছে।
জানা যায়, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) দিরাই উপজেলার মরা সুরমা নদীতে চরনারচর ইউনিয়নের শ্যামারবাজারের কাছে পেরুয়া-শ্যামারচর গ্রামের মাঝে ২০১৩ সনে ২ কোটি ৬০ লাখ টাকা ব্যয়ে ১০০ মিটার লম্বা একটি সেতু নির্মাণ করে। নির্মাণের শুরু থেকে স্থানীয়দের অভিযোগ ছিল সেতু খুব নিচু করে করা হচ্ছে। নিচু করে সেতু নির্মাণ করায় বাধা দিয়েছিলেন এলাকার কৃষক নেতা অমর চাঁদ দাস। কিছু দিন কাজ বন্ধও ছিল। সেতু নির্মাণ বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশংকায় এক সময় তিনি বাধা দেয়া থেকে সড়ে দাঁড়ান। নিচু করে সেতু নির্মাণের ফলে মাঝারি বর্ষায় ওই সেতুর
নীচ দিয়ে দিয়ে একটু বড় নৌকা চলাচল করতে পারে না।
শ্যামারচরের পর একই নদীর প্রায় ৮ কিলোমিটার উজানে সরমঙ্গল ইউনিয়নের কল্যানী ও মাহতাবপুর গ্রামের মাঝে ২০১১ সনে ১ কোটি ৩৭ লক্ষ টাকা ব্যয়ে ৬৬ মিটার লম্বা আরেকটি নিচু সেতু নির্মাণ করা হয়। এই সেতুর নিচ দিয়েও মাঝারি নৌযান চলচল করতে পারছে না।
সর্বশেষ গত অর্থবছরে দেড় কোটি টাকা ব্যয়ে ৬০ মিটার লম্বা আরও একটি সেতু এই নদীর রাজানগর ইউনিয়নের রাজানগর ও রনারচর গ্রামের মধ্যে নির্মাণ করা হয়। এই সেতুটিও আগের দুইটি সেতুর মতোই নিচু করে নির্মিত হয়েছে। একইভাবে তিনটি সেতু নির্মাণের ফলে এই নদী পথে বড় নৌকা বা লঞ্চ চলাচল স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেয়া হল। সেতুগুলো চলতি সপ্তাহে পানির ৫-৬ ফুট উঁচুতে অবস্থান করছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। সেতুগুলো নির্মাণ করে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন করা হলেও এর মধ্য দিয়ে অতিপ্রয়োজনীয় নৌপথ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।
সড়ক যোগাযোগ স্থাপন করতে অপরিকল্পিতভাবে একের পর এক সেতু নির্মাণের ফলে নৌ চলাচল বন্ধের জন্য এলজিইডিকে দায়ী করছেন স্থানীয় এলাকার বাসিন্দা ও দিরাই-শাল্লার সচেতন মহল। তাদের দাবি সুনামগঞ্জের হাওর, নদী, এলাকার আর্থ সামাজিক অবস্থার বিবেচনা না করে, স্থানীয়দের সাথে কোন কথা না বলে ও নৌ চলাচলের সুবিধা না রেখেই এসব সেতু নির্মাণ করা হয়েছে। অথচ আর কয়েক ফুট উঁচু করে এসব সেতু নির্মাণ করলে নৌ চলাচল অব্যাহত থাকত।
শ্যামারচর গ্রামের বাসিন্দা প্রবীণ কৃষক নেতা অমর চাঁদ দাস বলেন,‘ নদী বাংলাদেশের প্রাণ। নদীর সাথে হাওরের গভীর সম্পর্ক। আমার জানা মতে মরা সুরমায় ব্রিজ নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান ও এলাকার জনপ্রতিনিধিগণ (এমপি) এলাকাবাসীর সাথে এ বিষয়ে কোন কথাই বলেননি। এলজিইডির প্রকৌশলীগণ এই এলাকার পানি ও সামাজিক অবস্থার কথা নাও জানতে পারেন। কিন্তু জনপ্রতিনিধগণ তো এলাকার বাসিন্দা তাদের উচিত ছিল জনগণের সাথে কথা বলে কাজ করা। হাওর এলাকায় বর্ষাকালে বিয়ে-সাদীসহ সকল সামাজিক অনুষ্ঠানে আসা-যাওয়া করার একমাত্র বাহন নৌকা। কিন্তু এসব বিষয় সম্পর্কে কর্তৃপক্ষের কোন ধারণাই নেই। মরা সুরমায় নিচু করে তিনটি ব্রিজ নির্মাণের ফলে মাঝারি বর্ষায় হাওর থেকে নদীতে আসা-যাওয়া করতে পারে না কেউ। এই তিনটি ব্রিজের কারণে ভরা বর্ষায় সব ধরনের নৌযান চলাচল বন্ধ থাকবে। সবচেয়ে বেশি নিচু হয়েছে কল্যানীর ব্রিজটি। পরিকল্পিতভাবে ব্রিজ নির্মাণ করা হলে হাওরাঞ্চলের মানুষের এই দুর্ভোগ হত না। ’
রাজানগর কৃষ্ণ চন্দ্র পাবলিক মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত সহকারি শিক্ষক রনারচর গ্রামের বাসিন্দা মনমোহন দাস বলেন,‘এই নদীর তীরে আমার জন্ম। আমি ছোটকালে দেখেছি প্রতিদিনই লঞ্চ আসা-যাওয়া করত। এসময় স্টিমারও যেত এই নদী পথে। যেভাবে নিচু করে ব্রিজটি নির্মাণ করা হয়েছে একটু পানি বৃদ্ধি হলেই কোন ধরনের বড় নৌযান চলাচল করতে পারবে না। এত নিচু করে এই ব্রিজ নির্মাণ করা ঠিক হয়নি। ব্রিজটি বর্তমানে নদীর পানি থেকে মাত্র ৫-৬ ফুট উঁচুতে রয়েছে। ’
জাগো দিরাইয়ের সভাপতি আবুল কাশেম চৌধুরী বলেন,‘নৌপথ আরামদায়ক ও সস্তা, পণ্য ও সাধারণ মানুষের যাতায়াতের জন্য সুবিধাজনক। নৌ পথ সচল রাখা খুব জরুরি। কিন্তু অপরিকল্পিতভাবে নিচু করে ব্রিজ তৈরি করায় নৌপথ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। যে এলাকায় ব্রিজ নির্মাণ করা হয় সেখানের কারো সাথে কোন পরামর্শ ও মতামত নেয়া হয় না। এলজিইডির প্রকৌশলীগণ যা মনে করেন তাই করেন। কোন সময় নদীর সার্ভে করা হয় তা এলাকার কেউ জানেন না। ’
এলজিইডির দিরাই উপজেলা প্রকৌশলী ইফতেকার হোসেন বলেন, ‘মরা সুরমা নদীর যে তিনটি স্থানে ব্রিজ নির্মাণ করা হয়েছে সেই এলাকার স্থানীয়দের সাথে কথা বলেই করা হয়েছে। নৌ চলাচল বন্ধ হয়নি। তবে লঞ্চ এমনিতেই চলাচল করে না। বন্যার সর্বোচ্চ লেভেল ধরেই ব্রিজ নির্মাণ করা হয়েছে। নদীগুলো ভরাট হয়ে যাওয়ায় কিছু সমস্যা হচ্ছে। ’
পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী আবু বকর সিদ্দিকি ভুইয়া বলেন,‘পরিকল্পনা কমিশন এসব কাজ যাচাই-বাছাই করেন। যাচাই-বাছাই শেষে অনুমোদন হওয়ার পর ব্রিজ নির্মাণ করা হয়। তবে যে কোন নদীতে বিজ্র নির্মাণের বিষয়ে আমাদের সাথে আন্তঃবিভাগীয় সমন্বয় করা হলে ভাল হতো। এসব নদী ড্রেজিং ও শাসন করার প্রয়োজন হলে পরবর্তীতে সমস্যা হতেও পারে। ’