বিশেষ প্রতিনিধি
অবিরাম ছুটে চলেছে ‘অবিনাশ’। পুরো নাম অবিনাশ দাস অভি। বৈশি^ক দুর্যোগে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্যই যেন সৃষ্টিকর্তা পাঠিয়েছেন তাকে। ভয় নেই, শঙ্খা নেই। নমুনা সংগ্রহের জন্য এ বাড়ি থেকে ওবাড়ি যাচ্ছে সে। গত ১৬ জুন স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে নাম লিখিয়েছিল অভি। মঙ্গলবার পর্যন্ত ২৩০০ করোনা রোগীর নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠিয়েছে সে। কর্তৃপক্ষ জানালেন, অভিকে একজন পূর্ণাঙ্গ স্বেচ্ছাসেবী বলা চলে, ১৬ জুন থেকে এখনো একদিনের জন্যও ছুটি নেয় নি সে। করোনার নমুনা সংগ্রহের ক্ষেত্রে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলায় ভরসা সে-ই এখন।
শহরের ষোলঘর আবাসিক এলাকার ভূমি অফিসের কর্মচারী অবনী কুমার দাস ও গৃহীনা অর্চনা রানী দাসের ৩ ছেলে-মেয়ের দ্বিতীয় সন্তান অবিনাশ দাস অভি। সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করে রাজধানীর নিউল্যাব ইন্সটিটিউট অব মেডিকেল টেকনোলজি থেকে ল্যাবরেটরি মেডিসিনে ৪ বছরের ডিপ্লোমা সম্পন্ন করে সে। ১৬ হাজার টাকা মাসিক সম্মানীতে চাকুরি নেয় সুনামগঞ্জ শহরের পাইওনিয়ার ডাগনস্টিক সেন্টারে। করোনাকালের শুরু’র দিকে ওখানেই চাকুরি করছিল সে।
জুনের প্রথম সপ্তাহে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলায় করোনা সক্রমণ বেড়ে যায়। এমন ক্রান্তিকালে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যান কেন্দ্রের দুইজন নমুনা সংগ্রহকারী’র দুজনেই করোনায় আক্রান্ত হন। অথচ. ওই সময়ে প্রতিদিন সুনামগঞ্জ শহরে ৭০ থেকে ৮০ টি নমুনা সংগ্রহের চাপ। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্টরা স্বেচ্ছাসেবী খুঁজতে থাকেন। অভি- বিষয়টি জেনে স্বেচ্ছাসেবী হিসাবে নিজের নাম লেখায়। প্রথমদিকে কিছুটা ভয় কাজ করছিল অভি’র। কিন্তু করোনা রোগীদের বাড়ি বাড়ি যাওয়ার পর রোগীর স্বজনসহ সামাজিকভাবে পাওয়া মমতায়, কাজটি রীতিমত নেশায় পরিণত হয়ে যায় তার। এমনও হয়েছে, একদিনে ৭৫ জনের নমুনা সংগ্রহ করেছে সে।
অভি জানালো, প্রথম দিকে বাবা-মা ও পরিবারের কথা চিন্তা করে ভয় লাগতো তার। কিন্তু শরীরে সামান্য উপসর্গ নিয়ে ৮ বার নমুনা পরীক্ষা করানোর পর যখন প্রতিবারই তার নিজের নেগেটিভ এসেছে, সেই থেকে সাহস বেড়েছে। গত সপ্তাহে বাবা অবনী কুমার দাস ও মা অর্চনা রানী দাসের করোনা উপসর্গ দেখা দিলে তাদের নমুনা পরীক্ষা করতে দেয় সে। পরে তারা দুজনেরই নেগেটিভ আসে। এরপর থেকে পারিবারিক ভাবেও সাহস দেওয়া হচ্ছে তাকে।
অভি জানালো, সে স্বেচ্ছাশ্রম দেবার জন্য এই কাজে যুক্ত হয়েছে। টাকা পয়সা পাবার কোন আশা থেকে সে কাজ করছে না। এরপরও প্রথম দুই মাস তাকে সম্মানী দেওয়া হয়েছে। এখন আর সম্মানী দেবার মতো ফা- নেই জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যান কর্মকর্তা। সে তাদেরকে আশ^স্থ করেছে এই নিয়ে না ভাবার জন্য। সে কাজ করছে মানুষের জন্য। মানুষ যতদিন কঠিন সংগ্রামে থাকবেন এবং উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যান কেন্দ্র যদি মনে করে তার প্রয়োজন রয়েছে, যখনই যে ডাকবে, সে যাবে এবং সেই অনুযায়ী তার কাজ চলমান রয়েছে। মঙ্গলবারও সে ৮ জনের নমুনা সংগ্রহ করেছে বাড়ি বাড়ি গিয়ে।
অভি বললো, মাঝে মাঝে ক্লান্তি অনুভব করে সে। কিন্তু যখনই বিশ্রাম নেবার চিন্তা বা একদিন কাজ না করার চিন্তা করে, তখনই সে মানসিকভাবে যেন অসুস্থ হয়ে পড়ে এই ভেবে যে, সে বোধ হয় পরাজিত হতে চলেছে। তার কর্মস্থল পাইওনিয়ার ডায়গনস্টিক সেন্টার কর্তৃপক্ষকে স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তাকে কিছুদিন ছুটি দেবার জন্য। ওখানেও সে মাঝে মাঝে গিয়ে তাদের জরুরি প্রয়োজনে সাহায্য করে আসে। মানুষের জন্য কাজ করে তৃপ্ত অভি। বললো, এতো মমতা, ভালবাসা, বাহাবা কুড়ানো অন্য কোন কাজ করে সম্ভব নয়। আমি এই কাজের বিনিময়ে কিছু চাই না। তবে আমি যে কাজ করছি, বা যে পদের হয়ে কাজ করছি, সুনামগঞ্জ জেলার স্বাস্থ্য বিভাগে এই ধরণের অনেক পদ শুন্য। সরকারিভাবে লোক নিয়োগ হলে যেন স্বচ্চতার ভিত্তিতে হয় এবং আমার মতো সেবা দিতে আগ্রহীরা যেন চাকরির সুযোগ পায়।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যান কর্মকর্তা সৌমিত্র চক্রবর্তী বললেন, জুনের মাঝামাঝি সময়ে সুনামগঞ্জ সদরে যখন করোনা সক্রমণ ভয়াবহ পর্যায়ে ছিল। নমুনা সংগ্রহের দায়িত্বে থাকা আমাদের দুজন টেকনেশিয়ানই করোনায় আক্রান্ত হয়ে পড়েনে। ওই সময়ে অবিনাশ দাস অভি স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে যোগদান করেন। যোগদানের পর থেকে অন্তত চার জনের কাজ একা করছেন অভি। আন্তরিকতার কোন ত্রুটি নেই ছেলেটির। তার সমান নমুনা সংগ্রহ এই জেলায় আর কেউ করেছেন বলে জানা নেই আমার। শতভাগ স্বেচ্ছাসেবী এই তরুণকে আমরা ২ মাস সামান্য সম্মানী দিয়েছিলাম। এখন আর দিতে পারছি না। কিন্তু তার কাজ থেমে নেই। তার কাজে সুনামগঞ্জের স্বাস্থ্য বিভাগ সন্তোষ্ট। এতো আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছে সে, রীতিমত তার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছি আমরা।