- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

অভিবাদন শিক্ষা সংগ্রামীদের

বিশেষ প্রতিনিধি
প্রায় এক বছর হয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ। স্কুল থেকে বিশ^বিদ্যালয় পড়–য়া শিক্ষার্থীদের ক্লাস নেই। যারা টিউশনি করে নিজের খরচ চালাতো পরিবারকেও সহায়তা করতো, এরাও বেকার। এই অবস্থায় হাওরাঞ্চলের গ্রামে গ্রামে ধান কাটতে শিক্ষার্থী ভাগালো গ্রুপ (শেয়ারের ভিত্তিতে ধান কাটা-মাড়াই) হয়েছে। এসব শিক্ষা সংগ্রামীরা নিজের পরিবারের ধান কাটা মাড়াইয়ের পাশাপাশি, অন্যদের ধান অপেক্ষাকৃত কম টাকায় কেটে দিচ্ছে। সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলজুড়ে থাকা এসব শিক্ষা সংগ্রামীদের অভিবাদন জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
জেলার শাল্লা উপজেলার ডুমরা গ্রামের বাসিন্দা রিংকু তালুকদার। সিলেট মদন মোহন কলেজের রাষ্ট্র বিজ্ঞান বিভাগের অনার্স তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী রিংকু টিউশনি করেই নিজের পড়াশুনার খরচ চালান।
রিংকু জানালেন প্রায় এক বছর ধরেই টিউশনি নেই তার। গত বৈশাখেও বাড়িতে থেকে ধান কাটার কাজ করেছে সে। এবার গ্রামের অন্য শিক্ষার্থীদের আগ্রহে রীতিমত ভাগালো গ্রুপ করেছে তারা।
রিংকু বললো, তাদের ১৪ জনের গ্রুপ। সকলেই বিভিন্ন কলেজ বিশ^ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। গ্রুপের অন্যারা হলেন, মদন মোহন কলেজের শিক্ষার্থী বিপ্লব তালুকদার, বিজন তালুকদার, শাল্লা ডিগ্রি কলেজের বেনু মধাব দাস, সীমান্ত তালুকদার, বিনয় তালুকদার ও রাব্বি মিয়া, নেত্রকোণার কালিয়াজুরির কৃষ্ণপুর কলেজের রুবেল তালুকদার, আশিক সরকার ও পাবেল মিয়া, সিলেটের এমসি কলেজের শিক্ষার্থী নিলয় কান্তি দাশ, রফিক মিয়া ও আকাশ দাশ, শাল্লা শাহেদ আলী পাবলিক উচ্চ বিদ্যালয়ের এসএসসি পরীক্ষার্থী মিঠু চন্দ্র দাশ।


দলের সদস্য পাভেল মিয়া জানালো, ভোর ৬ টা থেকেই তাদের ১৪ জনের দল ধান কাটা শুরু করে। দুপুরে কাটা ধান খলায় (মাড়াই করার স্থানে) নিয়ে যায়। খলায় খাওয়া দাওয়া শেষে আবার হাওরে ধান কাটা শুরু হয়। চলে সন্ধ্যা পর্যন্ত। এরপর আবার খলায় গিয়ে বোমা মেশিনে রাত ১১ টা থেকে ১২ টা পর্যন্ত মাড়াইয়ের কাজ হয়।
সদস্যদের নিজেদের ধান পাকলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাটার সিদ্ধান্ত রয়েছে তাদের। অন্যদের ধানও অপেক্ষাকৃত কম ভাগে কেটে দিচ্ছে তারা।
শাল্লার ডুমরা গ্রামের কৃষক অবিনাশ দাশ বললেন,‘আমাদের এখানকার কৃষকরা পাবনা, কিশোরগঞ্জসহ অন্য জেলার শ্রমিকদের দিয়েই ধান কাটা সারতেন। এবার লক ডাউনের জন্য অনেক শ্রমিকের আসা হয় নি এই এলাকায়। তাতেও থেমন কোন সমস্যা হচ্ছে না। গ্রামের শিক্ষিত তরুণরাই নেমেছে ধান কাটায়। ব্যাপারীরা যারা এসেছে তারা ৬-৭ মণ ভাগে ধান কাটছে। কিন্তু আমাদের শিক্ষিত তরুণরা ধান কাটছে ৪-৫ মণ দরে। এই গ্রামের কৃষ্ণ গোবিন্দ দাশও একই ধরণের মন্তব্য করলেন।
শাল্লার উদগল হাওরে মিললো একই ধরণের ভাগালো গ্রুপ। কৃষ্ণপুর কলেজের ইতিহাস বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী লিপু দাশের নেতৃত্বে এই ভাগালো গ্রুপেও ১৪ জন সদস্য রয়েছে। এরা হচ্ছে কৃষ্ণপুর কলেজের শিক্ষার্থী সবুজ দাশ দিপু, হবিগঞ্জ বৃন্দাবন কলেজের শিক্ষার্থী অমূল্য দাশ, শাল্লা কলেজের সৌরভ দাশ, দীপ্ত দাশ ও শিরিস দাশ, শাল্লার শাহেদ আলী উচ্চ বিদ্যালয়ের এসএসসি পরীক্ষার্থী সুমন দাশ, প্রশান্ত দাশ, মনোজ দাশ, আশিষ দাশ, সুশান্ত দাশ, অতনু ভট্টাচার্য ও শাল্লার ভাটি বাংলা কলেজের শিক্ষার্থী জুয়েল দাশ।


এই দলের দল নেতা লিপু দাশ বললো, এই পর্যন্ত ৩০ একর জমির ধান কেটেছি আমরা। প্রথম প্রথম দলের সদস্যরা ধান কাটা শুরু করতেই ৮ টা সাড়ে ৮ টা বেজে যেতো। দিনে দিনে প্রত্যেক সদস্যদের গতি বেড়েছে, এখন এমনও হয় ৫ টা সাড়ে ৫ টায় সদস্যরা একে অপরকে তাগাদা শুরু করে। ১২ দিন হয় ধান কাটতে নেমেছি। প্রত্যেকে ধান কেটে ২০-২২ মণ ধান ঘরে নিয়েছে। আমাদের অভিভাবকরাও ধান কাটতে শ্রমিক খোঁজতে হয় নি।
এক ফসলি বোরো ধানের জেলা সুনামগঞ্জে এখন কেবল শাল্লা উপজেলায় নয়। সারা জেলায়ই শিক্ষা সংগ্রামীরা দাঁড়িয়েছে অভিভাবকদের এবং নিজের গ্রামের কৃষকদের পাশে।
মঙ্গলবার দুপুরে সুনামগঞ্জের দেখার হাওরেও গিয়ে দেখা গেছে ধান কাটায় ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে শিক্ষা সংগ্রামীরা।
এই হাওরে এক সঙ্গে ৫ জনের দল করে ধান কাটতে নেমেছে হাছনবাহার গ্রামের বাসিন্দা সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের অনার্স তৃতীয় বর্ষের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী আবুল কাহার, একই শ্রেণির শিক্ষার্থী বাবুল মিয়া, এই কলেজের ইতিহাস প্রথম বিভাগের শিক্ষার্থী মুহিত মিয়া, হাছনবাহার গ্রামের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী মাছুম মিয়া ও সাজ্জাদ মিয়া।
সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বললেন, ধান কাটার জন্য সকলকে আহ্বান জানিয়েছি আমরা। বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ তাতে সাড়া দিয়েছেন। শিক্ষার্থীরা নেমেছেন প্রত্যেকটি হাওরে হাওরে, ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা তাদের প্রতি।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-পরিচালক ফরিদুল হাসান বললেন, ক্রান্তিকালে শিক্ষার্থীরা হাল ধরছে বহুকাল আগে থেকেই। এবার লক ডাউনের সময়ে হাওরে গেলে গর্ব হয় বিশ^বিদ্যালয় ও কলেজ পড়–য়া শিক্ষার্থীদের পরিশ্রম দেখে। অভিবাদন তাদের।
ফরিদুল হাসান জানিয়েছেন, এবার ধানের ফলন ভালো হওয়ায় উৎপাদন বেশি হবে। সুনামগঞ্জে এবার তিন লাখ ২৩ হাজার ৩৩০ হেক্টর জমিতে ধানের চাষাবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৪ লাখ ৬০ হাজার মেট্রিক টন। লক্ষ্যমাত্রা মোতাবেক উৎপাদন হলে কেবল সুনামগঞ্জ নয়, সারাদেশের খাদ্য চাহিদা মেঠাতে ভূমিকা রাখবে এই জেলা।

  • [১]