- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

অভিযোগের আঙ্গুল এমপি রতনের দিকে

বিশেষ প্রতিনিধি
ধর্মপাশার সুনই জলমহাল দখল নিয়ে প্রতিপক্ষের হামলায় এক জেলে নিহতের ঘটনায় জলমহাল পাড়ের গ্রামগুলোতে উত্তেজনা বিরাজ করছে। ফের সংঘর্ষের আশংকায় ওখানে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। এদিকে, শুক্রবার বিকালে সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে নিহত শ্যামাচরণ বর্মণের ময়না তদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত (শুক্রবার বিকাল ৪ টা) থানায় মামলা হয় নি। পুলিশ রাতেই জলমহালের আশপাশের এলাকা থেকে ২৩ জনকে আটক করেছে। নিহতের ভাই দাবি করছেন, স্থানীয় সংসদ সদস্যের নির্দেশে এই হামলা ও খুনের ঘটনা ঘটেছে। সংসদ সদস্য বলেছেন, দুই মৎস্যজীবী সমিতির দ্বন্দ্ব, এখানে তাঁকে এবং তাঁর ভাইকে যুক্ত করার চেষ্টা করছে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ।
ধর্মপাশার বৃহৎ জলমহাল সুনই নিয়ে দুই মৎস্যজীবী সমিতির দ্বন্দ্ব চলছে অনেক দিন ধরে। জলমহালের খাজনা পরিশোধ করে দুই পক্ষই মহালের মালিকানা দাবি করে আসছে। একপক্ষ সম্প্রতি স্থানীয় সংসদ সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন রতন তাদেরকে মাছ আহরণে বাধা দিচ্ছেন দাবি করে জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনও করেছিল। এই দ্বন্দ্বের জের ধরে বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৮ টায় জলমহালে পাড়ে থাকা একপক্ষের মাছের খলায় আরেকপক্ষ আগুন ধরিয়ে দেয়। এসময় প্রতিপক্ষের লোকজন শ্যামাচরণ বর্মণ নামের ৬৫ বছরের এক বৃদ্ধকে গলা কেটে হত্যা করে। এ ঘটনায় কমপক্ষে ২৫ জন আহত হয়েছে। পুলিশ রাতে ঘটনায় জড়িত সন্দেহে ২৩ জনকে আটক করেছে।
সুনই মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক ঝন্টু বর্মণ জানান, সুনই মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি ৬ বছর আগে উন্নয়ন স্কিমের আওতায় এই জলমহাল ইজারা পায়। গেল বছর (পঞ্চম বছর) হঠাৎ করেই স্থানীয় সংসদ সদস্যের ভাই মোজাম্মেল হোসেন রুখন তাদের সমিতি থেকে বহিস্কৃত সুবির বর্মণ নামে এক ব্যক্তিকে দিয়ে একই নামে আলাদা সমিতি করে জলমহালের মালিকানা দাবি করে। এরপর থেকে তাদেরকে নানাভাবে হয়রানি করা হচ্ছে। গেল বছর জেলা প্রশাসনের সহায়তায় মাছ আহরণ করেছেন তারা। এবার আড়াই মাস আগে জলমহালের এই বছরের খাজনা জমা দিয়েছেন এবং মাছ ধরার মৌসুমে জলমহালের একপাশে খলা (স্থাপনা) নির্মাণও করেছেন। অন্য পাশে সংসদ সদস্যের ভাই মোজাম্মেল হোসেন রুখনও খলা তৈরি করান।
তিনি জানান, বুধবার রাতে জলমহালে মাছ ধরে রুখনের লোকজন। বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৮ টায় উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মোজাম্মেল হোসেন রুখন সুনই গ্রামের খায়রুল, স¤্রাট, জুলহাস, তনুজসহ সশস্ত্র বাহিনী নিয়ে জলমহালে এসে প্রথমেই খলার বিদ্যুৎ লাইন বিচ্ছিন্ন করে দেয়। পরে খলা ঘেরাও করে ভাংচুর এবং অগ্নি সংযোগ করে। এসময় অন্যরা দৌড়ে পালালেও তাদের সমিতির সভাপতি সুবির বর্মণের বাবা শ্যামাচরণ বর্মণ (৬৫) দৌড়ানোর সময় নীচে পড়ে যান। হামলাকারীরা রামদা দিয়ে তার গলা কেটে দেয়।


শ্যামাচরণের ভাই অভয় চরণ বর্মণ দাবি করেন, স্থানীয় সংসদ সদস্যের নির্দেশেই তার ভাই উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মোজাম্মেল হোসেন রুখন সশস্ত্র বাহিনী নিয়ে খলায় হামলা করে আগুন দিয়েছে। তার ভাইকে গলা কেটে হত্যা করেছে।
সুনই গ্রামের খোকন খান বললেন, মোজাম্মেল হোসেন রুখন দিনে সুনামগঞ্জে ছিলেন, সন্ধ্যার পর সশস্ত্র বাহিনীসহ সুনইয়ে এসে জলমহালের খলায় হামলা করেন।
উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মোজাম্মেল হোসেন রুখনের মুঠোফোন বন্ধ থাকায় তার সঙ্গে কথা বলা যায় নি।
সংসদ সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন রতন বললেন, আমি এবং আমার ভাই মোজাম্মেল হোসেন রুখন সুনামগঞ্জে ছিলাম। জলমহালে খুনের বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। দুই মৎস্যজীবী সমিতির দ্বন্দ্ব চলছে। এখানে আমাকে এবং আমার ভাইকে জড়ানোর চেষ্টা করছে আমার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ। আমি এসব কিছুই জানি না। এসব অবান্তর কথা।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হায়াতুন নবী শুক্রবার বিকালে জানান, জলমহালের দখল নিয়ে দুই সমিতির দীর্ঘদিন ধরে দ্বন্দ্ব চলছে। এর জের ধরে বৃহস্পতিবার রাত ৯ টার দিকে প্রতিপক্ষের হামলায় এক জন মারা গেছেন। কয়েকজন আহত হয়েছে। পুলিশ ২৩ জনকে আটক করেছে। শুক্রবার বিকাল ৪ টা পর্যন্ত কেউ মামলা নিয়ে আসে নি।
সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান জানান, জলমহালটির ইজারা নিয়ে স্থানীয় দুটি মৎস্যজীবী সমিতির দীর্ঘদিন ধরে দ্বন্দ্ব চলছে। দুই মৎস্যজীবী সমিতির নেতা চন্দন বর্মণ এবং সুবীর বর্মণ মহালের খাজনা জমা দিয়ে রশিদ দেখিয়ে জলমহালের দখল নিতে চাইলে জেলা প্রশাসন কাউকেই দখল বুঝিয়ে দেন নি। কিন্তু দুই পক্ষই ওখানে মাছ ধরার জন্য স্থাপনা (খলা) নির্মাণ করেছে। চন্দন বর্মণের পক্ষ উচ্চ আদালত থেকে স্থগিতাদেশ পায়। জলমহালে অন্য পক্ষের লোকজনও দখলে ছিল। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ওখানকার স্থাপনা উচ্ছেদ করার জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে নির্দেশ দিলেও তিনি নির্দেশ প্রতিপালন করেন নি। বিষয়টি বার বার উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। এই অবস্থায় সুবীর বর্মণের লোকজন অন্যপক্ষের স্থাপনায় হামলা করেছে। এসময় চন্দন বর্মণের বাবা শ্যামাচরণ বর্মণ খুন হয়েছেন। হামলাকারীদের সঙ্গে স্থানীয় সংসদ সদস্যের ভাই উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মোজাম্মেল হোসেন রুখন ছিলেন বলে জানা গেছে বলে জানান তিনি।

  • [১]