ধ্রুবএষ
অরণির একজন বড়োবাবা আছেন। খুবই ব্যস্তসমস্ত মানুষ। নাহলে অরণি সেই কবে জন্মেছে, বড়ো হয়ে গেছে, অ আ পড়তে
পারে, এক দুই গুনতে পারে, বড়োবাবা এখনও একবারও তাকে দেখতে আসতে পারেননি। শীতে বলেন কাজ শেষ করে
আসবেন। গ্রীষ্মে বলেন, গরমের দিন গেলে আসবেন। বর্ষায় বলেন বৃষ্টি ফুরালে আসবেন। আসেন না আর। আবার শীত এসে পড়ে এবং কাজের সময় হয়ে যায় বড়োবাবার। ইস রে! অরণি যদি মাত্র একবার দেখতে পেত তার বড়োবাবাকে! ফোনে কথা বলে। কিন্তু বড়োবাবার ফোন নাকি বাবার ফোন, মায়ের ফোনের মতো না। ছবি দেখা যায় না। কী যে করে অরণি!
বড়োবাবা কীরকম দেখতে?
বড়োবাবার দাড়ি এই লম্বা। অহনা বলেছে। অরণির বোনু অহনা। কলেজে পড়ে। সে বড়োবাবাকে দুবার দেখেছে। খুব ছোটো
থাকতে একবার, একটু বড়ো হয়ে একবার।
‘কত লম্বা দাড়ি রে বোনু?’
‘কত লম্বা? তোর থেকেও লম্বা।’
‘ইহ্! বাবার থেকেও লম্বা?’
‘হ্যাঁ-এ-এ। আমি তো প্রথম যখন দেখলাম, ছোটো ছিলাম তো, বড়োবাবার দাড়ি ধরে ঝুলে পড়েছিলাম।’
এ কথায় অরণির খুবই হাসি পায়। বড়োবাবার দাড়ি ধরে ঝুলে পড়ে ছিল ছোট্ট বোনু! কী মজার কথা। বড়োবাবা আসলে অরণিও অবশ্যই বড়োবাবার দাড়ি ধরে ঝুলবে। খুব মজা হবে তখন।
‘বড়োবাবা কত লম্বা রে, বোনু?’
‘এই লম্বা! তুই কী মনে করেছিস, তুই বড়োবাবার দাড়ি ধরে ঝুলবি? তুই! তোকে মইতে চড়ে বড়োবাবার দাড়ি পর্যন্ত উঠতে
হবে রে!’
‘ইহ্!’
তবে অরণির মনে থাকল কথাটা। বড়োবাবা অনেক লম্বা। অরণির বাবাও অনেক লম্বা। কিন্তু বড়োবাবার দাড়িই তো বাবার থেকে
লম্বা, বোনু বলেছে। মইতে চড়ে ধরতে হবে।
অরণির দুই পিপি আছে। তিনা পিপি, পুর্ণা পিপি। দুজনকে মাও ডাকে অরণি। যখন মনে হয়। শুধু তিনা, শুধু পূর্ণাও ডাকে। যখন মনে হয়। পূর্ণা পিপি ইশকুলের টিচার। সকালে উঠে ইশকুলে চলে যায়। তিনা পিপি বাসায় থাকে। সকালে ঘুম থেকে উঠেই অরণি বলল, ‘ মা আমি তিনা পিপি যাব।’
তিনা পিপি যাব মানে তিনা পিপির কাছে যাবে। ঘুম থেকে উঠেই একবার তিনা পিপিদের ঘরে যেতে হয় তার। দেখে আসতে হয় তিনা পিপি, পূর্ণা পিপিরা ঠিক আছে কিনা। এত সকালে তিনা পিপি গত কালকের পত্রিকা পড়ছিল, অরণিকে দেখে বলল, ‘কী খবর?’
‘তিনামা তুমি শোনো, বাবাকে তুমি বলবে একটা মই বানিয়ে দিতে।’
‘অবশ্যই বলব। বাঁশের মই না কাঠের মই বলো?’
‘তুমি বলো।’
‘মই দিয়ে কী করবে তুমি? মেঘ ধরবে! তবে কাঠের মইই ভালো।’
‘আচ্ছা।’
তিনা পিপি বাবাকে বলল। বাবা অরণির জন্য একটা কাঠের মই বানিয়ে আনলেন। তিনা পিপি বলল, ‘এই যে অরণি তোমার মেঘ ধরার মই।’
ইস রে! তিনা পিপি কি মনে করেছে? অরণি মইতে চড়ে মেঘ ধরবে নাকি? বোনুকে শুধু একবার একদম আসল কথাটা বলে দিতে নিচ্ছিল অরণি। বুদ্ধি করে বলেনি।
দুপুরে অরণি ঘুমায় না মোটে। পাড়া বেড়ায়। এর ওর কোলে কাঁখে চড়ে। কত কী দেখে। তবে বড়োবাবাকে দেখবে ভাবেনি। এরকম ভাবে দেখবে আরও ভাবেনি। মস্ত বড়োবাবা উঠানে অরণির কাঠের মইতে চড়ে বসে আছেন। বড়োবাবার দাড়ি কত লম্বা রে। আমগাছটাকে ঢেকে দিয়েছে, তিনা পিপিদের ঘরদোর ঢেকে দিয়েছে। বড়োবাবাকে ও তো দেখাই যায় না।
‘বড়োবাবা! ও বড়োবাবা!’
ডাক দিল অরণি।
এমা! সঙ্গে সঙ্গে খ্যান খ্যান করে উঠল কে!
‘কে রে ইস্টুপিড? কে রে? কে রে? বড়োবাবা! বড়োবাবা! বড়োবাবা ঘুমাচ্ছেন। হ্যাঁ।’
কে রে এটা?
একটা চড়াই। বড়োবাবার দাড়ির ফাঁকে বসে আছে এবং চোখ কটমট করে অরণিকে দেখছে।
অরণি কি আর চড়াইকে ভয় পায়! বলল, ‘আমার বড়োবাবা।’
চড়াই বলল, ‘তোর বড়োবাবা। তাতে কী হলো? তাতে কী হলো, শুনি?’
অরণির রাগ হলো খুব। বলল, ‘এই! তুমি আমাকে তুই করে বলছ কেন?’
চড়াই হে হে করে হাসল, ‘তবে কী করে বলব রে? আপনি? আপনি? হে-হে-হে! শোন্ এই যে তোর বড়োবাবা বলছিস, একেই আমি তুই করে বলি।’
‘অরণি বলল, ‘ইহ্।’
চড়াই বলল, ‘হ্যাঁ তো। আমি হলাম তোর বড়োবাবার দাদা। লোকাল গার্ডিয়ান। স্থানীয় অভিভাবক, বুঝলি? হয়েছে বাবা, যে হও, সে হও,এখন কেটে পড়ো দেখি বাছা। বড়োবাবা মইতে চড়ে ঘুমাচ্ছে আর স্বপ্ন দেখছে এক অরণিকে হে। এ সময় তাকে কি ডিস্টার্ব করা ভালো? অরণিকে স্বপ্ন না দেখলে বড়োবাবার ঘুম যে ভালো হয় না।’
অরণি বলল, ‘ওররে! আমি অরণি!’
চড়াই বলল, ‘কী? কী-কী-কী?’
‘অরণি। অরণি। আমি অরণি। বড়োবাবার অরণি!’ অরণি বলল।
চড়াই বলল, ‘তুই অরণি। বড়োবাবার অরণি! আগে বলবি তো। আগে বলবি তো! আয় আয়! আয় আয় আয়!’
চড়াইয়ের কথায় অরণি মইতে চড়ল। চড়াইয়ের কথা ভুলে গেল এবং বড়োবাবার দাড়ি ধরে ঝুলে পড়ল। এ সময় অল্প হাওয়া দিল। বড়োবাবার লম্বা দাড়ি দুলল। দুলুনিতে ঘুম ধরে গেল অরণির।
‘অরণি! ও অরণি!’
মা ডাকলেন, বাবা ডাকলেন, তিনা পিপি ডাকল, পুর্ণা পিপি ডাকল, বোনু ডাকল, অনেক বার ডাকল, তবে অরণি ঘুম থেকে উঠল। উঠে দেখল হায় রে। বড়োবাবা চলে গেছেন!
সূত্র : সমকাল