বিশেষ প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জের ভয়াবহ দুর্যোগের পর কোরবানির ঈদের এই সময়ে আশানূরূপভাবে দেখা যাচ্ছে না রাজনীতিবিদদের। রাজনীতিবিদদের কেউ কেউ অসুস্থ্যতায় কাবু, কেউবা দেশেই নেই।
সুনামগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মতিউর রহমান অসুস্থ্য হয়ে গেল আট জুলাই যুক্তরাষ্ট্রে গেছেন। মতিউর রহমানের ঘনিষ্টজন নূর মোহাম্মদ স্বজন জানিয়েছেন, প্রথমে তার শরীরে করোনা পজিটিভ হয়। পরে হৃদরোগে আক্রান্ত হন। রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসা দেবার পর তাঁকে চিকিৎসার জন্য আট জুলাই আমেরিকা পাঠানো হয়েছে।
আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য আজিজুস সামাদ ডন পায়ে জটিল রোগে ভুগছেন। তিনি এই সংকটকালে সুনামগঞ্জে আসতে পারেন নি।
আজিুজুস সামাদ ডন জানিয়েছেন, সুনামগঞ্জের প্রথম দফার বন্যায় ত্রাণ নিয়ে বানভাসি মানুষের পাশে ছিলেন। দ্বিতীয় দফায় অসুস্থ্য হওয়ায় আসতে পারেন নি। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নিয়েছেন। আগামী ১৫ জুলাই থেকে নেতা কর্মীদের নিয়ে বানভাসি মানুষের পাশে দাঁড়াবেন।
জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি জেলা পরিষদ প্রশাসক নুরুল হুদা মুকুট প্রথম দফা বন্যায় মানুষের পাশে ছিলেন। এলাকায় ত্রাণ নিয়েও গেছেন। দ্বিতীয় দফা বন্যায় অসুস্থ হওয়ায় রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন, মঙ্গলবার সুস্থ্য হয়েছেন তিনি।
নুরুল হুদা মুকুট জানান, অসুস্থ্য থেকেই প্রতিদিন সুনামগঞ্জের মানুষের খোঁজ নিয়েছেন তিনি। ওখান থেকেই ঈদের আগে প্রত্যেক ইউনিয়নের জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে ৫০০ করে ত্রাণের পেকেট পাঠিয়েছেন। বণ্ঠনের বিষয়েও খোঁজ নিয়েছেন। শীঘ্রই এলাকায় দুর্দশাগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াবেন বলে জানান তিনি।
জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার এম. এনামুল কবির দাবি করলেন, ভয়াবহ দুর্যোগে তিনি মানুষের পাশে আছেন। ঈদের একদিন আগে ৬০০ বানভাসি মানুষকে গরুর মাংস রান্না করিয়ে খাইয়েছেন। ৭২৫ পরিবারকে ত্রাণ দিয়েছেন। ঢাকা লেডিজ ক্লাবের দেওয়া এক হাজার প্যাকেট ত্রাণ মানুষের মধ্যে পৌঁছে দিয়েছেন। ঈদের পরদিন কয়েক’শ ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে গরুর মাংস রান্না করে খাইয়েছেন। বুধবার সুনামগঞ্জ সদর ও বিশ^ম্ভরপুরের দলীয় নেতা কর্মীদের বন্যা পরবর্তী করণিয় নির্ধারণে মতবিনিময় করবেন।
সুনামগঞ্জ পৌরসভার মেয়র নাদের বখ্ত ১৬ জুন গভীর রাতের ভয়াবহ দুর্যোগের পর ভোর থেকেই বানভাসি মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছেন। পৌরসভায় আশ্রয় কেন্দ্র, পৌরসভার ও তার নিজের পরিবারের পক্ষ থেকে রান্না করা খাবার বিতরণ করেছেন। জেলা প্রশাসনের রান্না করা খাবার বিতরণে সহযোগিতা করা ছাড়াও ঈদের আগে ভিজিএফ’র চাল বিতরণ। খাদ্য সহায়তা বিতরণে সহযোগিতা। ঈদের আগে ব্যক্তিগত ও পরিবারের পক্ষ থেকে বানভাসি অসহায় মানুষদের মাঝে খাদ্য সহায়তা ও নগদ অর্থ বিতরণ করেছেন তিনি। পৌর এলাকার প্রতিটি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের ঘরে পৌঁছার চেষ্টা করছেন তিনি।
জেলা যুবলীগের আহ্বায়ক সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান খায়রুল হুদা চপল প্রথম দফা বন্যায় ত্রাণ নিয়ে দুর্গত গ্রামে গ্রামে গেছেন। দ্বিতীয় দফার দুর্যোগে অসুস্থ্য থাকায় স্বশরীরে আসতে পারেন নি।
খায়রুল হুদা চপল দাবি করেছেন, তিনি স্বশরীরে না থাকতে পারলেও ঈদের আগে ২৫ হাজার পরিবারকে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা পরিষদ, চেম্বার অব কমার্স ও যুবলীগের মাধ্যমে ত্রাণ ও ঈদ সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছেন।
আগামী জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থী হতে আগ্রহী আওয়ামী লীগ নেতাদের মধ্যে তাহিরপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান করুণা সিন্ধু চৌধুরী বাবুল, অ্যাড. রঞ্জিত সরকার, দিরাই-শাল্লায় ব্যারিস্টার অনুকুল তালুকদার ডাল্টন, অ্যাড. শামছুল ইসলাম ঈদের আগে ত্রাণ ও সহায়তা বিতরণ করেছেন। দিরাই-শাল্লায় সৌমেন সেন গুপ্তের পক্ষ থেকে ঈদের আগে ত্রাণ বিতরণ করা হয়েছে।
বিরোধী দল বিএনপির নেতা কর্মীদের মধ্যে জেলা বিএনপির সভাপতি কলিম উদ্দিন আহমদ মিলন, কেন্দ্রীয় বিএনপির সদস্য মিজানুর রহমান চৌধুরী, জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম নুরুল সংগঠনের স্থানীয় এবং কেন্দ্রীয় বিএনপির নেতাদের ত্রাণ বিতরণে সঙ্গী ছিলেন।
দল নির্বাচনে গেলে আগামী জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণে ইচ্ছুকদের মধ্যে এই সংগঠনের জেলা কৃষকদলের আহ্বায়ক আনিসুল হক, তাহিরপুরের সাবেক উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান কামরুল, দিরাইয়ের তাহির রায়হান চৌধুরী পাভেল, ব্যারিস্টার মাহবিন চৌধুরী ঈদের আগে সহায়তা নিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন।
সংসদ সদস্যদের মধ্যে সুনামগঞ্জ-৫ (ছাতক-দোয়ারা) আসনের সংসদ সদস্য জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি মুহিবুর রহমান চৌধুরী মানিক শুরু থেকেই নির্বাচনী এলাকার দুর্গত মানুষের পাশে থেকেছেন। ট্রলারে করে গ্রামে গ্রামে গিয়ে সহায়তা পৌঁছে দিয়েছেন তিনি। গত পাঁচ জুলাই অসুস্থ্যতার কারণে দেশের বাইরে গেছেন। দেশে না থাকায় ঈদের তিনদিন স্বশরীরে মানুষের পাশে থাকা হয় নি তাঁর।
এই সংসদ সদস্যের ব্যক্তিগত সহকারী মোশাহিদ আহমদ জানিয়েছেন, সংসদ সদস্য মুহিবুর রহমান মানিক দেশের বাইরে যাওয়ার আগে দলের নেতা কর্মী ও জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে ইউনিয়ন ভিত্তিক টিম করে দিয়ে গেছেন, দুর্গত মানুষের কাছে ঈদ সহায়তা পৌঁছে দেওয়াসহ ক্রান্তিকালে মানুষের পাশে রয়েছেন এঁরা।
ছাতক পৌরসভার মেয়র আবুল কালাম চৌধুরীও পৌর এলাকায় শুরু থেকেই দুর্গত মানুষের পাশে রয়েছেন।
সুনামগঞ্জ-৪ (সুনামগঞ্জ সদর- বিশ^ম্ভরপুর) আসনের সংসদ সদস্য পীর ফজলুর রহমান মিসবাহ্ও শুরু থেকেই মানুষের পাশে রয়েছেন। ঈদের আগে সরকারি ও ব্যক্তিগত সহায়তা স্বশরীরে উপস্থিত থেকে পৌঁছে দিয়েছেন। ঈদের পরের দিন নির্বাচনী এলাকার বিশ^ম্ভরপুরে পাবলিক বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের একটি অনুষ্ঠানে এবং মঙ্গলবার নিজের হাসননগরের বাসভবনে নির্বাচনী এলাকার মানুষের সঙ্গে ঈদ শুভেচ্ছা বিনিময় করেছেন।
সুনামগঞ্জ-৩ (জগন্নাথপুর-শান্তিগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য সদস্য পরিকল্পনা মন্ত্রী এমএ মান্নান এমপি দুর্যোগের শুরুতে অসুস্থ (করোনায় আক্রান্ত) ছিলেন। তবে ফোনে সব সময় এলাকার খোঁজ রেখেছেন এই জ্যেষ্ঠ রাজনীতিক। সুস্থ্য হবার পর তিনি এলাকায় দুই দফায় এসে চারদিন থেকে রাজধানীতে ফিরেছেন। ঈদের আগে বানভাসি মানুষের ঘরে ঘরে সরকারি খাদ্য সহায়তা পৌঁছে দেওয়াসহ মানুষের পাশে দলের নেতা কর্মীদের দাঁড়ানোর জন্য নির্দেশেনা দিয়েছেন বলে জানান তাঁর ব্যক্তিগত সহকারী হাসনাত হোসাইন।
সুনামগঞ্জ-২ (দিরাই-শাল্লা) আসনের সংসদ সদস্য ড. জয়া সেন গুপ্তাও অসুস্থ্য। তিনি দুর্যোগে মানুষের পাশে থাকতে পারেন নি।
ড. জয়া সেন গুপ্তা দাবি করেন, তিনি নিজে স্বশরীরে এলাকায় না থাকলেও সার্বক্ষণিক খোঁজ খবর নিয়েছেন দুর্দশাগ্রস্তদ দিরাই-শাল্লা বাসীর। দলীয় নেতা কর্মীরা খাদ্য সহায়তা নিয়ে বানভাসি মানুষের ঘরে ঘরে গিয়েছে, তিনি সেই বিষয়ে খোঁজ খবর রেখেছেন। তাঁর ছেলে সৌমেন সেন গুপ্ত ব্যক্তিগত পক্ষ থেকে এলাকার মানুষের জন্য খাদ্য সহায়তা পাঠিয়েছে বলে জানান তিনি।
সুনামগঞ্জ-১ (জামালগঞ্জ-ধর্মপাশা-তাহিরপুর) আসনের সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোয়াজ্জেম হোসেন রতন ঈদ কাটিয়েছেন নির্বাচনী এলাকায়। ঈদের দিন নির্বাচনী এলাকার ধর্মপাশায়, দ্বিতীয় দিন জামালগঞ্জে এবং তৃতীয় দিন মধ্যনগরে ঈদ শুভেচ্ছা বিনিময় করেছেন।