চিকিৎসাকেন্দ্রের একটি অপরিহার্য অনুষঙ্গ হলো অ্যাম্বুলেন্স। সংকটাপন্ন রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে আসা এবং অধিকতর সংকটাপন্ন রোগীদের উন্নত চিকিৎসাকেন্দ্রে স্থানান্তরের জন্য অ্যাম্বুলেন্স এক অবিকল্প উপকরণ। তাই চিকিৎসাকেন্দ্রে উন্নত অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস প্রত্যাশিত থাকে। সরকারি হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত অ্যাম্বুলেন্স থাকে না। যেগুলো থাকে তারও কিছু অংশ থাকে অকেজো। এই সীমাবদ্ধতাকে কাজে লাগিয়ে দেশের প্রতিটি চিকিৎসাকেন্দ্রকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে রমরমা অ্যাম্বুলেন্স বাণিজ্য। গত রবিবার দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত এক সংবাদ থেকে সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স সেবার চরম বেহাল অবস্থা সম্পর্কে কিছু ধারণা পাওয়া যায়। এই হাসপাতালে কেবল একটি সরকারি অ্যাম্বুলেন্স কোনো রকমে জোড়াতালি দিয়ে সচল রাখা হয়েছে। কিন্তু হাসপাতালকে কেন্দ্র করে বেসরকারি প্রায় ২২টি অ্যাম্বুলেন্স রোগী আনা-নেয়ার কাজে জড়িত বলে সংবাদ থেকে জানা যায়। বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সগুলোর মধ্যে কেবল ৫টির ফিটনেস সনদ রয়েছে। বাকিগুলো ফিটনেস সনদ ছাড়াই চলাচল করছে। ফিটনেসবিহীন অ্যাম্বুলেন্সগুলো এতোটাই লক্কর ঝক্কর যে পথিমধ্যে এগুলো বিকল হয়ে পড়ে। এতে চরম সংকটে পড়ে যান রোগীরা। রোগীর এক স্বজন নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে যেয়ে সুনামগঞ্জের খবরকে বলেছেন, তিনি সদর হাসপাতাল থেকে রোগীকে নিয়ে অ্যাম্বুলেন্সে করে সিলেটের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হওয়ার পর পুরাতন বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত যেতেই দুইবার অ্যাম্বুলেন্সের স্টার্ট বন্ধ হয়ে যায়। পরে অন্য আরেকটি অ্যাম্বুলেন্স এনে তিনি রোগী নিয়ে সিলেট পৌঁছান। এজন্য সিলেট পৌঁছাতে তাঁর এক ঘণ্টা সময় বেশি লেগেছে। তিনি বলেন, অন্য অ্যাম্বুলেন্সটি আসতে আরেকটু বিলম্ব হলে পথেই রোগীর মৃত্যু হতে পারত। একজন ফার্মেসি ব্যবসায়ী নিজের চোখে দেখা প্রতিদিনকার অভিজ্ঞতার আলোকে বলেছেন, ‘দুই-চারটা গাড়ি ছাড়া প্রায় সব কয়টি অ্যাম্বুলেন্স নামের গাড়িই বিপদের বাক্স’।
অ্যাম্বুলেন্স মালিকদের সিন্ডিকেট বেশ শক্তিশালী। শক্তিশালী বলেই তারা অবাধে ফিটনেসবিহীন গাড়ি রাস্তায় চালাতে পারেন। তারা এতোটাই বেপরোয়া যে গণমাধ্যমের প্রশ্নের জবাবে বলতে পারেনÑ ‘অ্যাম্বুলেন্সের ফিটনেস থাকা ৫টি গাড়ি রোগী টাইন্না পারে না। এর লাগি আমরা ফিটনেস ছাড়া গাড়ি চালাই’। এইসব ফিটনেসবিহীন অ্যাম্বুলেন্স রাস্তায় কী করে চলাচল করে? এর কিছুটা আভাস পাওয়া যায় হারুন মিয়া নামের এক চালকের কথা থেকে। তিনি বলেছেন, ‘কয়েক বছরে ১৯ বার জরিমানা দিছি। অখনতো গাড়ি চালানোর লাগি কিছু ট্যাক্স দেই, জরিমানা হয় না’। কাকে এই ট্যাক্স দেয়া হয় জানতে চাইলে আরেক চালক তাকে ধমক দিয়ে থামিয়ে দেন। তবে বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয় এই ট্যাক্স কাদের পকেটে ঢুকে। আর এই শক্তিশালী ‘ট্যাক্স’ এর কারণেই যে ফিটনেসবিহীন অ্যাম্বুলেন্সগুলো রাস্তায় চলাচল করতে পারে তাও বোধগম্যতার বাইরে নয়।
রোগী ও রোগীর চিকিৎসা নিয়ে অনৈতিক ব্যবসা আমাদের দেশে নতুন কিছু নয়। অ্যাম্বুলেন্স চালক ও মালিকরাও এই দুষ্ট সংস্কৃতির বাইরে থাকতে চান না। তবে এতে রোগী ও তাদের স্বজনদের কী পরিমাণ দুর্ভোগ ও জীবন-ঝুঁকি বাড়ে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এই বেপরোয়া অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটকে অবশ্যই নিয়ন্ত্রণে আনা উচিৎ। বিআরটিএ এবং ট্রাফিক কর্তৃপক্ষ সহ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই দায়িত্বশীল হতে হবে। এই তিনপক্ষের সহযোগিতা ছাড়া ফিটনেসবিহীন অ্যাম্বুলেন্স কোনোভাবেই সড়কে চলতে পারবে না। এছাড়া সদর হাসপাতালে সরকারি অ্যাম্বুলেন্সের সংখ্যা বাড়াতে হবে। হাসপাতালটি ২৫০ শয্যায় উন্নীত হওয়ায় এখানে আগের চাইতে রোগীর চাপ বেড়েছে। দুঃখের বিষয় হলো হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা বাড়ার পর এখানে নতুন একটি অ্যাম্বুলেন্সও যুক্ত হয়নি। সরকারের দায়িত্বশীলদের প্রতি আমাদের অনুরোধ এই হাসপাতালে কিছু নতুন অ্যাম্বুলেন্স বরাদ্দ এবং বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স সেবাকে মানসম্মত ও নিয়মের ভিতর আনা হোক।