এনামুল হক এনি, ধর্মপাশা
‘আগে আসলে আগে পাবেন।’ তাই কাক ডাকা ভোর থেকেই অসহায় দরিদ্র মানুষজন জড়ো হন ওএমএস এর ডিলারের দোকানের সামনে। যার একটু দেরিতে আসেন তারা পড়ে পেছনে। সারিবদ্ধভাবে লাইনে দাঁড়িয়ে ২০০ জনের মধ্যে থাকতে পারলেই সৌভাগ্যবান মনে হয় নিজেকে এবং তিনি চাল পাবেন এমনটি নিশ্চিত হয়। যারা এই ২০০ জনের তালিকা থেকে বাদ পড়েন তাঁরা বেদনাকাতর হয়ে ফিরেন খালি হাতে। পেছনে পড়া লোকজন আবার পরেরদিন ভোর থেকে চেষ্টা চালিয়ে যান ২০০ জনের মধ্যে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ানোর। এতে কেউ জয়ী আবার কেউ পরাজিত হন। এভাবেই প্রতিদিন নিজের পরিবারের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য
সংগ্রাম করতে হচ্ছে ধর্মপাশা উপজেলাধীন মধ্যনগর থানার অসহায় মানুষজনকে।
শুধু মধ্যনগর থানা নয়, একই চিত্র চোখে পড়ে ধর্মপাশা উপজেলাজুড়ে । সম্প্রতি ফসলরক্ষা বাঁধের কাজে অনিয়ম ও অকাল বন্যার ফলে ধর্মপাশা উপজেলার ৭৮টি হাওরের ২৪ হাজার ৮০০ হেক্টর জমির ফসল পানিতে তলিয়ে যায়। এতে উপজেলার প্রায় সাড়ে তিন লক্ষাধিক জনগণকে খাদ্যসংকটসহ বিভিন্ন রকম দুর্ভোগের মধ্যে পড়তে হয়েছে। খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টিকে মাথায় রেখে সরকারের পক্ষ থেকে ধর্মপাশা উপজেলা সদরে দুজন ও মধ্যনগর বাজারে একজন ডিলারের মাধ্যমে ওএমএস এর কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। প্রয়োজনের তুলনায় বরাদ্দ কম থাকায় চাল-আটা কিনতে আসা মানুষজন প্রতিদিন খালি হাতে ফিরে যাচ্ছেন। ভোর থেকে চাল সংগ্রহের জন্য ডিলারের দোকানের সামনে লম্বা লাইন দেখা যায়। যাদের স্বাস্থ্য ভাল তারা সেই লাইনে টিকে থাকতে পারলেও দুর্বল ব্যক্তিরা ছিটকে পড়েন।
মধ্যনগর বাজারে একজন ডিলারের মাধ্যমে ওএমএস এর কার্যক্রম পরিচালনা করায় শুধুমাত্র মধ্যনগর বাজার ও তার আশপাশের গ্রামের মানুষজন ঘুরে ফিরে এই সুবিধা পাচ্ছেন। কিন্তু মধ্যনগর থেকে দূরে অবস্থিত আরো তিনটি ইউনিয়নের মানুষজন সেই সুবিধা বঞ্চিত হচ্ছেন। একইভাবে ধর্মপাশা উপজেলা সদরে দুইজন ডিলারের মাধ্যমে ওএমএস এর সুবিধা চালু থাকলেও ধর্মপাশা উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নের মধ্যে পাঁচটি ইউনিয়নের দরিদ্র জনগণই সেই সুবিধা পাচ্ছেন না। তবে বুধবার বিকেলে সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসকের বরাত দিয়ে জানা যায়, ওএমএস এর বরাদ্দ দ্বিগুন করা হচ্ছে। যা বৃহস্পতিবার থেকে কার্যকর হতে পারে।
ধর্মপাশা উপজেলার সদর ইউনিয়নের কান্দাপাড়া গ্রামের মকবুল মিয়া ও নোয়াবন গ্রামের শরিফা খাতুন প্রতিদিন ডিলারের দোকানের সামনে লম্বা লাইনে দাঁড়ান কিন্তু তাদের সিরিয়াল আসার আগেই চাল শেষ হয়ে যায়। ফলে তাঁরা একদিনও চাল নিতে পারেননি।
মধ্যনগর ইউনিয়নের জমশেরপুর গ্রামের বাসিন্দা রবীন্দ্র সরকার। তিনি দিনমজুরের কাজ করেন। তিনি বলেন, ‘আমি হত্যিদিন (প্রতিদিন) লাইনে খাড়ইয়া মাত্র দুইদিন চাউল হাইছি। ম্যালা (অনেক) মানুষ অয়। ভীড়ের মধ্যে টিহন (টিকে) যায়না।’
ধর্মপাশা উপজেলা সদরে নিযুক্ত ওএসএম এর ডিলার শওকত আলী বুধবার বিকেলে বলেন, ‘আজ চাল-আটা দুটিই দিয়েছি। তবে চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কম থাকায় মানুষজনকে সামলাতে হিমশিম খেতে হয়। আটার মজুদ আজ শেষ হয়েছে। সুনামগঞ্জ থেকে সরবরাহ করতে পারলে বৃহস্পতিবার আটা দেওয়া হবে। সুনামগঞ্জ থেকে আটা আনতে আমাদের লোকসান হয়।’
মধ্যনগরে নিযুক্ত ওএমএস এর ডিলার সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে তিনি চাল ও আটা বিক্রি শুরু করেন। সরবরাহ না থাকায় আজ (বুধবার) আটা বিক্রি করতে পারিনি। আটা সুদূর সুনামগঞ্জ থেকে সংগ্রহ করতে হয়। যা আমাদের জন্য কষ্টসাধ্য ও সময় সাপেক্ষ।’
মধ্যনগর থানা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক বিদ্যুৎ কান্তি সরকার বলেন, ‘অচিরেই ডিলারশীপ বাড়িয়ে এর বরাদ্দ বাড়ানো দরকার। প্রতিদিন ভোর থেকে মানুষ লাইনে দাঁড়িয়ে যখন খালি হাতে ফিরে যায় তখন কষ্ট লাগে।’
জয়শ্রী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান সঞ্জয় রায় চৌধুরী বলেন, ‘আমার ইউনিয়ন থেকে ধর্মপাশা সদরে পৌঁছাতে একজন ব্যক্তির ১০০ টাকার উপরে খরচ হয় কিন্তু শতেক টাকা খরচ করে ১৫-২০ কিলোমিটার দূরে গিয়ে ওএমএস এর সুবিধা গ্রহণ করা দরিদ্র মানুষের পক্ষে অসম্ভব। যদি আমার ইউনিয়নের বরই, জয়শ্রী ও সানবাড়ি বাজারে পৃথক পৃথকভাবে ডিলারশীপের মাধ্যমে ওএমএস এর কার্যক্রম চালানো হয় তাহলে আমার ইউনিয়নের মানুষজন উপকৃত হবে। বিষয়টি নিয়ে মঙ্গলবার উপজেলা সমন্বয় কমিটির সভায় আলোচনা করা হয়েছে।’
সুখাইড় রাজাপুর উত্তর ইউনিয়ন থেকে ধর্মপাশার দূরত্ব প্রায় ২০ কিলোমিটার। ওই ইউনিয়ন থেকে ধর্মপাশায় পৌঁছাতে একজন ব্যক্তির আসা যাওয়ায় প্রায় ২০০ টাকা খরচ হয়। পাঁচ কেজি চালের জন্য এতো টাকা খরচ করে গরিব মানুষের পক্ষে উপজেলা সদরে আসা অমূলক বলে জানালেন, সুখাইড় রাজাপুর উত্তর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ফরহাদ আহমেদ। তিনি জানালেন, তাঁর জানা মতে এ ইউনিয়ন থেকে এখন পর্যন্ত কেউ ধর্মপাশায় এসে ওএমএস এর চাল কিনেনি।’
ধর্মপাশার সর্ব উত্তরের ইউনিয়ন বংশীকুন্ডা উত্তর। সেখান থেকে মধ্যনগর বাজারের দূরত্ব প্রায় ১৫ কিলোমিটার। ওই ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান বিল্লাল হোসেন বলেন, ‘বংশীকুন্ডা থেকে মধ্যনগরে যেতে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা খরচ পরে। তাই দরিদ্র মানুষ মধ্যনগর গিয়ে ওএমএস এর চাল কিনতে পারছে না। অতি দ্রুত বংশীকুন্ডায় ডিলারশীপের মাধ্যমে ওএসএম ব্যবস্থা চালুর দাবি জানাই।’
চামরদানি ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান জাকিরুল আজাদ মান্না বলেন, ‘সকাল ৯টা থেকে মধ্যনগরে ওএমএস এর ডিলার চাল ও আটা বিক্রয় শুরু করার কথা থাকলে খুব সকালেই তা বিক্রি শুরু করে দেন। ফলে মধ্যনগরের পার্শ্ববর্তী চামরদানি ইউনিয়নের দরিদ্র জনগণ খুব সকালে দুর্গম যাতায়াত ব্যবস্থার কারণে মধ্যনগর বাজারে পৌঁছানের আগেই চাল বা আটা বিক্রি শেষ হয়ে যায়। এই ক্ষেত্রে যদি সকাল ১০টা কি ১১টায় ডিলারের দোকান খোলা হয় তাহলে আমার ইউনিয়নের লোকজন সেখানে গিয়ে চাল বা আটা সংগ্রহ করার সুযোগ পাবেন।’
তবে জাকিরুল আজাদ মান্নার এমন বক্তব্যের বিপরীতে মধ্যনগর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান প্রবীর বিজয় তালুকদার বলেন, ‘দেরিতে চাল বিক্রি শুরু করলে মধ্যনগরের আশপাশের মানুষজনতো আর বসে থাকবে না। তারা ঠিকই আগে থেকে এসে বসে থাকবে। ওএমএস এর কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর থেকেই সকাল ৯টায় ডিলারের দোকান খোলা এবং বিক্রি শুরু হয়। চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কম থাকায় রাত পোহানো সাথে সাথেই অভাবী মানুষজন ডিলারের দোকানের সামনে ভীড় জমায় কিন্তু সবাইতো আর চাল কিনতে পারেনা। যারা আগে এসে লাইনে দাঁড়ায় তারাই শুধুমাত্র চাল বা আটা কিনতে পারে। সবাই যাতে এই সুযোগ নিতে পারে সেজন্য কিছুটা কৌশল করা হচ্ছে। একটি লাইনে প্রথম ২০০ জনকে আজ চাল বা আটা দেওয়া হচ্ছে এবং এই ২০০ জনের পরের তালিকায় যারা আছেন তাঁদেরকে পরেরদিন অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। তবুও স্বল্প বরাদ্দের কারণে বিপুল পরিমাণ মানুষের চাহিদা মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। তাই দ্রুত নতুন ডিলারশীপ নিয়োগ দিয়ে বরাদ্দ বাড়ানো উচিত।’
ধর্মপাশা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মামুন খন্দকার বলেন, ‘এখানে চালের তুলনায় আটার চাহিদা কম। মানুষজন আটা নিতে চায় না। ওএমএস এর চাল বরাদ্দ ও ডিলারশীপ বাড়ানোর ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি এখনো।’
তবে জেলা প্রশাসক শেখ রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ওএমএস এর বরাদ্দ দ্বিগুন করা হয়েছে। আজ (বুধবার) মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে। এটি আগামীকাল (বৃহস্পতিবার) থেকে কার্যকর হতে পারে।’