- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম-১ ঘুড়ি ওড়ানো

স্বপন কুমার দেব
শিরোনাম হিসেবে নামকরণ করে দিয়েছেন সুনামগঞ্জের খবর পত্রিকার সব্যসাচী লেখক কুমার সৌরভ। লেখার বিষয়বস্তু সম্পর্কে মূল আইডিয়া কুমার সৌরভের ও পত্রিকা সম্পাদক পঙ্কজ কান্তি দে’র। উভয়ের ব্যস্ততার কারণে লেখার দায়িত্ব আমার উপরে পড়েছে। আমারও অর্ধেক ব্যস্ততা আর অর্ধেক আলস্যতা। মাঝে মাঝে অসুস্থতা। এর মধ্যেই লেখালেখি। এই লেখা পত্রিকায় প্রকাশিত হবে ঠিকই। কিন্তু অনিয়মিতভাবে। আঁধারের যেমন রূপ আছে, তেমনি অনিয়মেরও একটা নিয়ম আছে। এক কথায় ব্যাখ্যা করা যাবে না। অনুভূতির বিষয়। পাক্ষিক লেখার চেষ্টা করবো। তবে যে দিনই লেখা ছাপা হবে সেই দিনটি হবে বৃহস্পতিবার। এই ধারাবাহিকের বিষয়বস্তু হবে সুনামগঞ্জের বিশেষত: শহর কেন্দ্রিক হারিয়ে যাওয়া বিভিন্ন নস্টালজিক/স্মৃতিজাগানিয়া নানা ঘটনাবলী, কর্মকান্ড ও তৎকালীন সামাজিক অবস্থা ও ব্যবস্থার বিবরণ। আমার লিখিত ‘কিছু মুখ কিছু স্মৃতি’ এ ধরণেরই একটি বই। বলা যায় এই লেখা ঐ বইয়েরই ধারাবাহিকতা। প্রথম স্মৃতি হিসেবে ‘ঘুড়ি ওড়ানো’ নির্ধারণ করা হয়েছে। পঞ্চাশের দশকের শেষ এবং ষাটের দশকের প্রথম ভাগ ছিলো আমাদের মতো প্রবীণদের বাল্য এবং কৈশোর কাল। সুনামগঞ্জ মহকুমা শহর ছিলো বিচ্ছিন্ন এক দ্বীপের মতো। তবে সারা অঙ্গে মমতা মাখানো। যেন দ্বীপের নাম ‘টিয়ারং’। ভরা বর্ষায় চারিদিকে উথাল পাতাল জলরাশি। বাসাবাড়ির উঠানেও জল। সেই সময় বাসাবাড়ি মানে এক একটা কমপ্লেক্স। মূল ঘর বা বড় ঘর এক ভিটায়। রান্নাঘর আরেক ভিটায়। গোয়াল ঘর বা গরু ঘর অন্য ভিটায়। কাচারি ঘর বা বাংলো ঘর সামনের দিকে পৃথক ভিটায়। মাঝখানে উঠান। আদর্শ খামার বাড়ির মতো। বর্ষায় জল উঠলে বাঁশের সাঁকো দিয়ে এক ঘরের সঙ্গে আরেক ঘর যুক্ত করা হতো। কি দারুন মজা। বারান্দায় বসে বড়শী দিয়ে ট্যাংরা মাছ ধরা। প্রবল উত্তেজনা। যাই হোক এক সময় বর্ষা বিদায় হলে শরৎ পেরিয়ে হেমন্তের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে ঘুড়ি বা গুড্ডি ওড়ানোর তোড়জোড় শুরু হয়ে যেতো। ওড়ানোর শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ছিল এক বিশাল কর্মযজ্ঞ। প্রথমে নাটাই, তারপর সুতায় মাঞ্জা বা ধার দেয়া, রঙ্গীন কাগজ আর বাঁশের কঞ্চি (স্থানীয় ভাষায় কামানি) দিয়ে নানা ধরন আর সাইজের ঘুড়ি তৈরী করা শেষে আকাশে ঘুড়ি ভাসিয়ে দেয়া। অত:পর ঘুড়ির লড়াই বা কাটাকাটি (ভোঁ কাট্টা)। নাটাই বানানো যেত আবার তৈরী নাটাই বাজারে কিনতেও পাওয়া যেতো। মাঞ্জা দেয়া ছিল বেশ কঠিন কাজ। কাঁচের গুড়া, কাচমিলিকা বলে একটি রাসায়নিক পদার্থ, এরারুট ইত্যাদি অনেক কিছু একসঙ্গে মিশিয়ে হাড়িতে বেশ কিছু সময় ধরে আগুনে জ্বাল দিয়ে তৈরী করা হতো থকথকে আঠালো পদার্থ ‘মাঞ্জা’। এরপর এক নাটাই থেকে আরেক নাটাইয়ে সুতা টানা। আঁঠালো পদার্থ হাতের মুঠোয় নিয়ে চলন্ত সুতায় আলতো করে ধরে রাখা। সুতা মাঞ্জার ভেতর দিয়ে অতিক্রান্ত হবার সময় ধারালো মশলা সুতায় স্থায়ীভাবে বসে যেতো। তারপর ঘুড়ি উড়িয়ে সমস্ত সুতা ছেড়ে দিয়ে নাটাই খালি করে শীতের রোদে বেশ সময় নিয়ে সুতা শুকানো হতো। সুতা এমন ধার হতো যে আঙ্গুলে লাগলে কেটে গিয়ে রক্তপাত ছিল অনিবার্য। ঘুড়ি তৈরী হতো নানা রঙ্গের আর রকমের। যেমন পেট্কাটা, চৌরঙ্গী, বাব্নাই অনেক বাহারী নাম এবং সাইজ। চাররং এর হলে চৌরঙ্গী, মাঝখানে কাটাকাটি ভাবে দু রং এর হলে পেট্কাটা। অনেক রং এর হলে বাব্নাই ইত্যাদি। ঘুড়ি বানানো এবং মাঞ্জা দেয়া সবাই পারতোনা। আমাদের বন্ধুুদের মধ্যে কেউ কেউ এসব কাজে ছিল অত্যান্ত পটু। আকাশে শুধু ওড়ানো নয়, ছিলো নানা ধরণের কলা কৌশল। গোত্তা খাওয়ানো (ডাইভ), চড়কির মতো ঘুড়ানো কতকিছু। সবচেয়ে উত্তেজনা ছিলো ঘুড়ি যুদ্ধে। আকাশে কার ঘুড়ি অন্য আরেক ঘুড়িকে কাটতে পারে। নাটাই চালকের কৌশলের উপর এক ঘুড়ি আরেক ঘুড়ির উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে আক্রমণ করতো। শুরু হতো যুদ্ধ। সুতায় সুতায় প্যাঁচ। কার সুতা ধারালো বেশী। কখন দিতে হবে হালকা টান। অনেক কিছু। দু’পক্ষই নাটাই থেকে সুতা ছেড়ে দিতেন। ঘুড়ি কখনো ঘুরতো, কখনও টানটান খাড়া, কখনও কোনাকুনি। ফাইটার প্লেনের আকাশ যুদ্ধের মতো। কৌশলী লড়াইয়ে এক সময় একপক্ষের সুতা কাটা পড়তো। পরাজিতের লজ্জা আর বিজয়ীর আনন্দ। কাটা ঘুড়ি ধরতে ছোটদের দৌড় শুরু হয়ে যেতো। যে ধরতো ঘুড়ি তার। সুতা আর পুরোটা নাটাইয়ে ফেরত যেতো না। ছোটরা হাত কেটে হলেও  গড়ানো সুতা হস্তগত করে নিত। ঘুড়ি ওড়ানো নিয়ে শহরে প্রতিবছরই আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিযোগিতা হতো। দূর-দূরান্ত গ্রাম গঞ্জ থেকে অনেকেই দলবল ও ঘুড়ি নিয়ে প্রতিযোগিতায় অংশ নিতেন। এ শহরে ঘুড়ি ওড়ানোর দিন অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে। খোলা আকাশ কিংবা খোলা মাঠ এখন আর নেই। নানা রং এর দিনগুলির মতোই ঘুড়ির রং ফিকে হয়ে গেছে। (চলবে)
লেখক- সিনিয়র আইনজীবী ও কথা সাহিত্যিক

  • [১]