- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

আজিজ পাগলা’র গান জুড়ায় মন প্রাণ

আকরাম উদ্দিন
সত্তর বছর বয়সী সংগীত শিল্পী আজিজ পাগলা। চলার পথে সাথে থাকে হারমোনিয়াম। পথের ধারে সুযোগ পেলেই করেন পীর-মুর্শিদী গান। তাঁর সুললিত মিষ্টি কণ্ঠে গানের সুরে নিমিষেই জমে উঠে মানুষের ভিড়। জেলার বিভিন্ন স্থানে আজিজ পাগলা নামে পরিচিত তিনি। তাঁর জন্ম ভূমি ময়মনসিংহ জেলায়। সাবালক হওয়ার পর আসেন সুনামগঞ্জে। নিজস্ব ঘর-বাড়ি নেই। ঘর না থাকায় ঘরনীও নেই। চির কুমার আছেন এখনও। থাকা-খাওয়া যখন যেখানে। খাস ভূমি বন্দোবস্ত পেতে আবেদনও করেছেন। কিন্তু কাজ হয়নি। তাঁর শেষ ইচ্ছা সরকারী ঘর পাওয়া এবং কুমার জীবন ত্যাগ করে সংসার জীবনে ফিরে আসার।
রবিবার রাত ৮টায় যখন সদর উপজেলার মঙ্গলকাটা বাজারে পৌঁছি, তখন দেখি আজিজ পাগলা মনপ্রাণ খুলে গান ধরেছেনÑ‘আমার মন পাগলে কয়, দিল পাগলে কয়, এ দুনিয়া পাগলা বাবা, পাগল কেবা নয়।’ মটরবাইক থামিয়ে গানের আসরে উপস্থিত হই। বাজারের স্টুডিও ব্যবসায়ী জহির আহমদের দোকান ভর্তি গণ্যমান্য বয়স্ক ব্যক্তি। তাঁরা সবাই পীর-মুর্শিদী গানের ভক্ত। আমিও আসরে বসলাম, গান শুনলাম। ঘরের ভেতরে পিন পতনের শব্দ নেই। চলছে একের পর এক গান। যেন গানের জলসা। তিনি গাইলেনÑ‘বিচ্ছেদের আগুনে পুড়া, আমার সারা কলিজায়, হায় গো সখি, সখিগো যৌবন রাখা দায়’। গাইলেনÑহাছন রাজার গান, ‘লোকে বলেÑবলে রে ঘর বাড়ি ভালা নায় আমার’। ক্বারী আমির উদ্দিনের রচিত খাজা বাবার গান। তখন শ্রোতাদের অনুরোধে একটু দম নিলেন সংগীত শিল্পী আজিজ পাগলা।
এ সময় হাত উঁচিয়ে ইঙ্গিত করলেন ব্যবসায়ী আব্দুর রব। যেন আজিজ পাগলার সাথে কিছু কথা বলি। চা পানের ফাঁকে জিজ্ঞেস করলাম তাঁর নাম পরিচয়। তিনি জানালেনÑদেশ স্বাধীনের পর আসেন সুনামগঞ্জে। জন্মস্থান ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার শাহগঞ্জ ইউনিয়নের লটর হাইয়া গ্রামে। জন্মের পর অবুঝ থাকা অবস্থায় পিতা-মাতা লোকান্তরিত হন। সাবালক হতেই তিনি চলে আসেন সুনামগঞ্জের শহরতলীর মাইজবাড়ি গ্রামের পশ্চিমপাড়ায় বশির মিয়ার বাড়িতে। সেখানে থেকেই চলে তাঁর জীবন জীবিকা।
এই বৃদ্ধ বয়সেও দিনমজুরী কাজ করতে পারেন আজিজ পাগলা। তাঁর কোনো আলস্য নেই। রোজগারের টাকা সবই খরচ করে ফেলেন। সুযোগ পেলেই গান গেয়ে ফিরেন যেখানে সেখানে। কষ্টের সব স্মৃতি ভূলে যেতে চান তিনি। অন্তর-আত্মার তৃপ্তিতে তিনি পীর-মুর্শিদী গান গেয়ে ফিরেন।
তিনি জানান, এখনও বিয়ে করেননি। ঘরনী আনলে ঘর লাগবে। তাই সরকারী খাস ভূমি পেতে একাধিকবার আবেদনও করেছেন। কিন্তু কাজ হয়নি। ঘরের ব্যবস্থা হলে ঘর সংসার করবেন। এই কথায় মৃদ্যু হাসলেন স্কুল শিক্ষক মাসুক মিয়া, ব্র্যাক কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেনসহ উপস্থিত সবাই।
জহির আহমদ বললেনÑ পাগলার বেলা শেষ, কী শখ বিয়ের। মুচকি হাসলেন আজিজ পাগলা। বললেনÑআমাকে মানুষ ভালবাসে। দুনিয়াতে প্রজন্ম রাখতে চাইলে অবশ্য বিয়ে করতে হবে। বয়স যা হোক।
আজিজ পাগলা জানান, তাঁর কোনো সংগীতের ওস্তাদ নেই। সঙ্গীত শেখার কোনো প্রশিক্ষণও নেই। তবুও মানুষ গান শুনে। ভালবেসে মানুষ খাবার দেয়, থাকার জায়গাও দেয়। এখানকার মানুষ আমাকে ভালবাসে, আমিও ভালবাসি। তাই জন্মস্থানে ফিরে যাচ্ছি না। এ কথা বলেই তিনি আরেকটি গান ধরলেন শাহ আব্দুল করিমের। ‘কেন পিরিতি বাড়াইলে রে বন্ধু, ছেড়ে যাইবায় যদি। কেমনে রাখিব তোর মন, আমার আপন ঘরে বাদি রে বন্ধু, ছেড়ে যাইবা যদি।’

  • [১]