- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

আজ বিশ্ব পানি দিবস পানির স্তর নিচে নেমে গেছে টিউবওয়েলে পানি উঠে না

বিন্দু তালুকদার
মহিলারা টিউবওয়েল থেকে চাপ দিয়ে পানি তুলতে পারেন না। তাই নিজেই জগ নিয়ে পানি আনতে গিয়েছিলেন ষোলঘরের বাসিন্দা বিমল দাস (৪৫)। এক জগ (৩ থেকে ৫ লিটার) পানি তুলতে প্রায় আধ ঘণ্টা টিউবওয়েলের হাতল চাপতে হয়েছে তাকে। এক জগ পানি তুলে হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন না এভাবে এত কষ্ট করে পানি তোলার ছেয়ে সাপ্লাইয়ের পানি খাওয়াই ভাল। রবিবার রাতে ষোলঘর এলাকার নদী পাড়ের টিউবওয়েল থেকে পানি তুলার সময় এভাবে কষ্টের কথা বলছিলেন বিমল দাস।   
শুধু ষোলঘরের বিমল দাসই নয়। সুনামগঞ্জ পৌরসভা এলাকার শত শত টিউবওয়েল থেকে আগের মত স্বাভাবিক অবস্থায় পানি তোলা সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এমনকি বৈদ্যুতিক মটর দিয়ে পানি তোলা কঠিন হচ্ছে। ৫০০ লিটারের একটি পানির ট্যাংকি ভরতে কয়েক ঘণ্টা সময় লাগছে। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন পানি গ্রাহকরা। বিশেষ করে নদী পাড়ের টিউবওয়েলে এই সমস্যা বেশী । দিনের বেলা এমনকি মধ্য রাত পর্যন্ত অনেক বাসায় মোটর দিয়ে পানি তোলা যায় না বলে জানিয়েরেছন শহরের একাধিক বাসিন্দা। তারা বলেছেন, রাত দুইটা/তিনটার সময় মোটর ছাড়লে সামান্য পরিমাণ পানি উঠে। তারা রাত জেগে পানি তুলেন। পানি তুলতে গিয়ে রাতের ঘুম নষ্ট হচ্ছে এইসব শহরবাসী নাগরিকগণের। ক্রমাগত রাত জাগার কারণে অনেক ব্যক্তির অসুস্থ হয়ে পড়ার খবরও জানা যায়।
জেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাহবুবুর রহমান জানিয়েছেন, এঅবস্থা শুধু সুনামগঞ্জ শহরবাসীর নয় পুরো জেলাবাসীর। সুনামগঞ্জের ন্যায় দেশেজুড়ে এই সমস্যা বিরাজ করছে। মাটির নিচের পানি উত্তোলন হ্রাস করতে সরকার ও বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থা কাজ করে যাচ্ছে।
হাছননগরের বাসিন্দা রফিক মিয়া বলেন, ‘ভাই যেখানে ৩-৪ মিনিটে কল (টিউবওয়েল) থাইকা এক কলসি পানি ভইরা যাইত এখন আধঘণ্টায়ও একজগ পানি তুলা যায় না। পাড়ার সব কলেই এই সমস্যা দেখা দিছে। পানি নাকি মাটির নিচে নাইমা গেছে।’
নতুনপাড়ার বাসিন্দা সৌরভ সরকার বলেন,‘ গত একমাস ধরেই টিউবওয়েল থেকে পানি পাওয়া যাচ্ছে না। হাতে চেপে পানি তোলা সম্ভব হয় না। এমনকি মটর দিয়েও পানি তোলা কঠিন হয়ে পড়েছে। প্রতি বছরই এই মৌসুমে পানির সমস্যা দেখা দেয়।’
জেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, প্রতি বছর শুকনো মৌসুমে ফাল্গুন, চৈত্র ও বৈশাখ মাসে পানির স্তর ভূপৃষ্ঠ থেকে নিচে নেমে যাওয়ার কারণে এই তিন মাস টিউবওয়েল থেকে পানি তোলা কঠিন হয়ে যায়। সাধারণ টিউবওয়েলগুলোর পাইপ ২৫ ফুট গভীর পর্যন্ত পানি উত্তোলনের ক্ষমতা থাকায় পানির স্তর এর নিচে পড়লে টিউবওয়েল থেকে পানি উঠানো কঠিন হয়ে পড়ে। সারা দেশে ভূগর্ভস্থ পানির মাত্র সাড়ে ১২ থেকে ১৩ ভাগ পানি মানুষ পান করছে। অবশিষ্ট ৮৭ ভাগ ভূগর্ভস্থ পানি চাষাবাদে সেচের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে দিনে দিনে মাটির নিচের পানি কমে যাচ্ছে এবং পানির স্বাভাবিক স্তর নিচে নামতে শুরু করছে।
জানা যায়, পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার বেশী সমস্যায় ভোগেন জেলা সদরের পৌরসভা এলাকা, ছাতক ও দক্ষিণ সুনামগঞ্জের কিছু এলাকার মানুষ। জেলা সদরের পৌরসভা এলাকায় পানির স্তর স্বাভাবিক স্তরের ২৭ থেকে অন্তত ৩৫ ফুট পর্যন্ত নিচে নেমে যায়। ছাতকের পৌরসভা এলাকা, সদর ও নোয়ারাই ইউনিয়ন এলাকায় পানির স্তর ২৫ থেকে ৩২ ফুট পর্যন্ত নিচে নেমে পড়ে। দক্ষিণ সুনামগঞ্জের জয়কলস ইউনিয়নের উপজেলা পরিষদ এলাকা, শান্তিগঞ্জ, উজানীগাঁও, ডুংরিয়া ও জয়কলস গ্রামের আশপাশে ২৫ থেকে ৩০ ফুট পর্যন্ত নিচে নেমে যায়। এছাড়া জেলার অন্যান্য উপজেলাগুলোতে ১৫ থেকে ২০ ফুট পর্যন্ত পানির স্তর নিচে নামে। অন্য এলাকাগুলোতে তেমন সমস্যা না হলেও তিনটি এলাকায় সমস্যাই বেশী। জেলার পানির স্তর নিচে নামা ও করণীয় বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি পাঠিয়েছেন জেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের বিভিন্ন উপজেলা প্রকৌশল বিভাগ।
দক্ষিণ সুনামগঞ্জের জয়কলস ইউনিয়ন সুলতানপুর গ্রামের বাসিন্দা এমএ কাসেম বলেন, ‘প্রতি বছরই এই সময়ে (ফাল্গুন-চৈত্র মাস) পানি নিয়ে ভোগতে হয় গ্রামের লোকজনকে। টিউবওয়েলে ৬০ বার চাপ দিলে বালতি ভরা সম্ভব হয় না। ’
জেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাহবুবুর রহমান বলেন,‘ সুনামগঞ্জ পৌরসভা এলাকার কোথাও কোথাও ৩০-৪০ ফুট পর্যন্ত পানির স্তর নেমে পড়েছে। তাই টিউবওয়েল থেকে পানি তোলা কঠিন হচ্ছে। বৃষ্টিপাত ও বর্ষা না আসা পর্যন্ত এই সমস্যা থাকবে। জলাশয় ভরাট, মাটির উপরে অধিকহারে পাকা বসত-বাড়ি, রাস্তা নির্মাণ করায় পানি নিষ্কাষিত হয়ে নিচে নামার সুযোগ দিনে দিনে কমে যাচ্ছে। যার দরুন এই সমস্যা প্রতি বছর বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। পুকুর ও নদীর পানি প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে। এসব বিষয়ে সকলকে সচেতন হতে হবে।’

  • [১]