- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

আতঙ্ক আছে এখনো, হামলাকারীদের বিচার চান গ্রামবাসী

স্টাফ রিপোর্টার
শাল্লায় হিন্দু অধ্যুষিত পল্লী নোয়াগাঁওয়ে হেফাজত অনুসারীদের হামলা, লুটপাট ও মন্দির ভাংচুরের নারকীয় ঘটনার এক বছর আজ (১৭ মার্চ)। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশত বার্ষিকীর দিনে হেফাজতের ব্যাজ ধারণ করে নেতাদের নামে স্লোগান দিয়ে হাজারো সশস্ত্র হেফাজত সমর্থক ধর্ম অবামনার গুজব ছড়িয়ে গ্রামে ঢুকে হামলা, লুটপাট ও ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। এ ঘটনায় তিনটি পৃথক মামলা দায়েরের পর প্রায় দেড় শতাধিক হামলাকারীকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ। গ্রামবাসী এখনো চেনা মানুষদের এই জঙ্গি আক্রমণের দৃশ্য ভুলতে পারছেন না। তারা দোষীদের কঠোর শাস্তি দাবি করেছেন।
গত বছরের ১৭ মার্চ শাল্লার নোয়াগাঁওয়ে হামলা ও লুটপাট চালিয়েছিলো কয়েকশ হিং¯্র মানুষ। ধারাইন নদী না থাকলে ঘটনার ভয়াবহতা আরও বেশি হতো। ঘটনার সূত্রপাত ২ দিন আগে। ২০২১ সালের ১৫ মার্চ দিরাই উপজেলায় মাওলানা মামুনুল হক সমাবেশ করে সাম্প্রদায়িক কথাবার্তা বলেন। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে পার্শ্ববর্তী উপজেলা শাল্লার নোয়াগাঁও গ্রামের যুবক ঝুমন দাস সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ১৬ মার্চ মাওলানা মামুনুল হকের সমালোচনা করে একটি স্ট্যাটাস দেয়। তাতে হেফাজতে ইসলামের অনুসারীরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। তারা সংঘবদ্ধ হয়ে রাতে হামলার চেষ্টা করে। সচেতন জনতার বাধায় রাতে হামলা করতে পারে নি। রাতেই গ্রামবাসী ঝুমন দাসকে পুলিশের হাতে তুলে দেয়।
পরদিন ১৭ মার্চ দিরাই উপজেলার নাচনি, চ-িপুর, সরমঙ্গল, সন্তোষপুর ও শাল্লা উপজেলার কাশিপুর, ধনপুরসহ কয়েকটি গ্রামের মসজিদ থেকে ধর্ম অবমাননার গুজব ছড়ায়। তাদের আহ্বানে কয়েকটি গ্রামের মানুষ দেশিয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে সকালে নোয়াগাঁও গ্রামে এসে হামলা চালায়। হেফাজতের একশন, মামুনুলের একশন, একশন বলে স্লোগান দিয়ে সশস্ত্র লোকজন গ্রামে আসার সময় স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশকে খবর দেয়। পুলিশ নোয়াগাঁওয়ে পৌঁছানোর আগেই হামলাকারীরা দারাইন নদী পেরিয়ে গ্রামে ঢুকে ৮৮ টি বাড়িঘর ভাংচুর ও লুটপাট করে। ৭ টি পারিবারিক মন্দির ভাংচুর ও লুট করে। আক্রমণকারীদের ভয়ে পালিয়ে যান গ্রামের নারী পুরুষ।
হামলার ঘটনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লাইভ করে বীরত্ব দেখায় হামলাকারীরা। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও জাতির জনকের জন্মশত বার্ষিকীতে সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর এই হামলায় ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন দেশ বিদেশের বিবেকবানরা। র‌্যাবের মহাপরিচালকসহ প্রশাসন ও আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সবাই গ্রামে ছুটে এসে বিচারের আশ্বাস দেন। গ্রামে অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন হয়। আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও কমিউনিস্ট পার্টির শীর্ষ প্রতিনিধিদলসহ সরকারের মন্ত্রীরাও গ্রামে এসে নিন্দা জানিয়ে দোষীদের বিচারের আশ্বাস দেন।
এ ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে চাকুরি থেকে বরখাস্ত করা হন শাল্লা থানার নাজমুল হক ওসি। তাৎক্ষণিক বদলি করা হয় দিরাই থানার ওসিকে। প্রায় দেড় হাজার মতো হামলাকারীকে আসামি করা হয়। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া ১৫০ জনের মতো আসামি বর্তমানে জামিনে রয়েছেন। গ্রামবাসী ওই দিনের নির্মমতা ভুলতে পারছেন না। নারী ও শিশুদের মধ্যে এখনো আতঙ্ক বিরাজ করছে। তারা হামলায় জড়িত সকল আসামির বিচার দাবি করেছেন।
নোয়াগাঁওয়ের বাসিন্দা সুবাশ চন্দ্র দাস বললেন, হামলার ঘটনা এখনও ভুলতে পারিনি। এখনও সেই তা-বের দৃশ্য চোখে ভাসে। যারা হামলা করেছিল, তাদের সঙ্গে আমাদের চলাফেরা বহুদিনের। কিন্তু তারা মুহূর্তেই রূপ বদলে নিয়েছিল।
বীর মুক্তিযুদ্ধা জগৎ চন্দ্র দাস বললেন, আমরা একটি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গঠনের জন্য মুক্তিযুদ্ধ করে দেশকে স্বাধীন করেছি। এক বছর আগে আমাদের উপর যেরকম হামলা হয়েছে, তা কখনও কল্পনাও করিনি। যারা এরকম ঘটনার সঙ্গে জড়িত তাদের বিচার চাই আমরা।
দিরাইয়ের রামজীবনপুরের পূত্রবধূ চম্পা রানী দাস। তিনি নোয়াগাঁওয়ের মেয়ে। তিনি বলেন, আমরা দুই বোন। বড় বোন বন্যা রানী দাস খালিয়াজুড়ির বলিচাকুয়া গ্রামে বিয়ে হয়েছে। গত বছর দুই বোন বাবার বাড়িতে কীর্তনে এসেছিলাম। হঠাৎ করে শুনি হাজারও মানুষের চিৎকার। বাড়ির পেছনে গিয়ে দেখি দেশীয় অস্ত্রসন্ত্র নিয়ে লোকজন আসছে আমাদের গ্রামের দিকে। আমরা যে যেদিকে পারি দৌঁড়ে জীবন বাঁচাই। রাতে থেকেছি দূরের গ্রামের পিসির বাড়িতে। সেই ভয়ে এবারের কীর্তনে আসতে চাই নি। বাবা রাগারাগি করায় এসেছি।
ঝুমন দাসের মা নিভা রানী দাস হামলাকারীদের বিচার ও ছেলের বিরুদ্ধে করা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানালেন।
শাল্লা উপজেলা আইন শৃঙ্খলা কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আবু তালেব বললেন, এখন শাল্লা উপজেলার আইনশৃঙ্খলার পরিস্থিতি সার্বিকভাবে খুবই ভালো। মামলা নেই বললেই চলে। ছোটখাটো ঝামেলা গ্রাম আদালতের মাধ্যমেই নিষ্পত্তি হয়। থানায় মামলার সংখ্যা খুবই কম। নোয়াগাঁওয়ের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও ভালো। গত বছরের ১৭ মার্চের ঘটনার পর এধরনের কোনো পরিস্থিতি কখনোই তৈরি হয় নি।

  • [১]