মল্লিকপুরের হতভাগিনী গৃহবধূর শেষ পর্যন্ত আত্মহননের মতো চূড়ান্ত পথটি বেছে নেয়া থেকে সমাজে নারীর অধস্তন অবস্থানের দুর্ভাগ্যজনক চিত্রটি আবারও সকলের সামনে ফুটে উঠেছে। সংবাদপত্রে প্রকাশিত সংবাদ অনুসারে স্বামীর পরকীয়া আটকাতে না পেরে তিনি নিজেকেই মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়ার মত পথ অবলম্বন করেছেন। অথচ এই নারীর তিন তিনটি শিশু সন্তান রয়েছে। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়, মহিলার আত্মহননের জন্য গলায় ফাঁস লাগানোর দৃশ্যটি বাহির থেকে কাঁচের জানালা দিয়ে দেখে ফেলেছিলো তার দ্বিতীয় শ্রেণি পড়–য়া কন্যা। হতবিহ্বল কন্যাটি তারস্বরে মাকে এ পথে না যাওয়ার কাকুতি মিনতি করে। কিন্তু তার মা তখন পৃথিবীর যাবতীয় মায়া-মমতা ¯েœহ-ভালবাসার বন্ধন কাটিয়ে নিজের গন্তব্য বুঝে নিয়েছেন। নিজের কন্যার আর্তি তার অন্তরে পৌঁছায় না। কন্যাটি উপায়ন্তর না দেখে ডেকে আনে মামাকে। এই মামাও আরেক শিশু, ৭ম শ্রেণির ছাত্র। তারা জানালার কাঁচ ভেঙ্গে ফেলেছিল। মোবাইলে খবর পৌঁছে দিয়েছিল বড়দের। কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ। মহিলা নিজ গন্তব্যে পৌঁছে গিয়েছেন। কী করুণ দৃশ্য, চিন্তা করা যায়? দুই শিশুর সামনে তাদের একজনের মা অন্যজনের বোন মারা যাচ্ছে। তারা কিছুই করতে পারছে না। বিপরীতে মৃত্যুর স্পর্শ পেতে উদগ্রীব হয়ে উঠা এই মহিলা দুনিয়ার যাবতীয় ভালবাসাকে দু’পায়ে মাড়িয়ে নিজের ইচ্ছাকে বাস্তবায়ন করেছেন। এই দৃশ্য দুই শিশুকে সারা জীবন তাড়িয়ে বেড়াবে। এদের মানসিকতায় এর প্রভাব হবে বহু বিচিত্র। মহিলাটি আত্মহননের আগে চিরকূট লিখে রেখে গেছেন যেখানে তিনি মৃত্যুর জন্য নিজের স্বামীকে দায়ী করে গেছেন। আত্মহত্যার জন্য দায়ী স্বামীকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। এ ঘটনায় মামলা হয়েছে। বিচারে হয়ত দোষ প্রমাণিত হলে স্বামীটির বেশ বড় সাজা হবে। কিন্তু এই বিচারের ফলে ফিরে আসবে না জীবন থেকে পালিয়ে যাওয়া এক নারী। একটি বিভিষিকাময় দিনের কথা মুছবে না দুই শিশুর মন থেকে। কেমন সমাজ বাস্তবতায় আমাদের বসবাস, পুরুষরা কতোটা দাপুটে জায়গায় নিজেদের অধিষ্টিত করে রেখেছে, তা প্রমাণ করতেই যেন নিজের জীবন দিয়ে এক জ্বলন্ত প্রমাণ দিয়ে গেল ওই নারী।
আত্মহনননের পথ বেছে নেয়া ওই নারীটি কোন অবস্থাতেই সাহসী নয়। সে প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হয়েছে। সে নিজ সন্তানদের জীবনের কথা ভাবে নি। এই মহিলা আসলে মানসিকভাবে পঙ্গু হয়ে পড়েছিল বেশ আগেই, বুঝা যায় পূর্বাপর ঘটনার দিকে তাকালে। আত্মহত্যা কোন সমাধান নয় জেনেও তার সামনে আর কোন পথ খোলা ছিল না বলে তার মনে হয়েছে। সে ভাবে নি এরূপ অবস্থায় রাষ্ট্রে আইনি প্রতিকার পাওয়ার বহু সুযোগ রয়েছে। মহিলাটি একটি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে চাকুরি করতেন বলে জানা যায়। অর্থাৎ তিনি মোটামোটি শিক্ষিতও। তার এরকম নুইয়ে পড়া অবস্থা আমাদেরকে অবাক করেছে। তিনি যদি এরকমটি না করে প্রতিরোধী হয়ে উঠতেন তাহলেই ছিল সমাজের নিজের পরিবারের মঙ্গল। সেটি তিনি পারেন নি, এটিও সমাজে নারীর অবস্থান কোথায় তার পরিচায়ক।
যে শিশুদের সামনে এই মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটেছে তারা যাতে মানসিকভাবে ট্রমাগ্রস্ত না হয় সেজন্য তার পরিবারের লোকজনের খেয়াল রাখা জরুরি।