আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, ‘জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন বাতিল সংক্রান্ত মামলা উচ্চ আদালতে বিচারাধীন। আর দল হিসাবে জামায়াতে ইসলামীর যুদ্ধাপরাধ বিচারের জন্য আইনের খসড়া মন্ত্রীপরিষদ বিভাগে জমা আছে।’ মন্ত্রী শুক্রবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশ আইন সমিতির ৩২তম বার্ষিক সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন। মন্ত্রীর কথা থেকে যে জিনিসটি সকলের সামনে উঠে এসেছে, জামায়াতের যুদ্ধাপরাধ বিচারের প্রক্রিয়াটি ধীরে হলেও অগ্রসর হচ্ছে। ইতিহাসের চরম সত্য হলো, ধর্মীয় লেবাসধারী এই দলটি একাত্তরে সারা দেশে হত্যা, নির্যাতন, লুণ্ঠন, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ এর বিভীষিকা কায়েম করেছিল। দলটি নিজেদের সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত মোতাবেক সারা দেশে পাকিস্তানকে টিকিয়ে রাখার জন্য গড়ে তুলেছিল আলবদর, আলশামস প্রভৃতি সামরিক বাহিনির সহযোগি সংগঠন। এরা স্বাধীনতার পক্ষের ব্যক্তি, সংখ্যালঘু নারী-পুরুষ-শিশু-বৃদ্ধাদের উপর যে বিভৎস নির্যাতন করেছিল এমন নৃশংসতা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। স্বাধীনতার পর থেকেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি ছিল একটি জনদাবি। কিন্তু সেই দাবি আর পূরণ হচ্ছিল না। বরং যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত সেইসব ব্যক্তিবৃন্দ উঠে এসেছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায়। এরা সংসদ সদস্য, মন্ত্রী হয়ে দেশ শাসনে অংশ নিয়ে ত্রিশ লক্ষ শহীদের প্রতি তীব্র উপহাস ছুঁড়ে দিয়েছিলেন। এই গোষ্ঠী রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে গড়ে তুলে বিশাল সম্পদভা-ার। অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে মহাশক্তিধর হয়ে উঠে তারা। এই ক্ষমতা ব্যবহার করে সাংগঠনিকভাবেও বেড়ে উঠে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী দল জামায়াত। এরপর বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর শুরু হয় যুদ্ধাপরাধের বিচার। শীর্ষস্থানীয় কয়েকজনের দ- কার্যকর হয়েছে ইতোমধ্যে। কিন্তু মানুষ দাবি জানিয়ে আসছিলেন দল হিসাবে জামায়াতের বিচার। আইনী সীমাবদ্ধতার কারণে জামায়াতের যুদ্ধাপরাধ বিচার শুরু করা যায় নি। আইনমন্ত্রী কথিত আইনটি পাস হলে এই প্রক্রিয়াও শুরু হবে বলে আশা করা যায়। এই কাজটি যত তাড়াতাড়ি শেষ করা যাবে তত তাড়াতাড়ি ঘটবে আমাদের ইতিহাসের দায়মোচন।
প্রশ্ন হচ্ছে, দল হিসাবে জামায়াতের বিচার শেষ করলেই কি এই দলটির অপআদর্শ বিলুপ্ত হয়ে পড়বে? ইতিহাস বলে, এরা সুযোগসন্ধানী, ঘাপটি মেরে সুযোগের অপেক্ষায় বসে থাকা দল। একাত্তরের পর যেমন আইডিএল নামের ছদ্মাবরণে এরা সংগঠিত হতে পেরেছিল তেমনি ভবিষ্যতেও এমন সম্ভাবনা প্রবল। তাই দলের বিচারের পাশাপাশি এই ধরনের অপআদর্শ সমাজ থেকে দূর করতে ব্যাপক সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়া শুরু করা দরকার। এরা অর্থবিত্তে এখনও যথেষ্ট শক্তিশালী। অর্থ দিয়ে এখনও এরা কর্মী লালন পালন করে চলেছে। এই অবৈধ অর্থের উৎস আইনি পন্থায় বন্ধ করে দিতে হবে। আমাদের তরুণ প্রজন্মের সামনে এমন এক আদর্শিক বাস্তবতা গড়ে তুলতে হবে যাতে করে তারা কখনও জামায়াত বা তদনুরূপ বিভ্রান্ত দলের প্রচারণায় মোহগ্রস্ত হতে না পারে। রাষ্ট্রের সর্বক্ষেত্রে স্থাপন করতে হবে সততা, স্বচ্ছতা ও প্রগতির বাতাবরণ। সমাজ থেকে যাবতীয় বৈষম্য দূর করতে হবে। আমাদের বেড়ে উঠা বালক কিশোর তরুণ যুবকরা এই আদর্শ দেখে স্বাধীনতার মূলবোধের প্রতি অনুরক্ত হবে। তখন জামায়াতের ভ্রান্ত মতবাদকে ঝেটিয়ে বিদায় করবে তারাই। এই অবস্থা তৈরি না করা পর্যন্ত দল জামায়াতের বিচার করা হলেও এই অপআদর্শের বিলোপ সাধন করা সম্ভব নয়। র্