- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

আদালতের যুগান্তকারী রায়, সুনামগঞ্জে ৫০ দম্পত্তির দাম্পত্য জীবনে ছন্দপতনের অবসান হলো

স্টাফ রিপোর্টার
কেউবা একে অপরকে ভালবেসে, কেউ পারিবারিক সিদ্ধান্তে একই ছাদনাতলার বাসিন্দা হয়েছিলেন। দুজনের গভীর ভালোবাসাও ছিল। কিন্তু পারিবারিক কলহ, ভুল বুঝাবুঝি, যৌতুক চাওয়া, শারীরিক-মানসিক নির্যাতন ইত্যাদি নানা কারণে সুখ পালিয়েছিল তাদের। পারিবারিক, সামাজিক সালিসে বিরোধের নিষ্পত্তি না হওয়ায় দাম্পত্যের ছন্দপতন ঘটে তাদের। রাগ-অভিমান থেকে এক পর্যায়ে তাদের কলহ আদালত পর্যন্ত গড়ায়। এমন ৫০ দম্পত্তিকে আবারও সুখের বন্ধনে ফিরিয়ে দিলেন সুনামগঞ্জের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক। মঙ্গলবার দুপুরে দেওয়া আদালতের এই যুগান্তকারী রায় বিচ্ছিন্ন হওয়া যুগলদের আবার এক হওয়ার সুযোগ তৈরি করে দিলো। এই রায়ে তাদের সন্তান-সন্ততির মুখেও হাসি ফুটেছে।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে নিজেদের স্বামীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে পৃথক মামলা করেছিলেন সুনামগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলার ৫০ নারী। মামলা দায়েরের পর সুখে ছিলেন না এরা কেউই। স্ত্রী সন্তান সন্ততিদের নিয়ে উদ্বাস্তুর মতো জীবন কাটাচ্ছিলেন তারা । স্বামীরা অসহনীয় কষ্টে ছিলেন। সন্তানদের কান্নাও ছিল অবিরল ধারায় । এরকম ৫০ দম্পতিকে সুখী জীবনে ফেরানোর প্রয়াস হিসাবে সুনামগঞ্জের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. জাকির হোসেন’এঁর উদ্যোগের প্রশংসা করলেন ভুক্তভোগিরাও।
জেলার দিরাই উপজেলার রনারচরের জুনাইদ মিয়া ও আম্বিয়া বেগম তিন বছর আগে পারিবারিক সিদ্ধান্তে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। বিয়ের পর থেকেই টুকটাক বিষয় নিয়ে ঝগড়া হতো তাদের। পারিবারিক ও গ্রামীণ সালিসে এই ঝগড়া মিটমাট না হওয়ায় মামলা করেছিলেন আম্বিয়া বেগম। জুনাইদ মিয়া এই মামলায় জেল কেটেছেন। অনেকদিন হাজিরাও দিয়েছেন। আদালত তাদের এই ঝগড়া মিটিয়ে একসঙ্গে বসবাস করার রায় দিয়েছেন। রায়ে খুশি হয়ে আম্বিয়া বেগম বললেন, ‘আমি বুঝতে পেরেছি, আমার স্বামীর কোন দোষ নেই। আমরা এখন একসঙ্গে থাকবো। আমার সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য একসঙ্গে থাকা প্রয়োজন।’
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার মঙ্গলকাটার কালা সিকন্দর ও তার স্ত্রী মোছাম্মৎ সুরমা বেগমও খুশি। বললেন,‘বহুত হয়রানি হয়েছি দুজন, আদালত দুজনকেই রক্ষা করেছেন।’
আদালতের রায়ে সকল মামলার বাদী-বিবাদী, তাদের আইনজীবী ও পরিবারের লোকজন ছিলেন উচ্ছ্বসিত। আবেগে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে চোখের পানিও ঝরিয়েছেন। আদালতের কর্মীরা ফুল তুলে দিলেন ৫০ দম্পত্তিকে।
আদালতের আপোসনামায় ৫০ দম্পতি অঙ্গীকার করেন, সন্তানাদি নিয়ে পরিবারের অন্যদের সঙ্গে সদ্ভাব বজায় রেখে শান্তিপূর্ণভাবে সংসার ধর্ম পালন করবেন তাঁরা। সংসারে শান্তি বিনষ্ট হয় এমন কোনো কাজ করবেন না। স্বামী-স্ত্রী উভয়কে যথাযোগ্য মর্যাদা দেবেন। স্বামী তার স্ত্রী বা তার মা-বাবা ও অভিভাবকের কাছে যৌতুক দাবি করবেন না। পারিবারিক বিষয় নিয়ে মনোমানিল্য ও বিরোধ দেখা দিলে নিজেরা আলাপ-আলোচনা করে সমাধান করবেন। স্বামী কখনো স্ত্রীকে নির্যাতন করবেন না, স্ত্রীকে নির্যাতন করলে বা যৌতুক দাবি করলে স্ত্রী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবেন।
দুদকের পিপি টিআইবির সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) সভাপতি অ্যাডভোকেট আইনুল ইসলাম বললেন, আদালতের এমন রায় উদাহরণ হয়ে থাকবে। পারিবারিক বিশৃঙ্খলা কমবে। নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের মামলাও কমবে।
সুনামগঞ্জ নারী ও শিশু নির্যাতন আদালতের পিপি অ্যাডভোকেট নান্টু রায় বললেন, আদালত পৃথক ৫০টি নারী-শিশু নির্যাতন দমন মামলায় একসঙ্গে যুগান্তকারী একটি রায় দিয়েছেন। আদালতে যে শুধু শাস্তি হয়, তা নয়, পরিবারে শান্তিও ফেরানো হয়। রায়ে সেটিই বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে।

  • [১]