বিজয় রায়, ছাতক
ছাতকে আদিবাসী শিক্ষার্থীদের সরকারি উপবৃত্তির টাকা আত্মসাত করতে গিয়ে হাতে নাতে ধরা পড়েছে স্থানীয় মনিপুরী সমাজকল্যাণ পরিষদের সভাপতি নিশিকান্ত সিংহ। অবশেষে নিশিকান্ত সিংহ রবিবার উপবৃত্তির সাকুল্য টাকা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে ফেরত দিতে বাধ্য হয়।
বৃহস্পতিবার উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নের সীমান্তর্তী ধনীটিলায় আদিবাসী সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে উপবৃত্তির টাকা বণ্টনকালে আত্মসাতের বিষয়টি ধরা পড়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছে। উপবৃত্তির টাকা বিতরণে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়টি ধরা পড়লে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মামুনুর রহমানের তোপের মুখে পড়েন পরিষদের সভাপতি নিশিকান্ত সিংহ। তাৎক্ষণিক উপবৃত্তির টাকা বিতরণ বন্ধ করে দেন তিনি। উপবৃত্তির টাকা প্রত্যেক শিক্ষার্থীর খামে ৪০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা পর্যন্ত কম দিয়ে প্রায় ৭২ হাজার টাকা আত্মসাত করার চেষ্টা করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তহবিল থেকে প্রদত্ত আদিবাসী শিক্ষার্থীদের মধ্যে উপবৃত্তির টাকা আনুষ্ঠানিক বিতরণের জন্য ৯ জুন বৃহষ্পতিবার ধনীটিলায় যান উপজেলা চেয়ারম্যান ফজলুর রহমান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মামুনুর রহমান, উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান আবু সাদাত লাহিন, মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান লিপি বেগম ও ইউআরসি ইন্সট্রাকটর মোস্তফা আহসান হাবীব। ওইদিন প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও কলেজ পর্যায়ের ৭০ জন আদিবাসী শিক্ষার্থীদের মধ্যে আনুষ্ঠানিক ভাবে টাকা বিতরণের কথা ছিলো। কিন্তু উপবৃত্তির টাকা বিতরণের আগেই থলের বিড়াল বেড়িয়ে আসে। এসময় উপবৃত্তির টাকা বিতরণে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে শেষ পর্যন্ত তা বিতরণ করা হয়নি।
জানা গেছে, স্থানীয় মনিপুরী সমাজকল্যাণ পরিষদের সভাপতি নিশিকান্ত সিংহ ইতিমধ্যে শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তির ৩ লক্ষ ১২ হাজার টাকা উত্তোলন করে নিজের হেফাজতে নিয়ে যান। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৫টি বাইসাইকেল বণ্টনের জন্য আরো ৫০ হাজার টাকা নিয়েছেন তিনি। কিন্তু নিশিকান্ত সিংহ ৫টির স্থলে অতি নিম্মমানের ৪টি বাইসাইকেল নিয়ে আসেন বিতরণের জন্য। একটি বাইসাইকেলের টাকা তিনি আগেই আত্মসাৎ করে ফেলেন। বাইসাইকেল ক্রয়ে অনিয়মের বিষয়ে উপস্থিত কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিদের কাছে কোনো সদুত্তর দিতে পারেনি নিশিকান্ত সিংহ। তার এমন সন্দেহমূলক আচরণে উপজেলা চেয়ারম্যান ফজলুর রহমান ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মামুনুর রহমান অনেকটাই বিস্মিত^ হয়ে পড়েন। এক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের জন্য খামের ভেতর রাখা উপবৃত্তির টাকা সঠিক আছে কি না সন্দেহের সৃষ্টি হলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মামুনুর রহমান খামগুলো খুলেন। এতে পুকুর চুরির বিষয়টি বেড়িয়ে আসে।
দেখা যায় প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের খামে ২৪০০ টাকার স্থলে ২০০০ টাকা, মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের খামে ৬০০০ টাকার স্থলে ৫১০০ টাকা ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের খামে ৯৬০০ টাকার স্থলে ৮০০০ টাকা পুরে রাখা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তির টাকায় এমন অনিয়ম ধরা পড়লে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মামুনুর রহমান এতে চরম ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেন। তিনি উপবৃত্তির টাকা বিতরণ তাৎক্ষণিক বন্ধ করে দেন। এসময় মনিপুরী সমাজকল্যাণ পরিষদের সভাপতি নিশিকান্ত সিংহকে রবিবার সরকারি ৩ লক্ষ ১২ হাজার টাকা ও ৫ টি বাইসাইকেল ফেরত প্রদানের নির্দেশ দেন তিনি।
এদিকে স্থানীয় ও মণিপুরী যুবকল্যাণ সমিতির কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক মিলন সিংহ, মণিপুরী সমাজকল্যাণ পরিষদ ছাতক শাখার সাবেক সভাপতি ব্রজেন্দ্র সিংহ, ইসলামপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের ২নং ওয়ার্ড সভাপতি রঘু সিংহ, মণিপুরী ট্রাইবাল এসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি অনন্ত মনি সিংহ সহ আদিবাসী সম্প্রদায়ের লোকজন অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তির টাকায় এভাবেই আত্মসাত করে যাচ্ছে নিশিকান্ত সিংহ। উপজেলার জনৈক অফিস সহকারী এসব কর্মকান্ডে জড়িত বলেও তারা অভিযোগ করেন। এ অফিস সহকারীর যোগসাজেসে নিশিকান্ত সিংহ আদিবাসী সম্প্রদায়ের নাম ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন প্রকল্পের লক্ষ-লক্ষ টাকা আত্মসাত করেছে বলেও মনীপুরী সম্প্রদায়ের লোকজন জানিয়েছেন।
এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মামুনুর রহমান উপবৃত্তির টাকা ফেরত পাওয়ার কথা স্বীকার করে জানান, দুর্নীতির কারণে উপবৃত্তি বিতরণী অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেয়া হয়। পরে উপজেলা পরিষদ থেকে এ টাকা বিতরণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
উপজেলা চেয়ারম্যান ফজলুর রহমান জানিয়েছেন, উপবৃত্তির টাকা বিতরণের আগেই ভাগ-বাঁটোয়ারা করা হয়ে গেছে। ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে তারা চেয়েছিলো টাকা আত্মসাত করতে। কিন্তু পারে নাই। তাদের সকল দুর্নীতি ফাঁস হয়ে গেছে।