মোহাম্মদ ইসমাইল হোসেন
৫ সেপ্টেম্বর ২০২০। চিরদিনের মত না ফেরার দেশে চলে গেলেন আমাদের প্রিয় সহকর্মী শ্রদ্ধেয় আনিসুর রহমান কামাল স্যার। আনিস স্যার এর সাথে আমার প্রথম পরিচয় ২০০১ সালে লবজান চৌধুরী গার্লস স্কুলের শিক্ষক মি. বিষ্ণু চন্দের এর মাধ্যমে। বিষ্ণু দার সাথে আমি তখন বিএড ট্রেনিং করতাম জালালাবাদ টিচার্স ট্রেনিং কলেজে। এ সময় আনিস স্যার, বিষ্ণু দা তাদের কয়েকজন সমমনা বন্ধু নিয়ে সুনামগঞ্জের শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য, শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা করার লক্ষ্যে প্রথম কোচিং সেন্টার সৃজন শিক্ষা কেন্দ্রের পরিচালনা করতেন। বিষ্ণু দা খুব বন্ধুবৎসল লোক। তিনি বর্তমানে কানাডায় প্রবাসী। বিকেল বেলায় তার সাথে দেখা করতে আমি প্রায়ই চলে যেতাম সরকারি এস সি বালিকা বিদ্যালয়ের সামনেই অবস্থিত সৃজন শিক্ষা কেন্দ্রের অফিসে। আনিছ স্যারের অন্য দুই বন্ধু শিমুল ভাই ও মুত্তাকিন ভাই আমার ডিগ্রিতে ক্লাসমেট ছিলেন সেখানে আমি তাদেরও পেতাম। ফলে তাদের সাথে আড্ডা জমে উঠতো। আনিছ স্যারের আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বে সব সময় মুগ্ধ হয়েছি। তখন আমি ডাকঘরের চাকরি করতাম। ডাকঘর এর চাকরির ব্যস্ততার জন্য তাদের সাথে যোগাযোগের অনেক খানি ভাটা পড়ে। ২০০৫ সালে সরকারি মাধ্যমিকে যোগদানের পর স্যারের সাথে আবারো বিভিন্ন ফোরামে দেখা হতে থাকে এবং সম্পর্ক বাড়ে। ২০০৮ সালে ব্রিটিশ কাউন্সিলের কানেক্টিং ক্লাসরুমস প্রজেক্টে আমরা শহরের পাঁচটি বিদ্যালয় ক্লাস্টার বদ্ধ হবে কাজ শুরু করি। আনিস স্যার ছিলেন এই ক্লাস্টারের কো-অর্ডিনেটর। খুব চমৎকার ভাবে তিনি তার দায়িত্ব পালন করেছিলেন সে সময়। ২০০৮সালে তিনি প্রথম লন্ডন ঘুরে আসেন। পরবর্তীতে আমরাও পাঁচটি বিদ্যালয় থেকে প্রধান শিক্ষকসহ লন্ডন সফরের সুযোগ পাই। উনার সমন্বযয়ে আমরা ক্লাস্টারে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ অত্যন্ত সুচারুভাবে সম্পন্ন করি ও ব্রিটিশ কাউন্সিলের প্রশংসা অর্জন করি। আনিস স্যার এমনি একজন ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন লোক ছিলেন যে সচরাচর তিনি কাউকে কোন কষ্ট দিতে চাইতেন না। যতটুকু সম্ভব তিনি নিজের কাঁধে তুলে নিতেন ভারি যে কোন বোঝা। অত্যন্ত কর্মকুশল, একজন মেধাবী কর্মঠ লোক ছিলেন তিনি।
আনিছ স্যার সুনামগঞ্জ সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয় থেকেই ১৯৯০ সালে কৃতিত্বের সাথে এসএসসি পাশ করেন। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্য অনার্স মাস্টার্স করে শিক্ষকতায় যোগদান করেন। জুবিলী নিয়ে তার স্বপ্নের শেষ ছিল না। তিনি বিদ্যালয়টিকে একটি সবুজ প্রকৃতির নিবিড় পরিবেশের সাজানো বাগান হিসেবে দেখতে পছন্দ করতেন। কথা বলতেন বিদ্যালয়ের মাঠ, আঙ্গিনা ইত্যাদি নিয়ে। তার অনেক সুন্দর সুন্দর পরিকল্পনা ছিল। যার অন্যতম একটি হলো বিদ্যালয়ের সামনে অবস্থিত বাস্কেটবল গ্রাউন্ড। অত্যন্ত শিক্ষার্থী বান্ধব শিক্ষক ছিলেন তিনি। যার জন্য শিক্ষার্থীদের মনিকোঠায় চিরদিন তার নাম স্বর্ণাক্ষরে গ্রথিত থাকবে। আনিছ স্যার ছিলেন মিতভাষী, স্মিতহাস্য, নিভৃত্তচারী, কর্তব্যপরায়ণ একজন আদর্শ শিক্ষক। তার মোহনীয় ব্যক্তিত্ব আমরা কোনদিনও ভুলতে পারবো না। পিতৃ-মাতৃ ভক্ত অনিছ স্যার অত্যন্ত দায়িত্বশীল ছিলেন তার পিতা-মাতা ও ভাই বোনদের প্রতি। ২০১৬ সাল থেকে দুরারোগ্য ব্যধিতে আক্রান্ত থাকার পরও তিনি সবসময় তাদের সমানভাবে খোঁজখবর রেখেছেন, দায়িত্ব পালন করেছেন। যথাসম্ভব সেবা করে গেছেনতার পিতা-মাতাকে। দোতলায় ঘর খালি থাকা সত্বেও সীমাবদ্ধতার মধ্যে পিতা মতার সাথে এক ফ্লোরে থেকেছেন। মৃত্যুর ঘণ্টা খানেক পূর্বেও তিনি তার পিতামাতার স্বাস্থ্যের খোঁজ খবর নিয়েছেন ঢাকার হাসপাতাল থেকে। আল্লাহ আমাদের এই ভালোবাসার প্রিয় মানুষটিকে জান্নাত দান করুন। তার পিতা মকবুল হোসেন ২৫ বছর শিক্ষকতা করেছেন এই সুনামগঞ্জ সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়ে। তিনি জেলা শিক্ষা অফিসার হিসেবে ২০০০ সালে অবসরে গিয়েছিলেন। এই বৃদ্ধ বয়সে তাদের শোকে ভাসিয়ে আল্লাহ তার কাছে ডেকে নিলেন তার প্রিয় বান্দাকে। রেখে গেলেন ৫ বছর বয়সের শিশু সন্তানকে। আজ শোকে ম্হ্যুমান তার শিক্ষার্থীবৃন্দ আমার তার সহকর্মীগণ, গোটা শহর। পরম করুনাম আল্লাহর নিকট কায়মনে প্রার্থনা তিনি যেন তার পরিবারকে, তার শিশু সন্তানকে, তার পিতা-মাতাকে ধৈর্য ধরার তৌফিক দান করেন। তাদের সহায় হোন। পরপারে আল্লাহ যেন আপনাকে মায়া করেন। জান্নাতে উচ্চ মর্যাদা দান করেন। আমাদেরকে ক্ষমা করে দেন এইটুকু প্রার্থনা।
লেখক : সহকারী শিক্ষক (ইংরেজি), সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়, সুনামগঞ্জ।