বিশেষ প্রতিনিধি
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কো-অর্ডিনেটর মুহ. আবদুল হাননান খান পিপিএম বলেছেন,‘যুদ্ধাপরাধ বা মানবতা বিরোধী অপরাধের বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোন অবকাশ নাই, আন্তর্জাতিক মানদন্ডে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় বিচার সম্পন্ন হচ্ছে। প্রতিটি কাজই জবাবদিহিতার মধ্যে রয়েছে। এই পর্যন্ত ট্রাইব্যুনালের ২৪ টি মামলার রায় হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট ডিভিশনের ৩ জন বিচারক এই ট্রাইব্যুনালের বিচার কাজ করছেন, স্বচ্ছ, স্পষ্ট এবং আইনানুযায়ী ৮০ ভাগ ক্ষেত্রেই আমরা মৃত্যুদণ্ড পেয়েছি। আসামী পক্ষকে শতভাগ সুযোগ দিয়েও ২৪ টি মামলা শেষ হয়েছে’। তিনি বলেন, ‘হিংসা বা প্রতিশোধ পরায়ণ হয়ে নয়, জাতীয় চেতনা রক্ষার জন্যই দলমত নির্বিশেষে সকলকে এই বিচার কার্য পরিচালনায় সহায়তা করতে হবে’।
মঙ্গলবার দুপুরে জেলা প্রশাসন ও মুক্তিযোদ্ধা সংসদের আয়োজনে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ মিলনায়তনে মুক্তিযোদ্ধা, রাজনীতিক, সাংবাদিক, আইনজীবী ও সুশীল সমাজের ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতিতে মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
মুহ. আবদুল হাননান খান বলেন, ‘যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচালের নানা ষড়যন্ত্র রয়েছে, যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচানোর জন্য ২০০ মিলিয়ন ডলার দিয়ে লবিষ্ট নিয়োগ করা হয়েছিল। বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিপক্ষে ছিল এমন রাষ্ট্রগুলোও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ইস্যুতে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে’।
বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদের সংখ্যা নিয়ে বিতর্কিত বক্তব্য দেওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন,‘প্রতিষ্ঠিত সত্য, ঐতিহাসিক ভাবেও সত্য, এমন বিষয় নিয়ে যাতে সমালোচনা না হয় আইন করে তা বন্ধ করা প্রয়োজন’। তিনি বলেন,‘যুদ্ধাপরাধের অপরাধীদের ক্ষমা করার ক্ষমতা কারো নেই, যারা অপরাধী তাদের বিচার হবেই’। তিনি বলেন,‘রাজাকারের ছেলে রাজাকার এটা সকল ক্ষেত্রে বলা ঠিক হবে না, তবে ক্ষোভ থাকা স্বাভাবিক, যে বাড়িতে আমি নির্যাতিত হয়েছি, এই বাড়ি বা এই বাড়ির মানুষের প্রতি আমার ক্ষোভ থাকা স্বাভাবিক’।
তিনি বলেন,‘সুনামগঞ্জের মুক্তিযোদ্ধা লেখক বজলুল মজিদ চৌধুরী’র ‘‘রক্তাক্ত সুনামগঞ্জ’’ বইটি দেখে মনে হয়েছে এই বইকে সূত্র ধরেই অনেক মামলা করা যায়। মামলা করার নির্ধারিত কোন তারিখও নেই, মামলার জন্য কাউকে বাদীও হতে হবে না, আমরাই সবকিছু করবো, শুধু সংবাদ দিতে হবে এবং যে কোনদিন মামলা হতে পারে’। হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারে অনেক মামলা হয়েছে, সুনামগঞ্জেরও মামলা হবে’।
জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক ডেপুটি কমান্ডার আবু সুফিয়ানের সঞ্চালনায় মতবিনিময় সভায় জেলা প্রশাসক শেখ রফিকুল ইসলাম, পুলিশ সুপার হারুন অর রশিদ, জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাড. আব্দুল মজিদ, অ্যাড. সুরেশ দাস, মুক্তিযোদ্ধা সংসদের জেলা কমান্ডার নুরুল মোমেন, নারী নেত্রী শীলা রায়, মুক্তিযোদ্ধা আতম সালেহ, মুক্তিযোদ্ধা মতিউর রহমান, মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মজিদ বীরপ্রতীক, মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ডেপুটি কমান্ডার ইউসুফ আল আজাদ, মুক্তিযোদ্ধা সফর আলী, মুক্তিযোদ্ধা গৌরাঙ্গ চন্দ্র দাস, মুক্তিযোদ্ধা আপ্তাব উদ্দিন, মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম, মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল কাইয়ুম, আওয়ামী লীগ নেতা হায়দার চৌধুরী লিটন, সিরাজুর রহমান সিরাজ, জাহানারা বেগম প্রমুখ বক্তব্য দেন।
দোয়ারাবাজারের মুক্তিযোদ্ধা সফর আলী বলেন,‘দোয়ারাবাজারের চিহ্নিত রাজাকার আলা উদ্দিনের নাম মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় উঠেছে, এটি আমাদের সকলের লজ্জা’।
শাল্লার মুক্তিযোদ্ধা গৌরাঙ্গ চন্দ্র দাস বলেন,‘রাজাকারের ছেলে প্রদীপ ইউপি চেয়ারম্যান হওয়ায় আমাদের লজ্জা হয়েছে’।
জগন্নাথপুরের মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল কাইয়ুম বলেন,‘রানীগঞ্জ ও শ্রীরামসি গণহত্যার সঙ্গে যুক্ত রাজাকারদের নাম ও ঠিকানা ট্রাইব্যুনালের কাছে দেবো আমি’।
জামালগঞ্জের মুক্তিযোদ্ধা অ্যাড. আসাদ উল্লাহ্ সরকার বলেন,‘আমার উপজেলায় রাজাকার বাবার ছেলেরা উপজেলা চেয়ারম্যান ও ইউপি চেয়ারম্যান হয়েছে’। আবুল মুনসুর আহমদ লালা মিয়ার নামোল্লেখ করে আসাদ উল্লাহ্ সরকার বলেন,‘রাজাকার আবুল মুনসুর লাল মিয়ার অত্যাচারের শিকার হয়েছে অনেক মুক্তিযোদ্ধা ও সংখ্যালঘু পরিবার’। তিনি বলেন,‘জামালগঞ্জে অনেক রাজাকারের ছেলে আওয়ামী লীগের বড় নেতা’।
১৩ বছর বয়সে পাক হায়েনা কর্তৃক নিজের নির্যাতনের কথা তুলে ধরেন শহরতলির ওয়েজখালীর জাহানারা বেগম।
মুক্তিযোদ্ধা মতিউর রহমান ছাতকের দুর্বিন টিলায় পাক হায়েনাদের নির্যাতিত নারীদের কথা তুলে ধরেন।
মুক্তিযোদ্ধা সুরেশ দাস মুক্তিযোদ্ধা ও রাজাকার দুই তালিকাই সংশোধিত আকারে করার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন।
মুক্তিযোদ্ধা অ্যাড. আব্দুল মজিদ বলেন,‘রাজাকারের গাড়িতে পতাকা উঠেছে, এখন আর উঠবে না, চেয়ারম্যানও হবে না, আমরা সতর্ক আছি, সকলকেই সতর্ক থাকতে হবে’।
নারী নেত্রী শীলা রায় বলেন,‘পাক হায়েনারা আমার বাবাকে মেরেছে, নতুন প্রজন্মকে পাকা হানাদার ও তাদের দোসরদের ঘৃণা করতে অনুপ্রেরণা যোগাতে হবে’।
মুক্তিযোদ্ধা আবু সুফিয়ান বলেন,‘নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধে অনেক সম্ভ্রম হারানো বোনেরা-মায়েরা তাঁদের নির্যাতনের ঘটনা চাপা দিয়ে রেখেছেন এগুলো উঠে আসা প্রয়োজন’।
মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মজিদ বীরপ্রতীক বলেন,‘বিচার বিলম্বে হলেও সমস্যা নেই, কিন্তু স্বাক্ষী নেবার কাজ শেষ করে ফেলতে হবে, মুক্তিযোদ্ধাদের বয়স হয়েছে, স্বাক্ষী নিতে বিলম্ব হলে পরে আর স্বাক্ষী পাওয়া যাবে না’।
পুলিশ সুপার হারুন অর রশিদ বলেন,‘ষড়যন্ত্র হচ্ছে, জঙ্গীবাদীদের উসকে দেওয়া হচ্ছে, দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হচ্ছে, উন্নয়ন অগ্রগতি রূদ্ধ করার ষড়যন্ত্র হচ্ছে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কার্যক্রমকে বিতর্কিত করারও ষড়যন্ত্র হচ্ছে, এসব বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে, ষড়যন্ত্রকারীরা তৎপর, বিচার কার্যক্রমে অধিকতর তদন্ত করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতেও এ নিয়ে কথা উঠতে না পারে’।
জেলা প্রশাসক শেখ রফিকুল ইসলাম যত দ্রুত সম্ভব যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে স্বাক্ষী গ্রহণের কাজ শেষ করার অনুরোধ জানিয়ে বলেন,‘ট্রাইব্যুনাল কোন দায়িত্ব দিলে আন্তরিকতার সঙ্গে পালন করবো আমরা’।
মতবিনিময় সভার শেষ পর্যায়ে যুদ্ধাপরাধীদের সন্তানদের রাষ্ট্রীয় সুযোগ সুবিধা এবং ভোটাধিকার বাতিল করা হবে কী-না? এবং রাজাকারদের তালিকা করা হবে কী না? আওয়ামী লীগ নেতা করুণা সিন্ধু চৌধুরী বাবুল ও দেওয়ান ইমদাদ রেজা চৌধুরীর এমন প্রশ্নের জবাবে মুহ. আবদুল হাননান খান বলেন- ‘রাজাকারদের তালিকা করার কথা চিন্তা করা হচ্ছে, অন্য বিষয়গুলো সময়ই বলে দেবে’।