আবহাওয়ার বিশাল পরিবর্তন সাদা চোখে দৃশ্যমান হচ্ছে। এবার ভরা শীতের মৌসুমে কোন শীতবস্ত্র ছাড়াই দিব্যি চলাফেরা করছে মানুষ। ঘরের ভিতরে ঈষৎ গরমে কাউকে ফ্যান চালিয়ে রাখতেও দেখা যায়। অথচ আমাদের দেশে শীতের প্রকোপ শুরু হয়ে যাওয়ার কথা অগ্রহায়ন মাস থেকেই। ষড়ঋতুর বাংলাদেশে এখন ঋতু পরিবর্তনের বিষয়টি তেমন টের পাওয়া যায় না। গ্রীস্ম ও বর্ষা মৌসুম মোটামোটি টের পাওয়া যায়। শীত মৌসুম টের পেতে পেতেই শেষ হয়ে যায়। ঋতুভিত্তিক আবহাওয়ার আচরণও আগের মতো নেই। বৈশাখ মাসে কাল বৈশাখীর প্রকোপ কমেছে। বৃষ্টিপাতের গড় পরিমাণ কমে গেছে। সবকিছু ছাপিয়ে উষ্ণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে আবহাওয়াম-লের। গত কয়েক বছল যাবৎ বাংলাদেশে ভূমিকম্প ও বজ্রপাতের পরিমাণ মাত্রাতিরিক্তভাবে বেড়ে গেছে। গতকালও প্রায় ৬ মাত্রার (রিখটার স্কেলে) একটি ভূমিকম্প কাঁপিয়ে দিয়েছে পুরো দেশকে। এরফলে বাংলাদেশের চিরাচরিত কৃষিভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থা মুখ থুবড়ে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা ব্যক্ত করছেন বিশেষজ্ঞরা। আবহাওয়ার এই পরিবর্তন অবশ্যই প্রকৃতির আচরণ কিন্তু এই আচরণের জন্য বিশেষত মানুষই দায়ী। মানুষের অপরিনামদর্শী কার্যকলাপ বায়ুম-লকে প্রভাবিত করছে ব্যাপকভাবে। বিশেষ করে অতি শিল্পায়ন, কৃষিতে ব্যাপক হারে রাসায়নিক প্রয়োগ, জলের উৎস যেমন নদী-নালা-খাল-বিল শুকিয়ে ফেলার ব্যবস্থা করা এমনসব কারণে আজ পৃথিবীব্যাপী আবহাওয়ার উল্টো আচরণ শুরু হয়েছে। আবহাওয়ার পরিবর্তনের জন্য উন্নত রাষ্ট্রগুলাকে দায়ী করা হয়। শিল্প প্রতিষ্ঠানের বর্জ্য বায়ুস্তরে মিশে প্রাকৃতিক ওজোনস্তরকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। ওজোনস্তরের পরিবর্তনের ফলে সূর্যের অতি বেগুনি রশ্মির ক্ষতিকারক প্রবণতা আটকে রাখার প্রাকৃতিক সক্ষমতা বিনষ্ট হয়ে পড়েছে। বিশেষত ওজোনস্তরের এই পরিবর্তনকেই আবহাওয়া বা জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী করা হচ্ছে। এ নিয়ে বৈশ্বিক মতবিনিময়-সম্মেলন ইত্যাদির আয়োজন হয়ে থাকে নিয়মিতই। ক্ষতিগ্রস্ত স্বল্পোন্নত রাষ্ট্রগুলো এই ক্ষতির জন্য উন্নত রাষ্ট্রগুলোর নিকট ক্ষতিপূরণ দাবি করে আসছে। উন্নত রাষ্ট্রগুলো কিছুটা ক্ষতিপূরণ দিচ্ছেও। এই ক্ষতিপূরণ তহবিলের হিস্যা বণ্টন নিয়েও আন্তর্জাতিক কারচুপি ও পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ রয়েছে জুরেসুরে। সবকিছু মিলিয়ে বর্তমান বিশ্বপ্রেক্ষাপটে আবহাওয়ার পরিবর্তন বিষয়টি একটি বহুল আলোচিত বিষয়।
মানবসভ্যতা গড়ে উঠার পিছনে প্রাকৃতিক ও ভৌগোলিক ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থার অবদান সবচাইতে বেশি। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মানববসতি ও উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে আবহাওয়ার আনুকূল্য নিয়েই। এখন ওইসব সভ্যতার কেন্দ্রে যদি আবহাওয়ার পরিবর্তন ঘটতে থাকে তাহলে একটা সময়ে ওই অঞ্চলের মানব সভ্যতা ও উৎপাদন ব্যবস্থা বিপর্যস্থ হতে বাধ্য। এই পরিবর্তনটি অতি ধীরে ধীরে সংঘটিত হয়ে থাকে বলে চোখের সামনে কিংবা কয়েক বছরে সুষ্পষ্ট পরিবর্তনটি ধরা পড়ে না। কিন্তু যখন মহামারীর মতো ওই পরিবর্তনের বিষয়টি চূড়ান্ত হতে থাকবে তখন এ থেকে পরিত্রাণের উপায় থাকবে না। আর এ জন্যই আবহাওয়ার পরিবর্তন নিয়ে বিশ্বব্যাপী আলাপ-আলোচনা বিশেষ শক্তিশালী। এই আলাপ-আলোচনা এতোটাই জরুরি যার সাথে মানুষের সভ্যতা টিকে থাকার সম্পর্ক বিদ্যমান।
জলবায়ুকে সহনীয় মাত্রায় রাখতে ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক পরিম-লে বৈশ্বিক করণীয় নির্ধারণ করা হয়েছে। শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ কমানো, বৃক্ষরোপণ, প্রাকৃতিক জলীয় উৎসগুলোর পরিবর্তন রোধসহ সচেতনতামূলক নানা বিষয়াদি রয়েছে ওই করণীয়র মাঝে। আজ প্রতিটি ব্যক্তিকে আবহাওয়ার পরিবর্তন বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে। পরিবর্তন রোধে রাখতে হবে নিজ নিজ সাধ্য অনুযায়ী পদক্ষেপ। আমরা প্রত্যেকে যদি নিজ নিজ পরিবেশকে দূষণ থেকে রক্ষা করি প্রত্যেকে যদি বৃক্ষ রোপণ করি তাহলে সকলের সম্মিলিত ফলাফল একটি বিশাল পরিবর্তনের চেহারা নিয়ে আসবে। সুতরাং আসুন আন্তর্জাতিক, রাষ্ট্রীয় উদ্যোগগুলোর সাথে ব্যক্তিগত উদ্যোগগুলোকেও জোরদার করি।