- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

আমার সৌভাগ্য, দুই সন্তানের সঙ্গেই সাংবাদিকতা করেছি

মতিউর রহমান চৌধুরী
মকবুল হোসেন চৌধুরী। বাংলা সাংবাদিকতায় একটি অনন্য নাম। যতদিন বাংলা সাংবাদিকতা থাকবে ততদিন তাঁর নাম উচ্চারিত হবে। মুসলিম মনীষীরা নানাভাবেই তাঁকে মূল্যায়ন করে গেছেন। বাংলা সাংবাদিকতার ইতিহাস লিখতে গিয়ে অনেকেই বলেছেন, প্রয়াত চৌধুরী ছিলেন এক সাহসী যোদ্ধা। আমার বিবেচনায় তিনি ছিলেন এই উপমহাদেশে মুসলিম জাগরণের এক কারিগর। পিছিয়ে থাকা মুসলিম সমাজকে আলোর পথে নিয়ে আসার জন্য যে ক’জন মানুষ নিরন্তর সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন তিনি তাঁদের একজন।
আমি মাত্র প্রাথমিক স্কুলে যেতে শুরু করেছি। এর মধ্যেই মকবুল হোসেন চৌধুরী দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছেন। তাঁর জীবন কর্ম সম্পর্কে আমার জানার কথাও নয়। সাংবাদিকতা বিষয়টিও আমার কাছে সম্পূর্ণ অজানা। ঘটনা চক্রে যখন সাংবাদিকতা পেশায় এলাম তখন মকবুল হোসেন চৌধুরীর নাম প্রায়ই আলোচনায় আসতো। বিশেষ করে তার সুযোগ্য দুই পুত্রের সঙ্গে আমার সাংবাদিকতা করার সুযোগ হয়েছিল। আমি নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করি এ জন্য। হোসেন তওফিক চৌধুরী ও হাসান শাহরিয়ার চৌধুরী দু’জনই স্বনামখ্যাত সাংবাদিক। হাসান শাহরিয়ার কোনদিন নামের শেষে চৌধুরী লিখতেন না। এটা কেন তা অবশ্য কোনদিনই জিজ্ঞাসা করা হয়নি। সে যাই হোক, হোসেন তওফিক চৌধুরীর সঙ্গে দৈনিক ‘পূর্বদেশ’ পত্রিকায় কাজ করেছি অনেক দিন। অত্যন্ত মেধাবী, সৎ ও নির্ভীক এক সাংবাদিক। লবণের সংকট হয়েছিল ১৯৭৪ সালে। সে সংকট আর নেপথ্যের খবর নিয়ে বিস্তারিত রিপোর্ট লিখেছিলেন হোসেন তওফিক চৌধুরী। শাসক মহলে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হয় এই রিপোর্ট প্রকাশের পর। সম্পাদক এহতেশাম হায়দার চৌধুরীকে ডেকে নিয়ে যাওয়া হয় গণভবনে। চাকরিচ্যুত করতে বলা হয় সাংবাদিককে। সে আমলে কথায় কথায় সাংবাদিকদের চাকরি চলে যেত। ১৯৭৪ সালের ১৭ মার্চ জাসদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাসভবন ঘেরাও করতে গেল। সেই ঘেরাও এর খবর লিখতে গিয়ে দৈনিক ‘বাংলার বাণী’ থেকে চাকরি হারিয়েছিলাম। একই ঘটনা ঘটেছিল আমার বেলায়ও। সম্পাদক ফজলুল হক মনিকে ডেকে বলা হয়েছিল, ‘এই ব্যাটা সাংবাদিক জাসদের লোক। এখনই তার চাকরি খেতে হবে।’ দুই ঘন্টার মধ্যে আমি লাল চিঠি পেয়েছিলাম। হোসেন তওফিক চৌধুরীর মনের অবস্থা সেদিন কি ছিল তা লিখে বুঝাতে পারবো না। আমার মন খারাপ হলেও তাঁর মনোবল ছিল অটুট। ভেঙে পড়েননি। পরে তিনি এই পেশাই ছেড়ে দেন। সুনামগঞ্জে চলে যান। শুরু করেন ওকালতি পেশা। এখনও তিনি এই পেশাতেই আছেন অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে। হাসান শাহরিয়ারের সঙ্গে দৈনিক ‘ইত্তেফাক’ এ কাজ করেছি প্রায় এক যুগ। তাঁকে নিয়ে গর্ব করার মতো অনেক কিছু রয়েছে। ধীরস্থির, অত্যন্ত স্বাধীনচেতা একজন সাংবাদিক। উপমহাদেশ জুড়েই তাঁর নাম জারি রয়েছে সাংবাদিকতা অঙ্গনে। যখনই বিদেশে কোনো ফেলোশিপ বা সম্মেলনে যোগ দিয়েছি তখন অন্য এক হাসান শাহরিয়ারের নাম শুনেছি। জেনেছি অনেক কিছু। বিশেষ করে পাকিস্তানি সাংবাদিকদের সাথে পরিচয় হলেই তারা প্রথমে যে তিন-চারজন ঢাকার সাংবাদিকের নাম উচ্চারণ করেন তখন হাসান শাহরিয়ারের নাম এসে যায়। তাঁকে আমি ‘ওস্তাদ’ বলেই ডেকেছি বরাবর।
প্রয়াত মকবুল হোসেন চৌধুরীর সাফল্য হচ্ছে বংশের মধ্যে সাংবাদিকতার বীজ রোপন করে গিয়েছিলেন। ছেলেরা সাংবাদিকতায় আসবে এটা তিনি চেয়েছিলেন কিনা জানা নেই। তবে রক্তের টানে দুই সন্তান সাংবাদিকতায় এসে বাংলা সাংবাদিকতার প্রসার ও সমৃদ্ধি ঘটিয়েছেনÑএটা বলা চলে নিঃসন্দেহে।
স্পিকার হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর বই ‘ইতিহাসের প্রান্তে’ লিখতে গিয়ে মকবুল হোসেন চৌধুরীর অনেক অজানা তথ্য জেনেছি। প্রায় পাঁচ বছর লেগেছিল বইটি লিখতে। হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী কথা উঠলেই বলতেন, ‘একজন মকবুল হোসেনের ছবি আঁকুন লেখায়, বলায়। মুসলিম সমাজ যখন ঘরে বন্দি, কোণঠাসা নানা কারণে তখন মকবুল সাহেবরা কলম ধরেছেন। তখন একটিই লক্ষ্য ছিল আর পিছিয়ে থাকা নয়, এবার সামনে আসতে হবে। প্রতিযোগিতায় নামতে হবে।’ ব্রিটিশ শাসনকালে সাংবাদিকতা পেশা কম ঝুঁকিপূর্ণ ছিল না।
আজও ঝুঁকি আছে। তবে সে আমলের ঝুঁকি ব্যক্তিকে নিয়ে নয়, গোটা সমাজকে নিয়েই। দৈনিক ‘সোলতান’ বলুন, কিংবা সাপ্তাহিক ‘যুগবাণী’ বা ‘যুগভেরী’ বলুন, মকবুল হোসেন চৌধুরী যোগ্যতার ছাপ রেখে গেছেন। যুগভেরী আজও আছে। প্রথম সম্পাদক হিসেবে মকবুল হোসেন চৌধুরীর নাম ইতিহাসে লিপিবদ্ধ হয়ে আছে। আমিনুর রশীদ চৌধুরীর কাছে যখনই কেউ সাংবাদিক হওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করতেন বা চাকরির জন্য যেতেন তখন তিনি বলতেন, মকবুল হোসেন চৌধুরীর মতো সাংবাদিক হতে পারবেন তো?
আসলে মকবুল হোসেন চৌধুরী ছিলেন এক আদর্শ। সিলেট থেকে কলকাতাÑ সে তো অনেক পথ। বলতে গেলে সিলেট এক মফস্বল শহর। সেই শহর থেকে কলকাতা পর্যন্ত মকবুল হোসেন চৌধুরীর নাম মশহুর হয়ে পড়েছিল তার স্বাধীনচেতা লেখনীর মাধ্যমে। আশির দশকে আমি যখন কলকাতার দৈনিক ‘যুগান্তর’ পত্রিকার ঢাকা সংবাদদাতা নিযুক্ত হই, তখন আমার মনে আছে কলকাতার স্বনামখ্যাত সাংবাদিক অমিতাভ চৌধুরীর সঙ্গে দেখা হতেই বলেছিলেন, ‘হ্যাঁ মিয়া, তুমিতো দেখি মকবুল ভাইয়ের দেশের লোক। জানো আমিও কিন্তু শ্রীহট্টের সন্তান।’ সিলেট নয়, সব সময় তিনি শ্রীহট্ট বলতেন। দীর্ঘ সময় তাঁর সঙ্গে কাজ করে মনে হয়েছে তিনি আগে সিলেটি এরপর অন্য কিছু।
লেখক : মতিউর রহমান চৌধুরী: প্রধান সম্পাদক, দৈনিক ‘মানবজমিন’। কালের দর্পনে সাংবাদিক-রাজনীতিবিদ মকবুল হোসেন চৌধুরী স্মারকগ্রন্থ থেকে সংকলিত।

  • [১]