বিশেষ প্রতিনিধি
সরেজমিনে পরিদর্শন, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ তথ্য পর্যালোচনা, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি থেকে দরিদ্র হাওরবাসীর সাথে সাক্ষাৎকার ও মতামত গ্রহণ, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাঠ পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট অফিস ও প্রকল্প অফিসের নথিপত্র পরীক্ষা, সাময়িকভাবে বরখাস্তকৃত কর্মকর্তাদের বক্তব্য, জেলা প্রশাসন ও বিভাগীয় কমিশনারের প্রতিবেদন, প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার দেয়া তথ্য, বিশেষজ্ঞদের মতামত এবং কমিটির নিয়োগপ্রাপ্ত যাবতীয় তথ্যাদি, কমিটির কার্যপরিধির আওতায় থেকে তদন্ত কমিটি সার্বিক বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনা করে তদন্ত কমিটি নি¤েœাক্ত সুপারিশ ও মতামত দিয়েছে। হাওর এলাকার জন্য অবিলম্বে একটি সমন্বিত ও ব্যাপক স্টাডি করা প্রয়োজন। বিশেষ এলাকায় একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য জমিচাষের লক্ষ্যে এবং প্রকৃতির সাথে লড়াই করার জন্য কি দরকার, তা বিজ্ঞান ভিত্তিক অনুসন্ধান ছাড়া হাওর এলাকার চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা সম্ভব নয়। পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দুটি নির্ভরযোগ্য ট্রাস্ট ওডগ (ওহংঃরঃঁঃব ড়ভ ডধঃবৎ গড়ফরষরহম) ও ঈঊএওঝ (ঈবহঃবৎ ভড়ৎ ঊহারৎড়হসবহঃধষ ধহফ এবড়মৎধঢ়যরপধষ রহভড়ৎসধঃরড়হ ঝুংঃবস) কে এই বিজ্ঞান ভিত্তিক স্টাডির দায়িত্ব দেয়া যেতে পারে এবং প্রকল্প নেয়া যেতে পারে। উল্লেখ্য, এই স্টাডির অংশ হিসেবে স্থানীয় জনগণের সাথে মতবিনিময় সভা, সেমিনার ও ওয়ার্কশপ রাখা যেতে পারে।
সুনামগঞ্জ সহ ৬টি জেলায় ব্যাপক ফসলহানির প্রেক্ষিতে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়/বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড যে তিনজন প্রকৌশলী (প্রধান প্রকৌশলী আবদুল হাই, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী নুরুল ইসলাম সরকার ও সুনামগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী আফসারউদ্দিন) কে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে,
কারণ তাঁদের কাজের গাফিলতি, ধীরগতি ও অদক্ষতার প্রমাণ পাওয়া গেছে। তবে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মোকদ্দমার প্রয়োজনে অভিযোগনামা ও অভিযোগ বিবরণী গঠনের জন্য আরো তথ্য সংগ্রহ জরুরী। কারণ তাদের কাজে গাফিলতি ও ধীরগতি তথা অদক্ষতা পাওয়া গেলেও কী ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির সাথে তারা জড়িত তা বর্তমানে ভরা বর্ষা মৌসুমে সরেজমিনে পরিমাপ করা সম্ভব নয় বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এজন্য আগামী নভেম্বরে যখন পানি সরে যাবে, তখন আবার সরেজমিনে তদন্ত করে পুনরায় তথ্য নেয়া দরকার। সেজন্য বর্তমান কমিটির বাইরে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়, পানি উন্নয়ন বোর্ড, ওয়ারপো, হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তরের প্রতিনিধি সমন্বয়ে আর একটি কমিটির মাধ্যমে সরেজমিনে তদন্ত করে প্রতিবেদন নেয়া যেতে পারে। সেই সাথে ইতোমধ্যে যাদের সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে তা অব্যাহত রাখা এবং দীর্ঘদিন সুনামগঞ্জ সহ ৬টি জেলায় কর্মরত সকল উপ বিভাগীয় প্রকৌশলী ও সেকশন অফিসারদের মাঠ পর্যায় থেকে পর্যায়ক্রমে প্রত্যাহার করার সুপারিশ রাখা হয়েছে তদন্ত প্রতিবেদনে।
তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশ মোতাবেক যে সকল ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে তাদেরও বিধি মোতাবেক শাস্তির আওতায় আনা জরুরী। শুকনো মৌসুমে প্রস্তাবিত কমিটির তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত ঠিকাদারদের সকল বিল প্রদান বন্ধ রাখার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।
সুনামগঞ্জসহ হাওর অধ্যুষিত ছয়টি জেলায় নদী, খাল ও হাওরসমূহ ক্যাপিটাল ড্রেজিং করা যেতে পারে। বর্তমানে যে খন্ডিতভাবে খনন চলছে তা পরিত্যাগ করে উজান থেকে শুরু করে এই খনন কাজ ব্যাপক ভাবে করা দরকার। ‘হাওর এলাকার আগাম বন্যা প্রতিরোধ ও নিষ্কাশন উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্প সংশোধন করে অথবা নতুন উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ পূর্বক তা করা যেতে পারে। এই উদ্যোগের আওতায় সুনামগঞ্জের আবুয়া, নান্দিয়াগাঙ, পাটনাই গাঙ, নলজুড়ি, সোমেশ্বরী, পিয়াইন, মহাসিংহ, রক্তি, যাদুকাটা, আপার বৌলাই, মরা সুরমা নদী খননের উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে।
পিআইসি ও ঠিকাদারী কাজ উভয় ক্ষেত্রেই সমালোচনা রয়েছে প্রতিবেদনে। তবে পিআইসি’র মাধ্যমে কাজ বেশি লাগসই এবং এতে জনগণের অংশগ্রহণ রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। পিআইসি’র মাধ্যমে যাবতীয় কার্যক্রম উপজেলা পরিষদের তত্ত্বাবধানে হতে পারে এবং সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক প্রধান সমন্বয়কারীর দায়িত্ব পালন করতে পারেন। উন্নয়ন প্রকল্পভুক্ত মাটির কাজ প্রয়োজনে ঈঈঊঅ/ঈঈএচ অনুমোদনক্রমে উচগ এর মাধ্যমে সম্পাদন করা যেতে পারে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ মেরামত নদী/খাল পুন:খননের জন্য প্রকল্প /উপ প্রকল্প/স্কীম প্রস্তুত ও বাস্তবায়ন নীতিমালার আমূল সংস্কার একান্ত অপরিহার্য। ‘জমি যার বাঁধ তার’ প্রতিপাদ্য নিয়ে নীতিমালা প্রস্তুতকৃত হওয়া সময়ের দাবি। পিআইসি কমিটি ৫ সদস্য বিশিষ্ট হতে পারে এবং এই ৫ সদস্য সংশ্লিষ্ট বাঁধের সাথে সম্পৃক্ত যাদের জমি আছে, আবশ্যিকভাবে কেবল তাঁদের মধ্যে থেকেই নির্বাচিত করা যেতে পারে। উপজেলা ভূমি অফিস ও উপজেলা কৃষি অফিসের সহায়তা নিয়ে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার এই সদস্য নির্বাচন করতে পারেন। এই নির্বাচনের ভিত্তি হতে পারে যার যত জমি বেশি তিনি অগ্রাধিকার পাবেন।
বাঁধের বর্তমানে প্রচলিত প্রমিত নকশা এর মূল্যায়ন অপরিহার্য হয়ে পড়েছে এবং জলবায়ু পরিবর্তন, স্থানীয়দের চাহিদা, বৃষ্টিপাতের রেকর্ড, মাছের প্রজনন সময় (সম্ভাব্য ১৫ এপ্রিল েেক ১৫ মে) ফসল পাকার সময় ইত্যাদি পর্যবেক্ষণ-পর্যালোচনা-বিশ্লেষণ ও স্টাডি করে বাস্তব সম্মত একটি নকশা উদ্ভাবন করা যেতে পারে। যা একই ধরনের বা প্রমিত না হয়ে হাওরের বৈশিষ্ট বা প্রকৃতি অনুসারে হওয়া প্রয়োজন। এজন্য জরিপ করা এবং পর্যায়ক্রমে বিশ্লেষণ করা জরুরী। একই সাথে সার্বিক পরিকল্পনায় জনগণকে সম্পৃক্ত করা যেতে পারে।
এ বছর ফসলহানি শতভাগ হওয়ার কারণে কৃষকদের অধিকতর সুবিধা দেয়া যেতে পারে। বন্যা/ঢলের পানি তাড়াতাড়ি নির্গমনের ব্যবস্থার বিষয়টি জরুরীভাবে বিবেচনা করা যেতে পারে।
হাওর এলাকায় আরো ওয়াটার ও রেইন গেজ স্থাপন করা এবং পাশাপাশি যথাযথ তদারকির ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে।
ছোট বড় সকল হাওর রক্ষা পানি উন্নয়ন বোর্ডের স্বল্প জনবল দিয়ে অসম্ভব। তাই শনি, করচা, দেখার হাওর সহ সব বড় হাওরে বেশি নজর দেয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।
স্বল্প জীবনকাল বিশিষ্ট বোর ধান উদ্ভাবন, স্বল্প মূল্য বীজ ও সার প্রদানের জন্য কৃষি মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করা যেতে পারে।
প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে বাঁধের উচ্চতা নির্ণয়
বাস্তব অবস্থার প্রেক্ষিতে সুনামগঞ্জ জেলায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের দুটি বিভাগ গঠন এবং কিশোরগঞ্জ জেলার মিঠামইন উপজেলায় একটি উপ বিভাগ স্থাপনের উদ্যোগসহ পর্যাপ্ত জনবল, বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে কাজের সময় জনবল বৃদ্ধি করা যেতে পারে। এছাড়া জেলায় বিদ্যমান অফিস সমূহ হাওর এলাকার নিকটবর্তী উপজেলা সদরে স্থাপন করা যেতে পারে।
বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার বিশ্বম্ভরপুর থেকে নিয়ামতপুর বাঁধ মেরামত ও সংস্কার এবং একই সাথে পার্শ্ববর্তী রূপসা নদী খনন করে এই বাঁধের কাজে লাগানো।
হাওর এলাকায় প্রাকৃতিক জলধার তৈরির লক্ষ্যে আগাম বন্যার পানি ধারণের জন্য নিচু ও কম গুরুত্বপূর্ণ হাওরগুলো বাছাই করে উন্মুক্ত রাখা।
বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার মিছেখালিতে বিএডিসি’র নির্মিত রাবার ড্যাম এবং হাওর এলাকায় এলজিইডি’র কয়েকটি রাবার ড্যাম নির্মাণের উপর আন্ত:মন্ত্রণালয় পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন জরুরী।
হাওরে ইঁদুরে বাঁধ নষ্ট করা বা ভাঙ্গার আতঙ্ক, মাছের জন্য রাতের আঁধারে বাঁধ কাটা, করচ-হিজল বরুণ গাছ লাগানোর সুফল, মাছ চাষ ও জমি চাষের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা, পানি পুঁজিপতিদের হাত থেকে জেলে ও কৃষকদের সম্পৃক্ত করা ইত্যাদি বিষয়ে জেলা প্রশাসনের সহায়তায় জনগণকে সঠিক তথ্য দিয়ে অবহিত ও উদ্বুদ্ধ করার ব্যাপারে পানি উন্নয়ন বোর্ড উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের সতর্কীকরণ ব্যবস্থাকে জোরদার করা এবং জনগণের কাছে অবহিত করার ক্ষেত্রে স্থানীয় রেডিও মাধ্যম ব্যবহার করা।
বন্যার আগাম পূর্বাভাস এসএমএস, অ্যাপস’র মাধ্যমে উপকারভোগীদের মধ্যে পৌঁছানো।
হাওর অধ্যুষিত এলাকায় বাঁধ ও বন্যা বিশেষ করে আগাম বন্যা ও বৃষ্টিপাতের অবস্থা অনলাইন মনিটরিং এর জন্য একটি হাওর মনিটরিং সফটওয়্যার ডেভলেপ করা।