- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

আশ্চর্য এক নির্লিপ্ততা ঘিরে ধরেছে আমাদেরকে

ছাতকে জনৈক রেস্টুরেন্ট মালিক নাস্তা খেতে আসা এক গ্রাহককে বিল পরিশোধ নিয়ে বচসার জের ধরে পিটিয়ে মেরে ফেলেছেন। দোয়ারাবজারের সীমান্তে এক শিশু পাচারকারীকে ধরে পুলিশে দেয়ার পরিবর্তে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। জারুলিয়া জলমহালে তিন তিনটি তরতাজা প্রাণ ইজারাবৃত্তির লোভের আগুনে লুটিয়ে পড়ার পর এ নিয়ে চলছে রাজনৈতিক কথামালা। কোম্পানিগঞ্জে পাথরচাপায় নিহত ছয় শ্রমিকের বিচার দাবি করেছে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন নামের একটি সংগঠন। জগন্নাথপুরের কলকলিয়ায় শিশুদের ঝগড়াকে কেন্দ্র করে বড়দের সংঘর্ষে আহত হয়েছেন পাঁচ ব্যক্তি। ছাতকে পুলিশের ভয়ে পালাতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন মামলার এক ষাটোর্দ্ধ বয়সের আসামী। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত ছয়টি সংবাদের সারমর্ম এগুলো। সামাজিক অবক্ষয়ের জ্বলন্ত নজির এসব খবর। বরাবাহুল্য প্রতিদিনই এমন নেতবিাচক সংবাদে ভরপুর থাকে সংবাদপত্রের পাতা। বরং যেদিন সংবাদপত্রে খুন-খারাবি, মারামারি অথব্য অন্যবিধ নেতিবাচক সংবাদাদি না থাকে সেদিন যেন পত্রিকার চেহারা হয়ে উঠে ম্যাড়ম্যাড়ে প্রাণহীন। একটি পত্রিকাকে সমাজের দর্পন বলা হয়। কারণ সংবাদপত্রের পাতায় ফুটে উঠে ওই সমাজের বাস্তবতা। তো সেই হিসাবে আমাদের বর্তমান সমাজটিকে একটি হিং¯্র, লোভী, প্রতারক ও মূর্খতার প্রতিরূপ বললে অত্যুক্তি হবে না। অথচ এমন সমাজ আমাদের কারও কাম্য ছিলো না। একাত্তরে যারা নিজের জীবন বিসর্জন দিয়ে ছিনিয়ে এনেছিলেন স্বাধীনতা তাঁরা চেয়েছিলেন একটি বৈষম্যহীন শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশ। কিন্তু সেই আশা হারিয়েছে দূর নীলিমায়। আমরা বাস করছি প্রতিদিন কিছু না কিছু খারাপ খবর জানার জন্য অথবা নিজেরাই এর শিকার হতে। আশ্চর্য এক নির্লিপ্ততা ঘিরে ধরেছে আমাদেরকে। চারপাশে এত অন্যায়, অবিচার, হিং¯্রতা দেখেও আমাদের বিবেক যেন আজ পাষাণ চাপা পড়ে রয়েছে। গা সওয়া হয়ে গেছে এসব। চোখের সামনে কেউ গড়িয়ে পড়লেও ভ্রƒক্ষেপ না করে আমরা অবলীলায় পথ অতিক্রম করি। মৃত্যুকে নিয়ে রাজনীতির কূটকচালি শুরু হলে আমরা বিরক্ত হওয়ার পরিবর্তে বিনোদিত হই। সিনেমার খুন-খারাবি দেখে শিহরিত আনন্দ লাভের মতোই বাস্তবের খুন-খারাবিতেও আমরা নির্মম আনন্দ লাভের চেষ্টা করি। জারুলিয়া জলমহালে ইজারাদারের দুইপক্ষের সংঘর্ষে যখন নিরীহ তিন ব্যক্তির প্রাণবায়ু নির্গত হয় তখনও আমরা খুঁজি এর ভিতর কোন রহস্য রয়েছে কিনা। জড়িতরা যখন নানা বর্ণনায় এই খুন নিয়ে বক্তৃতাবাজি করে তখন আমরা নাটক দেখার মতোই আমোদিত হই। আমাদের মনোজগৎটি কখন কীভাবে এমন দুর্বৃত্তায়িত হয়ে গেছে তা কেউ টেরটিও পাই নি। এমন দুর্বৃত্তায়িত মনোজগৎ নিয়ে সামাজিক মঙ্গল সাধন নিশ্চিতভাবেই ধানগাছ থেকে আসবাবপত্র বানানোর মতো স্বপ্নবিলাস।
একটি পাখি মারার চাইতেও সহজ হয়ে পড়েছে একটি মানুষ মারা। নতুবা রেস্টুরেন্টে বিল পরিশোধ নিয়ে বচসার জেরে কেউ পিটিয়ে আরেকজনকে মেরে ফেলতে পারত না। কথায় কথায় অন্যকে আহত-নিহত করার উন্মত্ততায় মেতে উঠে কেউ কেউ। এরা আবার কেউকেটা। এদের সামাজিক দর খুব উঁচু। এদেরকে এখন বীর আখ্যায় তোষণ করা হয়। যে বা যারা দুই শিশু পাচারকারীকে আইনের হাতে সোপর্দ না করে জামাই আদরে ছেড়ে দেয় আমরা জানি তারা সমাজেরই নমস্য কেউকেটা।  যে সমাজটি মন্দকে নায়কে পরিণত করে আর ভাল মানুষটিকে পরিণত করে উপহাসের পাত্রে সেই সমাজের অধিবাসী হয়ে আমরা নিজেদেরকে কীভাবে মূল্যায়ন করব? নিজেরা হয়তো আমরা সেই চেষ্টা করব না। কিন্তু মহাকাল নিশ্চয়ই রেহাই দিবে না। মহাকালের হিসাবে যে যার যথাযথ মূল্যায়নেই ভূষিত হবেন।

  • [১]