আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবসের অনুষ্ঠানে ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানদের না দেখে জেলা প্রশাসক স্পষ্টতই হতাশা ব্যক্ত করে বলেছেন, ‘ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানগণ দুর্যোগ প্রশমনে কতটুকু ভূমিকা পালন করছেন এ থেকেই বুঝা যায়’। হতাশাবোধের পাশাপাশি তিনি দিকনির্দেশনাও দেন এভাবে যে, ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করতে হলে দুর্যোগ প্রশমন কমিটিতে থাকা সদস্যদের নিজ দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে হবে’। জেলা প্রশাসকের এই হতাশাবোধ আমাদের প্রশাসনিক বাস্তবতার চরম বহিঃপ্রকাশ। মূলত তিনি একটি দিবস উপলক্ষে এ কথা বললেও কম বেশি সবগুলো সরকারি পালনীয় দিবস ও কমিটি বিষয়ে এ কথা সত্য। বছরের ৩৬৫ দিনে অন্তত ১০০/১৫০ বিভিন্ন ধরনের দিবস রয়েছে। এসব অনুষ্ঠান পালিতও হয়ে থাকে কাগজেপত্রে। আজকাল এইসব কমিটি কিংবা দিবসগুলো ¯্রফে আনুষ্ঠানিকতা হয়ে উঠেছে। নিছক নিয়ম রক্ষার জন্যই বাধ্য হয়ে কিছু আনুষ্ঠানিকতা করা হয়ে থাকে। বিভিন্ন দিবস উপলক্ষে যেসব র্যালি আয়োজন করা হয় সেগুলো ফটো বা ভিডিও ধারণের জন্য যতসময় দরকার তত সময় আয়োজকরা কষ্ট করেন। আলোচনাসভাগুলোও নির্জিব ও আকর্ষণহীন হয়ে থাকে। অথচ অবস্থা এমন হবার কথা ছিল না। যে উদ্দেশ্যে কোন তারিখকে বিশেষ দিবস ঘোষণা করা হয় তার পিছনে কিছু ইতিহাস ও সুনির্দিষ্ট কিছু লক্ষ্য থাকে। যেমন ধরা যাক, গত শুক্রবার দুর্যোগ প্রশমন দিবসের পাশাপাশি ছিল জাতীয় কন্যা ও শিশু দিবস। এদিন ছিল আন্তর্জাতিক ডিম দিবসও। কন্যা ও শিশু সন্তানদের প্রতি সমাজকে দায়িত্বশীল ও সহনাভূতিসম্পন্ন আচরণে অভ্যস্ত করা কিংবা স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ও আমিষ ঘাটতি পূরণে ডিমের ভূমিকা সর্বসাধারণকে অবহিত করা তথা এ উদ্দেশ্যকে সারা বছরের কাজের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়াই এসব দিবস পালনের মূল উদ্দেশ্য। কিন্তু আজকাল যে ভাবে দিবসগুলো পালন করা হয় তাতে বিষয়টি ¯্রফে হাস্যকর বিষয়বস্তুতে গিয়ে ঠেকে। ঢাকায় ডিম দিবসে ৩ টাকা পিস হিসাবে ডিম বিক্রির আয়োজনটি কেমন অব্যবস্থাপনার শিকার হয়ে প- হয়েছে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বদৌলতে পুরো দেশবাসী তা জেনে গেছে আর আয়োজকরা হাস্যাস্পদ ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছেন। এতে করে দিবসের উদ্দেশ্য পূরণ তো দূরের কথা দিবসটিকেই বরং খেলো করে ফেলা হলো।
জেলা প্রশাসক যেমন বলেছেন, যার যার দায়িত্ব পালন করতে হবে, সেটিই হলো আসল কথা। আমরা প্রতিটি মানুষ এই সমাজের এক একটি ইউনিট। প্রত্যেকেরই কিছু কিছু দায়িত্ব কর্তব্যও রয়েছে। এর বাইরে আছেন দায়িত্বপ্রাপ্ত বিশেষ ব্যক্তিবর্গ। এঁরা সমাজের নেতৃত্ব। এঁদের দায়িত্ব আরও বিশাল। এই সাধারণ ও বিশেষ নাগরিকরা যদি স্বতস্ফূর্তভাবে যার যার দায়িত্ব পালন করি তাহলে প্রতিটি জায়গায় সফলতা আসতে বাধ্য। দুর্যোগ প্রশমনের অর্থ হলো দুর্যোগের আগে ও পরে বিশেষ কিছু উদ্যোগ নেওয়া মানুষের দুর্ভোগ কমানোর জন্য। এবার হাওর বিপর্যয়ের পর সারা দেশে যে খাদ্যসংকট দেখা গেল তাতে মনে হয়, কখনও আমাদের দেশে খাদ্যসংকট হতে পারে এটি সংশ্লিষ্টদের মাথায় ছিল না। এখানেই আসে দায়িত্ব পালনের কথা। দেশে সারা বছর কী পরিমাণ খাদ্য মজুদ রাখতে হয় তার একটি স্পষ্ট বিধান আছে। সে মোতাবেক দায়িত্বশীলরা কাজ করলে বিদেশে হন্যে হয়ে চালের জন্য ছুটতে হতো না কাউকে। আমরা সবাইকে দায়িত্বসচেতন হওয়ার আহ্বান জানাই।