- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

আসুন সকলে মিলে কৃষি খাতকে রক্ষা করি

ডিজেলের মূল্য বাড়ায় উৎপাদন খরচ বাড়ার শঙ্কায় কৃষকরা। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরের প্রধান সংবাদের বিষয়বস্তু এটি। জেলার বিভিন্ন প্রান্তের কৃষক ও কৃষক নেতাদের বক্তব্য উঠে এসেছে সংবাদে। সকলেই একবাক্যে বলেছেন- ডিজেলের এই মূল্যবৃদ্ধি আসন্ন বোরো চাষাবাদকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করবে। ফসলের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাবে কিন্তু ধানের ধাম বাড়বে না। ফলে আবারও কৃষকরা ধান চাষে আগ্রহ হারাবেন। দুই বছর আগে পর্যন্ত উৎপাদন মৌসুমে বোরো ধানের দাম ৫০০-৬০০ টাকার মধ্যে ঘুরাঘুরি করছিলো। তখন প্রতি মণ ধানে বেসরকারি হিসাবে কৃষকদের লোকসান দিতে হতো ৪০০-৫০০ টাকা। এই লোকসান মাথায় নিয়েই ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যগত অভ্যাস এবং নিজেদের খাদ্য নিরাপত্তার কারণে কৃষকরা গণহারে চাষাবাদ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেননি। কিন্তু তখন প্রতিবছরই ধান চাষের উপর নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছিল। কৃষি-খানা শুমারির পরিসংখ্যান থেকে এই চিত্র বুঝা যায়। গত দুই বছর ধরে ধানের দাম তুলনামূলকভাবে কিছুটা বাড়ার কারণে কৃষকদের মুখে হাসি ফুটে উঠেছিলো। কিন্তু এবার ডিজেলের দাম বাড়ার প্রতিক্রিয়ায় সেই হাসি আবারও ম্লান হতে চলেছে। সরকার ডিজেলে ভর্তুকি না দেয়ার যে নীতি অবলম্বন করেছেন তা যে শেষ পর্যন্ত দেশের জন্য সমূহ ক্ষতি বয়ে আনবে সেটি বিবেচনা করা হয়নি।
বাংলাদেশের কৃষকরা সবসময়ই প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক শোষণের শিকার হয়ে আসছেন অনাদি কাল থেকে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তারা পুঁজিবাদী কাঠামোগত সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। ধান উৎপাদন করে কৃষকরা লোকসানের সম্মুখীন হয়ে আসলেও এই পেশাকে কেন্দ্র করে লুটেরা ব্যবসায়ীরা কীভাবে লাভবান হচ্ছেন তার একটি পরিষ্কার চিত্র উঠে এসেছে আলতাফ পারভেজের ‘ধানচাষের প্রতিবেদন’ শীর্ষক ছোট্ট গবেষণা গ্রন্থে। তিনি হিসাব করে দেখিয়েছেন ধান উৎপাদন পর্যায়ে বীজ, সার, কীটনাশক, সেচ ও চাষাবাদের যন্ত্র ব্যবসায়ীরা কী পরিমাণ মুনাফা লুটে নিচ্ছে কৃষি খাত থেকে। ধান চাষ করে কৃষকরা কত টাকা লোকসান দিচ্ছেন তার হিসাবও ফুটে উঠেছে ওই গবেষণায়। কৃষি পণ্য ব্যবসার প্রতিটি পর্যায়ে প্রকৃত কৃষকরা ঠকছেন এক সংগঠিত পুঁজিবাদী ব্যবস্থার কাছে। ধান চাষের কারণে এইসব ব্যবসায়ীদের পকেট ভরলেও কৃষকের লোকসানের কপাল যেই কে সেই-ই রয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক ডিজেলের মূল্য বৃদ্ধি ও তজ্জনিত প্রতিক্রিয়ায় উপরোক্ত প্রতিটি জায়গায় পুনরায় মূল্যস্ফীীত দেখা দিবে। এই চাপ সইবার ক্ষমতা না থাকায় দেশের খাদ্য নিরাপত্তা যা আরেক অর্থে দেশের স্থিতিশীল পরিবেশ নিশ্চয়তার পূর্বশর্ত; কৃষিখাতে আবারও আগ্রহ হারানোর শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
উপরের মানবসৃষ্ট শোষণ ব্যবস্থার বাইরে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে কৃষকরা কয়েক বছর পর পরই সর্বশান্ত হয়ে পড়েন। অকাল বন্যা ও বাঁধ দুর্নীতির কারণে ২০১৭ সনে এমন বিপর্যয় দেখেছি আমরা। আশ্চর্যের বিষয় হলো, কৃষকদের ওই মহাসর্বনাশের পরে বাঁধ নির্মাণে গণমুখী যে পিআইসি প্রথা চালু করা হয়েছিলো সচতুর শোষণ-ব্যবস্থা সেই গণমুখী প্রথাকেও নিজেদের লাভের খাতে পরিণত করে নিয়েছে। গত মৌসুমে পিআইসি প্রথায় বাঁধ নির্মাণের নামে কতো ধরনের অনিয়ম, অপচয় ও অর্থ লুটপাট হয়েছে তা হাওরবাসী মাত্রই দেখেছেন। এরকম অবস্থায় কৃষকদের পক্ষে কথা বলার মতো সামজিক শক্তিও এখন তেমন করে সোচ্চার নেই।
কৃষি ও কৃষকদের বাঁচিয়ে না রাখলে আমাদের উন্নয়নের অন্যসব খাতগুলো তা সামাল দেয়ার ক্ষমতা রাখে না। অতীতের অভিজ্ঞতা বলে দেশে খাদ্যের অভাব থাকলে গণবিক্ষোভ বেড়ে উঠে। এই বিক্ষোভ সামাজিক কাঠামোকে অস্থিতিশীল করে তোলে। সুতরাং কৃষি খাতে যেসব শোষণমূলক ব্যবস্থা চালু আছে তা দূর করার জন্য সকলের চিন্তা করার সময় এসেছে। ডিজেলের মূল্য বৃদ্ধির অভিঘাত তার মধ্যে একটি মাত্র। আসুন সকলে মিলে কৃষি খাতকে রক্ষা করি।

  • [১]