- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

আহবান

হরলাল সরকার
ওঁ সর্ব মঙ্গল মঙ্গল্যে শিবে সর্বার্থসাধিকে।
শরণ্যে এ্যম্বকে গৌরি নারায়ণি নমোহস্তু তে।।
গত ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৭ খ্রি:/০৪ আশ্বিন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ ভোর ৫:০০ টায় দেবী পক্ষের সূচনা লগ্নে শঙ্খ ধ্বনির মাধ্যমে মহামায়া, দুর্গতিনাশিনী, অসুরবিনাশিনী দেবী দুর্গার শুভ আগমনি মহালয়া তিথিতে মহাদেবীর পুণ্য স্তবমন্ত্রে মানবলোকে জাগরিত করে আবির্ভূত হলেন মহামায়া দেবী দুর্গা। মূলত এ মহালয়ার মধ্য দিয়ে শ্রী শ্রী দুর্গা পূজার শুরু।
জাগো, তুমি জাগো, জাগো দুর্গা,
জাগো দশপ্রহরণধারিণী,
অভয়াশক্তি বলপ্রদায়িনী তুমি জাগো।
প্রণমি বরদা অজরা অতুলা
বহুবলধারিণী রিপুদলবারিণী জাগো মা।
শরণময়ী চন্ডিকা শংকরী জাগো, জাগো মা,
জাগো অসুরবিনাশিনী তুমি জাগো।।
আশ্বিন, ২৫ সেপ্টেম্বর, সোমবার সায়ং কালে দেবীর বোধন, ০৯ আশ্বিন, ২৬ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার  ষষ্ঠী পূজার মাধ্যমে আরম্ভ হবে শ্রী শ্রী দুর্গাপূজা। ১০ আশ্বিন, ২৭ সেপ্টেম্বর বুধবার মহা সপ্তমী পূজা, ১১ আশ্বিন, ২৮ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার, অষ্টমী পূজা,  ১২ আশ্বিন, ২৯ সেপ্টেম্বর শুক্রবার মহা নবমী পূজা এবং ১৩ আশ্বিন, ৩০ সেপ্টেম্বর শনিবার বিজয়া দশমীর মধ্য দিয়েই শ্রী শ্রী দুর্গা পূজার সমাপন।  গত এক মাস যাবৎ সুনামগঞ্জ শহরে ও গ্রামে আরম্ভ হয়েছে প্রতিমা নির্মাণ ও মন্দির নির্মাণ ও সাজসজ্জাকরণ, পূজার উপকরণাদি ক্রয়। বাসায় বাসায়ও চলছে পরিরষ্কার-পরিচ্ছনতা। যদিও এ বৎসর অকাল বন্যায় সুনামগঞ্জবাসীর একমাত্র বোরো ফসল তলিয়ে গিয়েছে। তার পরও ধর্মীয় রীতি নীতি মেনে গ্রাম, সমাজ, দেশ ও বিশ্বশান্তি কামনায় সুনামাগঞ্জ জেলায় ৩৩৯টি পূজা মন্দিরে শ্রী শ্রী দুর্গা পূজা অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। সকল পূজারীবৃন্দের প্রতি আহবান থাকলো অতিরিক্ত বাহ্যিক আরম্ভরতা পরিত্যাগ করে শ্রী শ্রী দুর্গা পূজার বিধি বিধান মেনে পূজা করেন।
গত বাসন্তী পূজার ষষ্ঠীর দিন সন্ধ্যায় পূজারীবৃন্দের সাথে মন্দিরে প্রতিমা দর্শন করেছিলাম। ২ এপ্রিল থেকে ০৫ এপ্রিল বাসন্তী পূজা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। নতুনপাড়া সার্বজনিন মন্দিরের সামনে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ প্রতিমা দেখেছিলাম, আদিকাল থেকে শোনা এবং ছোটকাল থেকে দেখা অনুযায়ী প্রকৃতরূপে প্রতিমা তৈরি করা হয়েছিল এখানে। প্রতিমায়  শ্রী শ্রী চন্ডীচরিতের বর্ণনা অনুসারে  প্রকৃত তপ্ত স্বর্ণের রং দেয়ায় প্রতিমায় মা দুর্গার প্রকৃত রূপ ফুঁটে উঠছিল। যে কোন সনাতন ধর্মাবলম্বী মানুষকে শ্রদ্ধা ভক্তিতে মার চরণে মাথা নত করবে। এমনভাবে প্রতিমা তৈরি করে অত্যন্ত ভক্তি ভরে পূজা করাই আমাদের উচিত। কিন্তু শারদীয় দুর্গাপূজা আসলেই দেখা যায় কিছু কিছু মন্দিরে প্রতিমা সঠিকভাবে তৈরি করা হয় না। মা দুর্গার প্রকৃত শারীরিক গঠন ও মায়ের গায়ের রং পরিবর্তন করে তৈরি হয়। অসুরকে জিন্সের হাফপ্যান্ট পড়িয়ে বা প্রতিমার পিছনে চালির মধ্যে শত শত সর্প দিয়ে
দুর্গাপূজার মূর্তি তৈরি করা হয়েছিল। ভবিষ্যতে প্রতিমা তৈরিতে এ বিষয়গুলোর প্রতি দৃষ্টি রাখার জন্য পূজারীবৃন্দের প্রতি আমার আবেদন রইল।
শ্রী শ্রী দুর্গাপূজা প্রসঙ্গে শ্রী রাম কৃষ্ণ পরমহংস দেব বলেছেন, ‘‘ প্রথম পূজারীর ভক্তি, দ্বিতীয়ত প্রতিমা সুন্দর হওয়া চাই, তৃতীয়ত গৃহস্বামী ভক্তি’’।
শ্রী শ্রী ঠাকুর সংক্ষেপে কি সুন্দর বিধান বলে গেলেন। তাঁর কথায় শৈশবে আমাদের গ্রামের বাড়ি বিশারার শ্রীশ্রী দুর্গাপূজার কথা মনে পড়ল। তখন এখনকার মত সর্বজনীন পূজা হতো না। একক বা পারিবারিক পূজা হতো। কিন্তু গ্রামের মানুষের শ্রদ্ধা, ভালবাসা আর গৃহস্বামীর ভক্তিতে পারিবারিক পূজা সার্বজনীন রূপ নিত। প্রয়াত বৃন্দবন সরকার এঁর বাড়িতে (বাবার মামার বাড়ি) মহা ধূমধামে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হতো যা এখনো হচ্ছে। ভাদ্র মাসের শুরু হতেই প্রতিমা তৈরির কাজ আরম্ভ হতো। নেত্রকোনা জেলার বারহাট্টা থানার রায়পুর গ্রামের দয়াময় আচার্য্য প্রতি বছরেই দাদুর বাড়িতে দুর্গামুর্তি তৈরি করতেন। আমাদের প্রাইমারী স্কুলের পাশে ছিল আমার এ দাদুর বাড়ি। মন্দিরের সামনে বড় আসর ঘরেই প্রতিমা তৈরির কাজ হতো। স্কুল ছুটি হলেই আমরা দল বেঁধে ছুটে আসতাম প্রতিমা তৈরির কাজ দেখতে। দয়াময় আচার্য্য আবার খুব শাস্ত্রজ্ঞ ছিলেন। প্রতিমা তৈরির সাথে সাথে বিভিন্ন দেব দেবীর আখ্যান, উপাখ্যান শুনাতেন; গ্রামের ছেলে-বুড়ো সকলেই মুগ্ধ হয়ে শ্রবণ করতেন। এ ভাবে দেখতে দেখতে আসত মহালয়া। পূজার রীতি অনুসারে ঐ দিন কলাকাটা হতো। গ্রামে বা আশে -পাশের গ্রামে যার বাড়িতে সবরী কলা গাছে ছড়ি আসত তা পূর্ব হতেই দুর্গাপূজার নামে সংরক্ষণ করা হতো। বাড়ির কর্তা মহানন্দে এবং যতœসহকারে সে কলার ছড়ি সংরক্ষণ করতেন। এর পর মহালয়ার দিন গ্রামের মানুষ কীর্ত্তন সহযোগে এ বাড়িতে গিয়ে এ কলার ছড়ি কেটে আনতো। আর এ সবরী কলা দিয়েই ছয় দিনের  পূজা করা হতো। সেই সাথে সাধারণ কলার ছড়িও অনেকগুলো ব্যবহার করা হতো ।
বৃন্দাবন সরকারের কূলগুরু শ্রী জীবন কৃষ্ণ গোস্বামী, পুরাণ বারুঙ্কা, তাহিরপুর, মহাপ্রভুর আশ্রম, নতুনপাড়া, সুনামগঞ্জ এর প্রতিষ্ঠাতা। তিনি দুর্গাপূজার প্রথম দিন থেকেই উপস্থিত থাকতেন। পূজারী হিসেবে থাকতেন মধ্যনগর থানার পন্ডিত হরকুমার তর্ক সরস্বতী, মধ্যনগর গ্রামের সুরেশ পন্ডিত, মহজমপুর গ্রামের পুরহিত কৃষ্ণকুমার চক্রবর্তী, মনীন্দ্র চক্রবর্তী, নলিনী চক্রবর্তী, রসরাজ চক্রবর্তী তারা সকলেই একাগ্রতা, সূচিতা, পবিত্রতা ও ভক্তি সহকারে পূজা করতেন। কোথায় বিন্দু মাত্র ত্রুটি যাতে না হয় সে দিকে লক্ষ রাখতেন শ্রী জীবন কৃষ্ণ গোস্বামী এবং গৃহস্বামী নিজে। ফলে অত্যন্ত শ্রদ্ধাভক্তি ও ভাবগাম্ভীর্যে অনুষ্ঠিত হত মায়ের পূজা।
আমাদের গ্রামের পূজার প্রতিমা অত্যন্ত সুন্দর হতো। বেল ষষ্ঠীর দিন হতেই আমরা ছোটরা দুর্গার প্রতিমা দর্শন করতাম, প্রসাদ নিতাম। সপ্তমী পূজার দিন যখন আমরা পূজা প্রাঙ্গণে অর্থাৎ আসরে প্রবেশ করতেই এক অপূর্ব অনুভূতির সৃষ্টি হত। প্রতিমাকে প্রণাম করে যখন শ্রীশ্রী দুর্গা প্রতিমার চরণ থেকে মুখমন্ডল পর্যন্ত দর্শন করতাম তখন মনে হত যেন মায়ের আর্শীবাদ আমাদের মস্তক থেকে শিরায় শিরায় প্রবাহিত হত।পূজার কয়েকদিন মন্দির প্রাঙ্গণ ছাড়তে ইচ্ছা হতো না।
বাড়ির গৃহস্বামী বৃন্দাবন সরকার ছিলেন জ্ঞান, ভক্তি সমন্বয়ে একজন স্বশিক্ষিত মানুষ। সারা বছরেই পূজা পার্বণ নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। দুর্গাপূজার ষষ্ঠীর দিন থেকেই গ্রামের এবং বাড়ির ভাই ভাতিজা, ভাগ্নেদের দায়িত্ব দিয়ে তিনি শুধু তদারকি করতেন। পূজারীয় সহযোগীদের দেওঘরি বলা হতো। তারা প্রতিদিন ভোরে ¯œান করেই ধূতি গামছা, মেয়ে লোকেরা নতুন শাড়ি বা পরিচ্ছন্ন শাড়ি পড়ে পূজার উপকরণ সংগ্রহ থেকে শুরু  করে পূজা সমাপনান্তে প্রসাদ বিতরণ, রাতে আরতি কালীন শত শত লোকেক সুমধুর চরণামৃত বিতরণ করার কাজ তারা সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে করতেন। আরতি চলাকালীন যাত্রা অনুষ্ঠানের জন্য চৌকি স্থাপন করা, যাত্রা দেখতে আাসা শত শত মানুষকে দাঁড়ানো অবস্থায় বসার জন্য বড় চাটাই মাথার উপর থেকে ছাড়া হতো; হুরাহুড়ি করে মানুষ এটিকে নামিয়ে বসত, আর এভাবেই আসর ভর্তি মানুষ যাত্রা অনুষ্ঠান উপভোগ করত। সবগুলো কাজই  অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে গ্রামবাসী পালন করতেন।
চাকুরীর সুবাদে জীবনের দীর্ঘ সময় সুনামগঞ্জ শহরে বাস করছি। সুনামগঞ্জ শ্রী রামকৃষ্ণ আশ্রম, দুর্গাবাড়িসহ আরও বেশ কয়েকটি পূজা মন্দিরে শ্রী শ্রী দুর্গাপূজার পূজার বিধি, বিধান মতে পবিত্রতায় ও ভাবগাম্বীর্যে, ভক্তি শ্রদ্ধার সাথে দুর্গাপূজা করা হলেও অধিকাংশ পূজা মন্ডপে ঠিকভাবে পূজা করা হয় না। পূজার সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ সিডি, ক্যাসেট বাজানো হয় এমন কি আমাদের পরম আরাধ্য অবতার পুরুষদের সিনেমার গানের সাথে জড়িয়ে গান বাজানো হয় যা; অত্যন্ত অশুভনীয়। প্রায় মন্দিরেই সর্বজনের সর্ব কাজে উপস্থিতি ও অংশগ্রহণ খুবই লক্ষণীয়। এখন বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সার্বজনীন পূজা তামসিক; এ পূজায় বিধি বিধান, ভাবগাম্ভীর্যতা, ভক্তি অনুপস্থিত থাকে। অনেক পূজায় তামসিকতা মুখ্য হয় এবং পূজাটা গৌণ। প্রত্যেক পূজা কমিটিতে জ্ঞানী, গুণী ব্যক্তিবর্গ থাকেন কিন্তু তাঁরা মনে হয় এ বিষয়ে উদাসীন থাকেন। ফলে পূজা মন্দির প্রাঙ্গণে, রাস্তাঘাটে বখাটেদের দৌড়াত্বে পূজার সুষ্ঠু, সুন্দর পরিবেশ বিঘিœত হয়। শাস্ত্রীয় বিধি বিধান অনুসরণ না করে পূজা করা  ধর্মীয় চিন্তা, চেতনা এবং হিন্দু সংস্কৃতির অন্তরায়। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের নেতৃবৃন্দ ও সকল পূজা কমিটির সদস্যবৃন্দের কাছে আমার বিনীত প্রার্থনা, আমরা যেন পূজার বিধি, বিধান মেনে, সূচিতা,পবিত্রতা, শ্রদ্ধাভক্তি সহকারে জগতপালিনী, মহামায়া, দুর্গতিনাশিনী, অসুরবিনাশিনী শ্রী শ্রী দুর্গা দেবীর পূজা করি।
যা দেবী সর্বভূতেষু শক্তি রূপেণ সংস্থিতা।
যা দেবী সর্বভূতেষু মাতৃ রূপেণ সংস্থিতা।
নমস্তস্যেই নমস্তস্যেই নমস্তস্যেই নমো নমঃ।।
নমস্কার

  • [১]