আহসানমারা সেতু নির্মাণের পর থেকেই এর নাম বীর মুক্তিযোদ্ধা শহিদ তালেবের নামে নামকরণের দাবি উঠে। সুনামগঞ্জের মুক্তিযোদ্ধা ও সাহিত্য-সংস্কৃতি সংগঠকরা সেতু এলাকায় গিয়ে শহীদ তালেবের নাম সম্বলিত একটি ফলকও তখন টানিয়েছিলেন। যতদূর জানা যায়, শহিদ তালেবের নামে সেতুটির নামকরণের বিষয়ে কর্তৃপক্ষের নিকট থেকে আশ^াসও পাওয়া গিয়েছিলো। কিন্তু এতদিনেও কেন সেতুর নামকরণ সরকারিভাবে শহিদ তালেবের নামে করা হলো না সেটাই আশ্চর্য। ৬ ডিসেম্বর সুনামগঞ্জ মুক্ত দিবসের আলোচনাসভায় বক্তারা আবারও পুরনো দাবিটি উত্থাপন করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের সরকার যখন ক্ষমতায় তখন এরকম একটি কাজে বিলম্ব বা কালক্ষেপণ হওয়াটা নিতান্তই দুর্ভাগ্যজনক।
অত্রাঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে শহিদ তালেব উদ্দিন এক বীরত্বগাঁথার নাম। শহীদ তালেব উদ্দিন স্বাধীনতা পূর্ব সময়ে সুনামগঞ্জ কলেজের ছাত্র এবং ছাত্রলীগ নেতা হিসাবে স্বাধীকার ও স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রস্তুতিপর্বে যেমন রেখেছেন অনবদ্য ভূমিকা তেমনি সশস্ত্র যুদ্ধকালে সাহসী ভূমিকায় অন্যদের কাছে প্রেরণার উৎসে পরিণত হয়েছিলেন। যুদ্ধের শেষ লগ্নে তিনি পাকবাহিনী ও তাদের দোসর রাজকার-দালালদের হাতে ধৃত হয়ে চরম নির্যাতনের শিকার হন। পাকবাহিনী সুনামগঞ্জ থেকে পালিয়ে যাওয়ার সময় আহসানমারা সেতুর কাছে তাঁকে হত্যা করে। যে জায়গার মাটিতে বীর মুক্তিযোদ্ধা তালেবের রক্ত মিশে আছে সেই এলাকার একটি স্থাপনার নামে দেশমাতৃকার জন্য জীবন উৎসর্গকারী এই বীরের নাম যুক্ত করার চাইতে আর কোনো প্রাসঙ্গিক কাজ হতে পারে না। অথচ আমরা এমন কাজটিই করতে পারলাম না। এটা কি আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রতি সীমাহীন উদাসীনতার পরিচয় বহন করে না?
স্বাধীনতার পর বীর মুক্তিযোদ্ধাদের নামে বহু প্রতিষ্ঠান, সড়ক ও স্থাপনার নামকরণ করা হয়েছিলো। কিন্তু পচাত্তরের পটপরিবর্তনের পর সচেতনভাবে এইসব নাম সরিয়ে ফেলা হয়। স্বাধীনতার চেতনায় বিশ^াসী সরকারের ক্ষমতায় আসার পর এইসব নাম পুনরুজ্জীবনের দাবি উঠে। কিন্তু বাস্তবে প্রতিষ্ঠানগুলোতে ঘাঁপটি মেরে বসে থাকা স্বাধীনতাবিরোধী চক্রের সুনিপুণ ও কৌশলী ভূমিকার কারণে এই জায়গায় তেমন সফলতা আসেনি এখনও। কিছু কিছু নাম অবশ্য ফিরে এসেছে। কিন্তু অধিকাংশই রয়ে গেছে অন্তরালে। দেশ, জাতি ও জনগণের জন্য যারা জীবন দেন তাঁরা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চেতনার অগ্নিমশাল হয়ে জাতীয় সংহতি রক্ষায় প্রেরণা জুগিয়ে যান। যাঁরা চলে গেছেন তাঁদের কাছে এমন জাগতিক মূল্যায়নের কোনো মূল্য নেই। তাঁরা কোনো কিছু পাওয়ার আশায় জীবনকে বাজী রাখেননি। কিন্তু যারা বেঁচে আছেন, যারা সমাজ, সরকার ও রাষ্ট্র পরিচালনায় যুক্ত; তাঁদের দায় অনেক। আদর্শিক জায়গাকে সুদৃঢ়করণ তথা ওই আদর্শে রাষ্ট্র গঠনের অভিপ্রায়ে জাতীয় বীরদের চিরস্মরণীয় করে রাখতে হয়। এঁদের নাম শুনে পরবর্তী প্রজন্ম তাঁদের অবদান জানার সুযোগ পায়। তাঁরা জানতে পারে তাঁদের পূর্বপুরুষদের ত্যাগ ও অবদানের কথা। এই ইতিহাস জেনে সে নিজেকে তৈরি করতে পারে। ইতিহাসহীনতা থেকে নতুন কোনো ঐতিহ্য তৈরি হয় না। জাতীয় বীরদের উপেক্ষা করার মধ্য দিয়ে বস্তত দেশের জাতীয় ঐক্য ও সংহতির জায়গাটি বিনষ্ট হয়। তদস্থলে গড়ে উঠে বিচ্ছিন্নতা, সংকীর্ণতা, আদর্শহীনতা।
আহসানমারা সেতুকে শহিদ তালেবের নামে নামকরণের জন্য দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের জন্য আমরা সড়ক ও সেতু বিভাগের দৃষ্টি আকর্ষণ করি। আমরা দ্ব্যর্থহীনভাবে বলতে চাই এ দাবি অত্রাঞ্চলের মুক্তিযোদ্ধাদের, এই দাবি অত্রাঞ্চলের সাধারণ মানুষের। শুধু নামকরণই যথেষ্ট নয়। নামকরণের সাথে সেতু এলাকায় শহিদ তালেবের ভাস্কর্য ও তার সংক্ষিপ্ত জীবনপঞ্জি খোদাই করে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। আহসানমারা সেতু অতিক্রমকালে যাতে সকল মানুষ শহিদ তালেবকে স্মরণ করে মহান মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে ভাববার সুযোগ পান সেটাই আমাদের প্রত্যাশা।