- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সহিংসতা গণতন্ত্রের জন্য এক অশনিসংকেত

হোসেন তওফিক চৌধুরী
আমাদের দেশের নির্বাচন সংস্কৃতিতে পরিবর্তন সূচিত হয়েছে। এবারই প্রথম দলীয় প্রতীক নিয়ে স্থানীয় সরকারের প্রথম স্তর ইউনিয়ন কাউন্সিল নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আমাদের দেশে ব্রিটিশ শাসনামল, পাকিস্তানী আমল এবং ২০১৬ সালের ইউনিয়ন নির্বাচনের পূর্ব পর্যন্ত নির্দলীয়ভাবেই অনুষ্ঠিত হয়েছে। দলীয় প্রতীক নিয়ে ইউপি নির্বাচন অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত ঘোষণার পর থেকেই রাজনৈতিক ও বুদ্ধিজীবী মহলে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া পরিলক্ষিত হয়। দলীয় প্রতীক নিয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে গভীর আশংকা প্রকাশ করে বিভিন্ন মহল থেকে বলা হয় এতে হিংসা হানাহানিও সংঘাত-সংঘর্ষ মাথা চাড়া দিয়ে উঠবে। বুদ্ধিজীবী মহল স্থানীয় সরকারের একেবারে প্রথম স্তরের নির্বাচন নির্দলীয় রাখার জন্য মতামত প্রকাশ করেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও দলীয় প্রতীকে নির্বাচন অনুষ্ঠানে ভিন্নমত প্রকাশ করে পূর্বতন পদ্ধতি বহাল রাখার আহবান জানান। কিন্তু কোন মহলের মতামত, সুপারিশ বা সতর্ক বার্তায় কর্নপাত না করে দলীয় প্রতীকে নির্বাচন অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় এবং সারাদেশে ছয় ধাপে নির্বাচন অনুষ্ঠানের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। কর্মসূচি অনুযায়ী গত ৩ শে মার্চ দেশে ২য় ধাপের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। নির্বাচনী তফশীল ঘোষণার পর থেকেই ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন ঘিরে সংঘাত-সংঘর্ষ নিয়ে সংশয় ও আশংকা দেখা দিতে থাকে। এই দুই ধাপের নির্বাচনে বিভিন্ন স্থানেই হত্যাকা-, সংঘাত-সংঘর্ষ হয়েছে। এতে আশংকা ও উদ্বেগ সত্যে পরিণত হয়েছে।
উল্লেখ্য যে, প্রথম ধাপের নির্বাচনে সহিংসতার ঘটনায় অন্তত ২৩ জনের প্রাণহানি ঘটে এবং আহত হয় ৮শতাধিক। প্রথম ধাপের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২২ শে মার্চ। ২য় ধাপের নির্বাচনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, নারী ও শিশু সহ ১০ জন নিহত হয়েছে। একজন ইউএনওসহ আহত হয়েছে ৪শতাধিক। দেশে প্রথম বারের মতো ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন দলীয় ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত হওয়ায় নির্বাচনে সহিংসতার আশংকা বিগত দিনের চেয়ে অনেক বেশি বলে ভবিষ্যৎ বাণী করেছিলেন স্থানীয় সরকার বিশেষ্ণরা। নতুন অবয়বের এ নির্বাচনে বাড়তি সতর্কতা এবং কঠোরতা অবলম্বনের প্রয়োজন হলেও তা গ্রহণ করা হয়নি। ফলে ফ্রি স্টাইলে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে হানাহানি ও সহিংসতা হয়েছে। শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের পরিবর্ত নির্বচন সহিংসতা খুন-খারাপি ও মারামারি হয়েছেÑএই দায় কার? কে এই দায় দায়িত্ব নেবে? নির্বাচন কমিশন না প্রশান? জনগণ চায় নির্বাচনে এ হেন অবস্থা সৃষ্টি করে যারা আতংকের পরিধি বাড়িয়েছে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। নির্বাচনে সহিংসতা সৃষ্টিকারীরা যদি অপরাধ করেও পাড় পেয়ে যায় বা তাদেও বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হয় তাহলে আগামীতে অনুষ্ঠিতব্য ইউপি নির্বাচনে সহিংসতার মাতা আরো ব্যাপকভাবে বাড়তে পারে। সময় থাকতেই এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া আবশ্যকীয়। এই দুই ধাপের নির্বাচন অনুষ্ঠানের পর উদ্ভুত পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা পর্যালোচনা শুরু হয়েছে। সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার ঢাকার একটি দৈনিক পত্রিকায় সাক্ষাৎকারে বলেছেন,‘নির্বাচনী ব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়েছে।নির্বাচন নিয়ে মানুষের আস্থাহীনতা তৈরী হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই ভোটাররা নিজের ইচ্ছায় ভোট দিতে পারেননি।’
বিশিষ্ট আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক বলেন,‘ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সহিংসতা এবং নিরীহ নাগরিকের মৃত্যুও দায় ইসিকেই নিতে হবে। সেই সাথে তিনি রাজনৈতিক দুর্বৃতায়নকেও দায়ী করেন।’
সাবেক নির্বাচন কমিশনার ছহুল হোসেন বলেছেন,‘নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট হওয়া খুবই উদ্বেগের ব্যাপার। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় আমরা হয়তো এই সংস্কৃতি থেকেই চলে যাচ্ছি। ফলে কষ্টার্জিত গণতন্ত্র ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।’
সিপিবি’র দেওয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়েছ, ইউপি নির্বাচনে ব্যাপক সহিংসা, প্রাণ হানাহানিতে নির্বাচনী ব্যবস্থার কফিনে শেষ পেরেকটি মারা হয়েছে। নির্বাচনে ব্যাপক অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা, ভোট কারচুপি, জালভোট, ভয়ভীতি প্রদর্শন, সংঘাত-সহিংসতা ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। এই দায় ইসি ও সরকার এড়াতে পাড়ে না বলে বিবৃতিতে বলা হয়। ইউপি নির্বাচনের সহিংসতায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরকারও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
প্রতীক্ষিত ইউপি নির্বাচন দুই ধাপে ইতোমথ্যে অনুষ্ঠিত হয়েছে। আরো চার ধাপ পর্যায়ক্রমে অনুষ্ঠিত হয়েছে। গত দুই ধাপের নির্বাচন উৎসবের আমেজে হয়নি। হয়েছে শংকা-আতংকের মধ্যে দিয়ে। কোন অবস্থায় এটা মেনে নেওয়া যায় না। গণতন্ত্রের জন্য এই অবস্থা এক অশনি সংকেত। এই অবস্থা থেকে উত্তোরণ ঘটাতে হবে। ‘আমার ভোট আমি দেব, যাকে খুশি তাকে দেব’ অবস্থার সৃষ্টি করতে হবে। নাহলে নামেই গণতন্ত্র থাকবে কার্যক্ষেত্রে নয়। অর্থবহ নির্বাচনের জন্য এই অবস্থা সৃষ্টি করা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। ইতোমধ্যেই বিএনপি ইউপি নির্বাচন থেকে সরে যেতে পারে বলে আভাস পাওয়া গেছে। সুষ্ঠু এবং নিরেপক্ষ নির্বাচন না হওয়ায় বিএনপি এই সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে। ইউপি নির্বাচনের পর আরো নির্বাচন হবে। যাতে ওইসব নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরেপক্ষ হয় সেজন্য দাবি জানানো হয়েছে। তাই অবিলম্বে ত্বরিত গতিতে নির্বাচনী সংস্কৃতি পূর্বতন পর্যায়ে ফিরিয়ে আনার বিকল্প নেই।
লেখক: আইনজীবী-কলামিষ্ট    

  • [১]