বিশেষ প্রতিনিধি
ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) ‘ফ্যামিলি কার্ড’এর তালিকা নিয়ে চেয়ারম্যান ও ইউপি সদস্যদের মধ্যে সমন্বয়হীনতা চলছে সুনামগঞ্জ জেলার অনেক ইউনিয়নে। এই সমন্বয়হীনতায় অসহায় দুস্থরা ফ্যামিলি কার্ড প্রাপ্তি নিয়ে স্বজনপ্রীতির শিকার হতে পারেন বলে মনে করছেন দায়িত্বশীলরা।
রমজান উপলক্ষে ভর্তুকি মূল্যে পণ্য দেয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। দেশব্যাপি কোটি মানুষের মধ্যে এই লক্ষে টিসিবির ফ্যামেলি কার্ড বিতরণ হবে। সুনামগঞ্জের ১১ উপজেলায় এই সুবিধা পাবে এক লাখ ১৪ হাজার পরিবার। আগামী তিন দিনের মধ্যে সুবিধাভোগীদের বাড়ি বাড়ি টিসিবি’র ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দেওয়া হবে। সোমবার জেলা প্রশাসক এই বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, সুনামগঞ্জে ফ্যামিলি কার্ডের তালিকা তৈরির কাজ শেষের দিকে। আগামী তিনদিনের মধ্যে কার্ড বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দেবার কাজ শুরু হবে।
সুনামগঞ্জের মান্নারগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের দুই নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য ফরহাদ আলম জানালেন, ইউনিয়নে ৩৯৬ টি ফ্যামিলি কার্ড বিতরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ইউপি সচিব ফোন দিয়ে কয়েকদিন আগে জানালেন, চেয়ারম্যান সাহেব বলেছেন আমার ওয়ার্ডে ১৫ পরিবারকে ফ্যামেলি কার্ড দেওয়া হবে, আমি যেন ১৫ নামের তালিকা জমা দেই। এরপর সংরক্ষিত আসনের একজনসহ ৫ জন ইউপি সদস্য মিলে অনুরোধ করেছিলাম আমাদের ২৫ টা করে কার্ড দেওয়া হোক। তিনি আমাদের তালিকা লাগবে না জানিয়ে দিয়েছেন।
ইউনিয়নের পাঁচ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য দীপক দাস বললেন, প্যানেল চেয়ারম্যান নির্বাচন নিয়ে চেয়ারম্যান সাহেবের সঙ্গে আমাদের মতবিরোধ তৈরি হয়েছিল। এরপর থেকে তিনি আমাদের এড়িয়ে চলেন, তিনি বিএনপি করেন, আমরা চারজন ইউপি সদস্য আওয়ামী লীগ করি এটিও দ্বন্দ্বের আরেক কারণ।
জামালগঞ্জ সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সাজ্জাদ মাহমুদ বললেন, তার ইউনিয়নের ছয় নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য নিরেশ চন্দ্র দে ফ্যামিলি কার্ড দেবার কথা বলে টাকা নিচ্ছেন বলে একজন ফোনে অভিযোগ করেছিলেন। এরপর ওই ওয়ার্ডের ইউপি সদস্যকে ফ্যামিলি কার্ডের তালিকা করার দায়িত্ব না দিয়ে, তিনি নিজেই ওখানে তালিকা করেছেন। ইউপি সদস্য ফ্যামিলি কার্ড দেবার নামে টাকা নিয়ে থাকলে, তার (ইউপি সদস্যের) বিরুদ্ধে ব্যবস্থা কেন নেওয়া হলো না, এমন প্রশ্নের জবাবে ইউপি চেয়ারম্যান সাজ্জাদ মাহমুদ বললেন, অভিযোগকারীকে ইউনিয়ন পরিষদে আসার জন্য বলেছিলাম, তিনি আর আসেন নি।
ইউপি সদস্য নিরেশ চন্দ্র দে চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে পাল্টা অভিযোগ করে বললেন, ফ্যামিলি কার্ড দেবার কথা বলে কারো কাছ থেকে টাকা নিয়েছি বা টাকা চেয়েছি এমন অভিযোগ চেয়ারম্যান প্রমাণ করতে পারবেন না। তিনি সত্য বলছেন না, আসলে তিনি আমাকে ফ্যামিলি কার্ড দিতে চান না। বিষয়টি আমি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে জানাবো।
দোয়ারাবাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দেবাংশু কুমার সিংহ বললেন, মান্নারগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এবং ইউপি সদস্যরা আমার কাছেও পরস্পরের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানিয়েছেন, আমি বলেছি, তারা নতুন নির্বাচিত হয়ে এসেছেন। নিজেদের মধ্যে সমন্বয় থাকতে হবে।
জামালগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিশ^জিত দেব বললেন, জামালগঞ্জ সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান তার ইউনিয়নের ইউপি সদস্য নিরেশ চন্দ্র দে ফ্যামেলি কার্ড বিতরণ করতে টাকা চেয়েছেন এমন অভিযোগ আমাকেও জানিয়েছিলেন, আমি সঙ্গে সঙ্গে ইউপি সদস্যকে ফোন দিয়েছিলাম, তিনি বলেছেন অভিযোগ সত্য নয়। এরপরও চেয়ারম্যানকে এই বিষয়ে খোঁজ খবর নিয়ে আমাকে জানানোর জন্য বলেছিলাম, সতর্কও করেছি, তারা পরে আর আমার সঙ্গে এই বিষয়ে কথা বলেন নি।
দোয়ারাবাজারের মান্নারগাঁও বা জামালগঞ্জ সদর ইউনিয়ন কেবল নয়। অনেক ইউনিয়নেই ফ্যামেলি কার্ডের তালিকা করা নিয়ে সমন্বয়হীনতা, স্বজনপ্রীতি ও অনিয়মের কথা ওঠেছে।
সরকার সুলভমূল্যে (ভর্তুকি) সারাদেশে এক কোটি হতদরিদ্র পরিবারকে চাল, ডাল, তেল, লবণ, আটা ও চিনিসহ ছয়টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ করবে। বছরে চার দফা এই পণ্য পাবে এসব পরিবার। আগামী এপ্রিল মাসের প্রথমে ও শেষার্ধে এবং জুলাই মাসে আরও দুই দফায় এই সহায়তা দেয়া হবে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এই খাদ্য সহায়তা কর্মসূচি টিসিবি বাস্তবায়ন করবে। বিদ্যমান যেসব খাদ্য সহায়তা কর্মসূচি চালু আছে, এটি হবে এর বাইরে অর্থাৎ অতিরিক্ত দেওয়া।
সুনামগঞ্জের সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) সভাপতি অ্যাডভোকেট আইনুল ইসলাম বাবলু বললেন, ফ্যামেলি কার্ডের তালিকায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং সংশ্লিষ্টদের সমন্বয় জরুরি। না হয় যাদের কার্ড পাবার কথা নয় তারা পাবে, যার পাওয়া জরুরি তারা বঞ্চিত হবে, সরকারের উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে।
জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন জেলায় এক লাখ ১৪ হাজার ফ্যামেলি কার্ড আগামী তিনদিনের মধ্যেই বিতরণ শুরু হবে জানিয়ে বললেন, এই কার্ড বিতরণে শতভাগ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। প্রকৃত দরিদ্ররাই এই কার্ড পাবেন।