জামালগঞ্জের সর্বজন প্রিয় জননেতা ওই উপজেলার উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ইউসুফ আল আজাদ রবিবার সকালে সিলেটের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছেন। শনিবার রাতে তিনি হৃদ্রোগে আক্রান্ত হলে তাঁকে সিলেটে ভর্তি করা হয়। তার অসুস্থতা ও মৃত্যুর আকস্মিক সংবাদটি জামালগঞ্জ তথা সুনামগঞ্জের সর্বস্তরের মানুষকে বিষাদগ্রস্ত করে তুলেছে। ইউসুফ আল আজাদ হাওরাঞ্চলের অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির একটি স্তম্ভ ছিলেন। তিনি ইউনিয়ন পরিষদ ও উপজেলা পরিষদ মিলিয়ে বহুবার জনপ্রতিনিধিত্ব করেছেন। সর্বশেষ উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার কয়েক মাসের মধ্যে তিনি মৃত্যুর হিমশীতল কোলে ঢলে পড়লেন। বার বার নির্বাচিত হওয়া থেকে তার ঈর্ষণীয় জনপ্রিয়তার বিষয়টি আঁচ করা যায়। প্রকৃত অর্থেই তিনি জনঘনিষ্ট একজন নেতা ছিলেন, যেরকম নেতা এখন খুব একটা দেখা যায় না। তাঁর সহজ সরল চলাফেরা, নিরাভরণ জীবন যাপন, অন্যের বিপদে ছুটে যাওয়ার অভ্যাস, সততা, মুক্তমন; সবকিছু মিলিয়ে হাওরাঞ্চলের রাজনীতিকদের মধ্যে তিনি এক ব্যতিক্রমী অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। তাই জীবনের কোনো অবস্থানেই তিনি স্বাধীনতার চেতনা থেকে বিচ্যুত হননি। আমৃত্যু একজন নির্ভীক ও সজ্জন জননেতার বৈশিষ্ট্যকে অক্ষুণœ রেখে তিনি চলে গেলেন। তাঁর আকস্মিক মৃত্যুতে দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর পরিবার ভীষণভাবে মর্মাহত ও শোকগ্রস্ত। আমরা তাঁর স্মৃতির প্রতি জানাই অকৃত্রিম শ্রদ্ধা।
রাজনীতি, জনপ্রতিনিধিত্ব কিংবা ক্ষমতা; এখন সবকিছুই ব্যক্তিগত স্বার্থ সিদ্ধির হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। নিজের বাইরে চিন্তা করার ইচ্ছাটাই বিলুপ্ত হয়ে পড়েছে এই সময়ে। ‘সকলের তরে সকলে আমরা, প্রত্যেকে আমরা পরের তরে’ এই সামাজিক মূল্যবোধ তিরোহিত হয়ে শামুকের খোলশের ভিতর ঢুকে যাওয়ার বর্তমান সময়ে কেউ যখন খোলশ ভেঙে মানবতার পক্ষে পতাকা উঁচিয়ে ধরেন, তখন তিনি নিশ্চয়ই বিরল ব্যতিক্রম। ইউসুফ আল আজাদ ছিলেন এমনই এক ব্যক্তি। তাই তাঁর আকস্মিক মৃত্যুতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শোকের মাতম তৈরি হয়েছে। সকলের মুখে মুখে এক উচ্চারণÑ একজন নির্ভেজাল জনসেবীর এই মৃত্যুশোক অপূরণীয়। তারপরেও মানুষ মরণশীল, কখনও কেউই অমর নয়। অমরত্ব শব্দটির সার্থকতা ব্যক্তি মানুষের শারীরিকভাবে বেঁচে থাকার মধ্যে নয়। বরং নিজের কীর্তি গুণে শারীরিকভাবে অনুপস্থিত থেকেও যিনি মানুষের মনে চির জাগরূক থাকেন সেইসব মহৎপ্রাণ ব্যক্তিদের জন্য অমরত্ব শব্দটি যথার্থ। ব্যক্তি নিজে নিজে অমরত্ব লাভ করতে পারে না। জনে জনে, প্রজন্মে প্রজন্মে, কালে কালে বহুজনের স্মরণের মাধ্যমেই ব্যক্তি বিশেষ অমর হয়ে উঠেন। তাই ব্যক্তির অমরত্ব প্রাপ্তি শেষ অর্থে জনতার স্মারক উপহার। ইউসুফ আল আজাদের জীবনের কর্মপ্রবাহ মূল্যায়ন করবে ভাবী কাল। সেই মূল্যায়নে তিনি অমর হবেন কি হবেন না সেও সময়ই নির্ধারণ করবে। তবে আপাতত আমরা এটুকু বলতে পারি, তাঁর মৃত্যুতে যে অসীম শোকগ্রস্ততা লক্ষ করা যাচ্ছে, যে হৃদয়ানুভূতি প্রকাশিত হচ্ছে সার্বজনীনভাবে, তাতে প্রাথমিক বিবেচনায় ধরে নেয়া যায় তিনি একটি সার্থক জীবন পার করেছেন। এমন জীবনই তো আমাদের কাম্য।
ব্যক্তির শূন্যতা বেশি দিন থাকে না, আবার এও সত্য তাঁর শূন্যতা অন্যের দ্বারা পূরণও হয় না। তবে তাঁকে অনুসরণ ও অনুকরণ করা যায়। ইউসুফ আল আজাদের প্রয়াণে নিশ্চয়ই তাঁর আদর্শ ধারণকারীরা এই মহৎ মানুষটিকে বিস্মরণের অতলে হারিয়ে যেতে দিবেন না। তাঁদের মধ্যে কেউ না কেউ অবশ্যই তাঁর আদর্শের পতাকাকে উর্দ্ধে তুলে ধরবেন। ব্যক্তির আদর্শ ধারণের মধ্যেই থাকে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের সর্বোত্তম পন্থা। আমরা সেই রকম আরও অনেক ইউসুফ আল আজাদের আগমন প্রতীক্ষায়।