এনামুল হক, ধর্মপাশা
নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার গুমাই নদীতে যাত্রীবাহী ট্রলারডুবির দুইদিন পর শিশুসহ আরও দুজনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এ নিয়ে মোট ১২ জনের লাশ উদ্ধার হয়েছে। নিহত ১২ জনের মধ্যে ১১ জনই সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার মধ্যনগর ইউনিয়নের ইনাতনগর ও একই উপজেলার পাইকুরাটি ইউনিয়নের জামালপুর গ্রামের বাসিন্দা। এছাড়াও নেত্রকোনার মেদনী গ্রামের এক নারীও রয়েছে মৃতের তালিকায়। শুধুমাত্র ইনাতনগরেই ১ জন পুরুষ, ৩ নারী ও ৫ শিশুসহ ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। তবে আরও কেউ নিখোঁজ রয়েছে কি না তা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারছে না। এদিকে গত বৃহস্পতিবার সকাল থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত ঘটনাস্থলে উদ্ধার অভিযান চালায় দমকল বাহিনী ও বাংলাদেশ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের পৃথক দুটি ডুবুরি দল। কিন্তু সারাদিন উদ্ধার অভিযানের পর নিখোঁজ কারও সন্ধান পায়নি ডুবুরিরা। ফলে ওইদিন রাতেই উদ্ধার অভিযান সমাপ্ত ঘোষণা করে প্রশাসন।
এদিকে ইনাতনগর গ্রামের দুজন নিখোঁজ থাকায় শুক্রবার সকাল থেকেই স্বজনেরা স্থানীয়দের নিয়ে উদ্ধার অভিযান চালালে দুপুর ১২টার দিকে ধর্মপাশা উপজেলার হলদির হাওর থেকে রতন মিয়া (৩৫) ও একই হাওরের অন্য অংশ থেকে দুপুর আড়াইটার দিকে মনিরা আক্তারের মরদেহের (৫) সন্ধান পাওয়া যায়। রতন মিয়া ইনাতনগর গ্রামের আব্দুল হান্নান অরফে আবু মিয়ার ছেলে এবং মনিরা আক্তার একই গ্রামের আব্দুল ওয়াহাবের মেয়ে। ট্রলারডুবিতে আব্দুল ওয়াহাবের মেয়ে মনিরা আক্তার ছাড়াও তার স্ত্রী লুৎফুন্নাহার (২৬) ও ছেলে রাকিবুল হাসানের মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার রতন মিয়া ও মনিরা আক্তারের মরদেহ ইনাতনগর গ্রামে পৌঁছালে এক হৃদয়বিদারক ঘটনার অবতারণা হয়। একই গ্রামে ৯ জনের মৃত্যুর ঘটনা পুরো গ্রামকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। নেমে এসেছে শোকের কালো ছায়া। হাওরপাড়ের হাসিখুশি মাখা গ্রাম যেন মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে। একে অপরকে শ্বান্তনা দেওয়ার ভাষাও যেন হারিয়ে ফেলেছে সবাই।
মনিরা আক্তারের বাবা আব্দুল ওয়াহাব এখনও নিজেকেই দোষ দিচ্ছেন। ট্রলারডুবির সময় তিনিও ট্রলারে ছিলেন। মনিরাকে তিনি বুকের মাঝে শক্ত করে ধরেছিলেন। কিন্তু শেষ রক্ষা করতে পারেননি। শুক্রবার মনিরার মরদেহ দেখে বুকফাটা আর্তনাদে বারবার এ কথাই বলছিলেন আব্দুল ওয়াহাব।
রতন মিয়া ও মনিরার মরদেহ উদ্ধারের খবর পেয়ে সুনামগঞ্জ ও নেত্রকোনা জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকেই দুটি পরিবারকে নগদ ৩০ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা পৌঁছে দিয়েছেন মধ্যনগর ইউপি চেয়ারম্যান প্রবীর বিজয় তালুকদার। তিনি বলেন, ‘স্বজন হারানোর বেদনায় প্রতিটি পরিবার স্তব্ধ হয়ে গেছে। শান্তনা দেওয়ার ভাষাও হারিয়েছি আমরা। শোক সন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাই এবং তাদের যে কোনো প্রয়োজনে বা সমস্যায় পাশে আছি।’
মধ্যনগর থানার ওসি আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘যদি আরও কেউ নিখোঁজ থাকতো তাহলে অবশ্যই স্বজনেরা খোঁজ করতো বা আমাদেরকে জানাতো। যেহেতু কেউ খোঁজ করছে না তাই তাই মনে হচ্ছে আর কেউ নিখোঁজ নেই।’
কলমাকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সোহেল রানা বলেন, ‘বৃহস্পতিবার রাত ৮টা পর্যন্ত ঘটনাস্থলে উদ্ধার অভিযান চালায় ডুবুরি দল। কাউকে খোঁজে না পাওয়ায় ডুবুরি দল উদ্ধার কার্যক্রম সমাপ্ত ঘোষণা করায় উদ্ধার কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে।’
গত বুধবার সকালে মধ্যনগর থেকে একটি যাত্রীবাহী ট্রলার ৩৫/৪০ জন যাত্রী নিয়ে নেত্রকোনার ঠাকুরাকোনা যাওয়ার পথে গুমাই নদীতে বাল্কহেড নৌকার সাথে মুখোমুখী সংঘর্ষে যাত্রীবাহী ট্রলারডুবির ঘটনা ঘটে।