আসাদ মনি
মো. নুর মিয়া। ২০১৮ সালে তাবলিগ জামায়াতে গিয়েছিলেন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দ্বীপ রাষ্ট্র ইন্দোনেশিয়ায়। সেখানে তিনি দেখলেন পুকুরে বড় বড় মাছের চাষ হচ্ছে। নিজের কৌতুহলী মনকে আর চেপে রাখতে পারলেন না। এক পুকুরের মালিককে জিজ্ঞেস করলেন সেগুলো কি মাছ? বললো, কাতল মাছ। জানলেন পুকুরের একটি কাতল মাছের বয়স ১৪ বছর।
এরপরেই তিনি এরকম পুকুরে মাছ চাষ করার চিন্তা করলেন। যেই ভাবনা সেই কাজ। দেশে এসে নিজের বোরো জমির প্রায় ৬ একর জায়গাতে গড়ে তুলেন মৎস্য খামার। পাঙ্গাস, তেলাপিয়া, মৃগেল, ব্রিগেড, সিলভারসহ সব ধরণের মাছ চাষ হয় এখানে। বছরে একবার মাছ বিক্রি করেন। এবছর প্রায় ৪০ লক্ষ টাকার মাছ বিক্রি করেছেন তিনি। এখন তিনি একজন সফল মৎস্য খামারি।
মো. নুর মিয়ার বাড়ি তাহিরপুর উপজেলার দক্ষিণ বড়দল ইউনিয়নের পুরান কালাস গ্রামে। তাবলিগ জামাতের সঙ্গে তিনি যুক্ত রয়েছেন। সেই সুবাদে ঘুরেছেন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ। ইন্দোনেশিয়ায় পুকুরে মাছ চাষের অভিজ্ঞতা নিয়ে নিজের দেশে তৈরি করেছেন বড় মৎস্য খামার। তার খামারে এখন ৪ জনের কর্মসংস্থান হয়েছে। খামার করতে প্রাথমিকভাবে প্রায় ১ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। সম্পূর্ণ খরচের টাকা না উঠলেও আগামী কয়েক বছরেই এই টাকা উঠে যাবে বলে জানান তিনি।
মাছের খামারের ম্যানেজার মো. এনামুুল হক বলেন, এই ৬ একর জমিতে ফসল করতে কষ্ট হয়। তাই আমরা ফিসারি করেছি। এর আগে সড়কের পাশে প্রায় ৩০ শতাংশ খালে গ্রাসকার্প মাছ চাষ করেছিলাম। সেখানে অনেক লাভবান হয়েছি। এরপর হাজী সাবের পরামর্শে ৬ একর জায়গা খনন করে পুকুর তৈরি করি। ২০১৮ সালের মার্চের প্রথম দিকে পুকুর খননের কাজ শেষ হয়। এই জায়গাতে ৩ টি পুকুর হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, মাটি খনন করে পুকুরের পাড় নির্মাণ করা হয়েছে। অতিরিক্ত মাটি দিয়ে রাস্তার পাশে উঁচু করে থাকার জায়গা তৈরি করা ও ফলের গাছ রোপণ করা হয়েছে। বৃষ্টির পানিতে নতুন মাটি যেনো অন্যের জমিতে না যায় এজন্য পুকুরগুলো চারদিকে পাকা দেয়াল করতে হয়েছে। এতে এ পর্যন্ত প্রায় ১ কোটি টাকা খরচ হয়েছে বলে তিনি জানান।
পুকুরের সেকেন্ড ম্যানেজার সুবল পাল বলেন, এই খামার চালুর পর প্রায় ৩ বছর হয়ে গেছে। হাজী নুরমিয়া সাব দিয়েছেন এই মৎস্য খামারটি। আগে ইমপোর্ট এক্সপোর্টের ব্যবসা ছিলো উনার। ডাম্পের বাজারে দোকানও ছিলো। পাটলাই নদীর দুই পাড় নতুন বাজার ও ডাম্পের বাজারে ব্রিজ হওয়ার পরে সে দোকান ছেড়ে দিতে হয়েছে। তিনি বলেন, পাঙ্গাস, তেলাপিয়া, মৃগেল, ব্রিগেড, সিলভারসহ সব ধরণের মাছ চাষ হয় এখানে। বছরে একবার মাছ বিক্রি করি আমরা।
এ পর্যন্ত কত টাকার মাছ বিক্রি হয়েছে এই পুকুরগুলো থেকে? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রায় ৪০ লক্ষ টাকার মাছ বিক্রি করেছি। প্রতিবছরেই চৈত্র মাসে মাছ ধরা হয়। মাছ চাষের ব্যবসা একটি লাভজনক ও হালাল উপায়ে অর্থ আয়ের উৎস। একটু শ্রম দিলেই এই খাতে সফল উদ্যোক্তা হবার সম্ভাবনা রয়েছে।
উত্তর শ্রীপুর ইউনিয়নের বালিয়াঘাট গ্রামের বাসিন্দা মো. বাবর আলী বলেন, হাজী সাব মৎস্য খামার নিয়ে খুব সুন্দর একটি উদ্যোগ নিয়েছেন। উনার এই উদ্যোগ নিয়ে আমাদেরও চিন্তা করা দরকার। বেকার না বসে এরকম মৎস্য খামার করে নিজেই উদ্যোক্তা হওয়া যাবে। এতে নিজের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি আরও কয়েকজন বেকারকে কাজ দেয়ার ক্ষেত্র তৈরি হবে।
তরুণ উদ্যোক্তা আবুল হাসনাত খান কাজল বলেন, আমাদের হাওরাঞ্চলে কোনো কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা নেই। এখানে আমাদের জীবিকা নির্বাহ করতে খুবই কষ্ট হয়। একেকটা সময়ে একেকটা কাজ থাকে। অনেক সময় বছরের ৩ বা ৬ মাস কাজ থাকে। বাকী সময়ে বেকার হয়ে থাকতে হয়। এই অবস্থায় হাজী নুরমিয়া সাব অনেক বড় একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছেন। মৎস্য খামারের পাশাপাশি বিভিন্ন ফলের গাছ রোপন করেছেন। উনার এই কাজ দেখে আমরা যুব সমাজ উৎসাহ পাচ্ছি নিজে উদ্যোক্তা হবার।
জেলা মৎস্য অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সীমা রাণী বিশ^াস বলেন, মো. নুরমিয়া হাজীর মৎস্য খামার দেখে এলাকার তরুণরাও উৎসাহিত হচ্ছে। উনি বোরো ধানের ৬ একর জমিতে মৎস্য খামার করেছেন। এজন্য নুরমিয়া হাজী কে ধন্যবাদ জানাই। এলাকার বেকার তরুণরা যদি এরকম উদ্যোগ নিতে চায়, আমরা তাদেরকে সব রকমের সহযোগিতা করবো। বিশেষ করে উপজেলা পর্যায়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করবো।