- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

উচ্চ ফলনশীল ধানের আধিপত্যে হারিয়ে যাচ্ছে দেশী ধান

মধ্যনগর প্রতিনিধি
‘আগের দিনের দেশী ধানের কথা মনে অইলে অহনও গেরান (ঘ্রান) নাহে (নাকে) লাগে। ভাতের মজা জিবরায় (জিহ্বায়) লাইগ্যা থাহতো (থাকতো)। যেকুনু ছালুন (তরকারি) দিয়া খাওনের রুচি অইত। হুদা ভাতও পেড ভইরা খাওন যায়, দেশী চাউলের ভাত অইলে।’
মধ্যনগর উপজেলার হাতপাটন গ্রামের ষাটোর্ধ্ব কৃষক দ্বিজেন্দ্র তালুকদার হারিয়ে যাওয়া দেশী ধানের স্মৃতিচারণ করে আক্ষেপের সুরে বলছিলেন এসব কথা।
তিনি আরও বলেন, হাওরের গভীর পানির ধান বইয়াখাউরি। এ ধান রোইয়া (রোপণ) কৃষক আর ক্ষেতে গিয়ে উহি (উঁকি) দিত না। বাড়িতে নিশ্চিন্ত মনে বইয়া-খাইয়া দিন কাটাইতো। আর ধান পাকলে কাইট্টা বাড়িত আনত। এর লাইগ্যা (এজন্য) এই ধানের নাম বইয়াখাউরি।
দিজেন্দ্র তালুকদারের মতো এলাকার প্রবীণ কৃষকদের স্মৃতিতে এখনো তাজা হাওরের সুস্বাদু ও সুগন্ধি রাতা, বাঁশফুল, টেপি, গছি, লাখাইয়া, কালিজিরা, জগলি বোরো, বিন্নিধান। স্থানীয় সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্বকারী এসব ধান কালের পরিক্রমায় উচ্চ ফলনশীল ধানের আধিপত্যে হারিয়ে যাচ্ছে।


কৃষকরা বলেন, উফসী ও হাইব্রিড জাতের ধান ভালো ফলন দিলেও এর বহুমাত্রিক ক্ষতিকর প্রভাবও রয়েছে। এবার উফসী জাতের ব্রি ২৮, ব্রি ২৯, ব্রি ৮৯ ধানে ব্লাস্টের সংক্রমণ এর উদাহরণ। এ পরিস্থিতিতে দেশের কৃষি বিজ্ঞানী ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকে হাওরের গভীর পানির ধানের জাতগুলোর মূল বৈশিষ্ট্য ঠিক রেখে অধিক ফলনশীল করার জন্য উদ্যোগ নিতে হবে।
জানা যায়, হাওরাঞ্চলে একসময় প্রায় ২২৮ প্রজাতির বোরোধান চাষ হতো। এ সকল প্রজাতির মধ্যে ছিলো টেপি, বোরো, রাতা, শাইল, লাখাইয়া, মুরালি, চেংড়ি, কালিজিরা, সমুদ্রফেনা, হাসিকলমি, কাশিয়াবিন্নি, দুধবাকি, দুধসাগর, লাটলী, মারতি, তুলশীমালা, আখনিশাইল, গাছমালা, খৈয়াবোরো, দেউড়ি, কন্যাশাইল, বিচিবোরো, লোলাটেপী, পশুশাইল, হাসেরডিম, গুয়ারশাইল, বেতি, ময়নাশাইল, গদালাকি, বিরইন, খিলই, ছিরমইন, আগুনি, গুলটিহি, ল্যাটা, জগলীবোরোর প্রভৃতি।


বানের সঙ্গে যুদ্ধ করে টিকে থাকা দেশী ধান ছিল হাওরের কৃষকের ভরসা ও শক্তির প্রতীক। বেশি ফলনের কথা বলে সরকারি-বেসরকারিভাবে উচ্চ ফলনশীল (উফশী) ধান চাষ করা হচ্ছে। তবে ফলন বেশি হলেও দেশী ধানের তুলনায় উফশী ধান পাকে দেরিতে। ফলে আগাম বন্যায় প্রতিবছর এই ধানের ক্ষতি হয়। সে তুলনায় এখন অল্প জমিতে কৃষকরা দেশী ধান রোপণ করে লাভবান হচ্ছে। খরচ ছাড়াই চাষকৃত দেশী ধান পানি আসার আগেই কেটে ফেলা যায়। হাওরাঞ্চলের ঐতিহ্য ধরে রাখতে কিছু কৃষক এখনও দেশী ধান চাষ করছে। চলতি মৌসুমে এসব ধান ইতোমধ্যে কেটে গোলায় তুলেছে কৃষক। ফলনও হয়েছে ভালো। একর প্রতি উৎপাদন হয়েছে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ মণ ধান। দেশী ধানের চাষ এখন স্বচ্ছল কৃষকের সৌখিনতায় রূপ নিয়েছে। আর সাধারণ কৃষকেরা হাওরের একবারে তলায় কিছু চাষাবাদ করে।
মধ্যনগর উপজেলার বংশীকুন্ডা দক্ষিণ ইউনিয়নের ঘাসী গ্রামের কৃষক দানেশ চক্রবর্তী বলেন, দেশী ধান অবহেলায় জমিতে বেড়ে ওঠে, পাকে আগে। চাষ করতে কোনো বাড়তি খরচই নেই। সার, কীটনাশক কিছুই লাগে না। এবার আমি এক বিঘা জমিতে দেশী লাখাইয়া বোরো জাতের ধান চাষ করেছি। ভালো ফলন হয়েছে।
একই ইউনিয়নের নিশ্চিন্তপুর গ্রামের কৃষক আবুল কাশেম জানান, তিনি টাঙ্গুয়ার হাওরে ২৫ বিঘা জমিতে দেশী জাতের ধান শাইল বোরো চাষ করেছিলেন। বীজ ছিলো নিজের ঘরের। সর্বসাকুল্যে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৪০ হাজার টাকা। ক্ষেতে চারা রোপণের পর কোনো সার বা কীটনাশক দেননি। আগাছা দমন করতে হয়নি, দিতে হয়নি পানি সেচ। ফলনও হয়েছে ভাল। মৌসুমে সবার শেষে রোপণ করেও সবার আগে সোনা রংয়ের ঝকমকে ধান গোলায় তুলেছেন তিনি।


তিনি আরও জানালেন, ধান কাটা শ্রমিকের মজুরী জনপ্রতি ৫০০ টাকা করে মোট ৬০ হাজার টাকা দিতে হয়েছে। আর ধান উৎপাদন হয়েছে বিঘাপ্রতি ১০ মণ হারে প্রায় ২৫০ মণ, যার বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় সাড়ে তিন লক্ষ টাকা।
মধ্যনগর ও ধর্মপাশা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মীর হাসান আল বান্না বলেন, দেশীয় গভীর পানির ধানের জাতকে উচ্চ ফলনশীল করতে ধান গবেষণা ইন্সটিটিউট কাজ করে যাচ্ছে। সর্বশেষ আবিস্কৃত ধানের জাতগুলোর মধ্যে দেশীয় জাতের কম্বিনেশন রয়েছে।
তিনি বলেন, চলতি বছর মধ্যনগর উপজেলায় ১৩ হাজার ২৬৪ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষ করা হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২৮ হাজার ৪৮১ মে. টন। এর মধ্যে ব্রি-২৮ ধানের চাষ হয়েছে ৭ হাজার ৪৯৫ হেক্টর জমিতে। আর দেশীয় ধানের চাষ হয়েছে মাত্র ৩০০ থেকে সাড়ে ৩৫০ হেক্টর জমিতে।

  • [১]