- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

উদীচীর ঘরানা ও ঘরবন্দিত

ইকবাল কাগজী¡
(পূর্ব প্রকাশের পর)
আজ সন্ধ্যা সাতটার দিকে শুরু হলো যে গানের অনুষ্ঠান, সেটির শ্রোতা  লোকোৎসবের মতো আমজনতার বিশাল সমাবেশ নয়, সীমিত সংখ্যক শ্রোতা এর উদ্দিষ্ট, যদিও আয়োজক গণমানুষের সংস্কৃতিমনস্ক সংগঠন উদীচী। সুনামগঞ্জের বর্তমান উদীচী ইতোমধ্যেই গণসংস্কৃতিচর্চার নামে ঘরবৈঠকী সংস্কৃতিচর্চার খোলস ঝেড়ে ফেলে গণমানুষের কাতারে গিয়ে দাঁড়ানোর প্রচেষ্টায় চরিতার্থতা অর্জন করেছে। তারা হাওরপাড়ের জনপদে, একে একে পাঁচটি উপজেলায়,  গিয়ে ‘ভাসান পানির কথা’ পথনাটক করে এসেছে। তাছাড়া গত ফসলডুবিতে ফসলহারা কৃষকের বিপর্যয় মোকাবেলায় সাংগঠনিক সক্রিয়তাসহ হাওরবাঁচাও সুনামগঞ্জ বাঁচাও অন্দোলন, পাউবোর ঠিকাদাররে কোশপুত্তলিকাদাহ, জঙ্গিবাদবিরোধীতা, আশির দশকের ভাসান পানির আন্দোলনের উপর তথ্যচিত্র নির্মাণ, টিপাইমুখ বাধপ্রতিরোধ, পাঠ্যসূচিতে সাম্প্রদায়িকতার বিরোধিতা ইত্যাদি গণআন্দোলনে অংশগ্রহণ অতীতে যা ছিল সুনামগঞ্জের উদীচীর পক্ষে কল্পনাতীত। আপাত দৃষ্টিতে মনে হতে পারে উদীচী এ অনুষ্ঠান করে স্বীয় আদর্শ থেকে কীছুটা হলেও সরে গেছে, হয়ে উঠেছে অনেকটা প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে ‘হাওরপাড়ের গল্প’ বলার আসরের মতো লোকবিরহিত। লোকেরা তো মুখে কুলূপ এঁটে বসে থাকে না। সুতরাং কোনও কোনও দুর্মুখ অর্থাৎ দোষৈকদর্শী কেউ কেউ যেমন বলে, উদীচী আজকাল প্রশাসনিক আদর্শে বিনোদনের কিংবা প্রশাসনিক সংস্কৃতিচর্চার অনুসারী হয়ে উঠেছে, এটা উদীচীর আদর্শ-ঐতিহ্যানুসারে একধরনের পশ্চাৎপদতা এবং একটু বাঁকা অর্থে আমলাতান্ত্রিকতার আদর্শিক নেওটামি। নিন্দুকের এইরূপ একদেশদর্শী মন্তব্য সুনামগঞ্জের তথা সারা দেশের বর্তমান সাংস্কৃতিক পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনায় প্রশ্নসাপেক্ষ তো  বটেই, এমনকি মোটেও সমীচীন নয়। বাংলাদেশের বর্তমান সাংস্কৃতিক পরিপ্রেক্ষিতের নিরিখে অনুষ্ঠানের সূত্রধর (আলমগীর) কী বলেছেন সেটা অবশ্যই  বিবেচনার বাইরে রাখা অসমীচীন হবে। সঙ্কটাপন্ন এই সময়ের সহজ শিকার বিভ্রান্ত তরুণদের বিষয়টি মাথায় রেখে তিনি বলেছেন, ‘শঙ্কার বিষয় হচ্ছেÑ বড়ই প্রতিকূল সময় এখন এদের জন্যে। চারদিকে প্রযুক্তিলব্ধ কতরকমের প্রলোভেন, অপসংস্কৃতির নোংরা হাতছানি, সহজ প্রাপ্তিযোগের কত উদাহরণ। পরিবার, শিক্ষালয়, সমাজ, রাজনীতিÑ সর্বত্র মূল্যবোধের ক্রমবর্ধমান ধ্বস।  প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রসঙ্গে কিছু বলবো না, কিন্তু এর বাইরে জানার বা শেখার আগ্রহ জন্মায়Ñ তেমন অনুকূল পরিবেশই তো পাচ্ছে না এরা। তাই তো সুস্থ চিন্তায়, সঠিক পথে এদেরকে স্থিতু রাখাটাই এখন বড় চ্যলেঞ্জ। প্রতিকূল এই সময়ে তন্ত্র-মন্ত্রের গুরুপাক তত্ত্ব তাদেরকে কতটা আকর্ষণ করে বা সহসাই করবে এ বিষয়েও সন্দেহ আছে বিস্তর। তাই আমার মনে হয়, শুরুতেই খুব গভীরে না গিয়ে নিজের সংস্কৃতির শেকড়টা তাদেরকে চিনানো দরকার। এরপর শেকড়কে কেন্দ্র করে আশপাশে বিচরণ করুক, সমস্যা নেই। শুধু দেখতে হবে পরাশ্রয়ী হয়ে যেন না যায়, নিজের শেকড়কে ভুলে যেন পরগাছা হয়ে না যায়। তাই সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় ওদের সাংস্কৃতিক কর্মকা- পরিচালনার ক্ষেত্রটিকে আদর্শিক বলয়ে আবদ্ধ না রেখে আরও একটু বিস্তৃত করা দরকার কি না ভাবা দরকার।’
 সত্যিকার অর্থেই ‘শুরুতেই খুব গভীরে না গিয়ে নিজের সংস্কৃতির শেকড়টা তাদেরকে চিনানো দরকার।’ সূত্রধর (আলমগীর) আরও বলেছেন, ‘সাংস্কৃতিক কর্মকা- পরিচালনার ক্ষেত্রটিকে আদর্শিক বলয়ে আবদ্ধ না রেখে আরও একটু বিস্তৃত করা দরকার’। এই দরকারটা কেবল সূত্রধরের কথামতো ‘আদর্শিক বলয়ে আবদ্ধ না রেখে’ অর্থে নয়, বরঞ্চ একটু বাড়িয়ে বলতে চাই, ‘আদর্শিক বলয়টিকে আরও বেশি মজবুত ও শেকড়াশ্রয়ী করা’ অর্থে বেশি জরুরি, এই জন্যে যে, ‘শুরুতে খুব গভীরে’ না গেলেও একসময় তো ‘আদর্শিকতার গভীরে’ (সূত্রধর তো এটাই বুঝিয়েছেন বলে প্রতীতি হচ্ছে) যেতেই হবে। এই আদর্শিকতার গভীরে যেতে হলে শেকড়সন্ধানী না হয়ে কোনও উপায় নেই। মনে রাখতে হবে শেকড়বিহীন আদর্শ কোনও যুক্তিতেই আদর্শ বলে বিবেচিত হতে পারে না। সুতরাং অতীতচারিতা অর্থে ‘মনের জানালা ধেরে উকি’ দেওয়াটা ‘সাংস্কৃতিক কর্মকা- পরিচালনার ক্ষেত্রটির আদর্শিক বলয়’-এর  বাইরের কীছু নয়। উদীচীর ঘরনার ঘরবন্দিত্ব নিয়ে আলোচনা করার আগে উদীচীর  সাংস্কৃতিক আন্দোলনের এই আদর্শিক দিকটির কথা ভুলে যাওয়াটা খুব একটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। মনে রাখতে হবে, ‘মনের জানালা ধরে উকি দেওয়া’ ভুলে গিয়ে স্বপরিচিতির বাইরে গিয়ে আর যাই হোক অন্তত কোনও বিপ্লব হতে পারে না। কেবল বিপ্লব বিপ্লব করে ‘ডান বাম ডান বাম’ (লেফ্ট রাইট লেফ্ট রাইট) করতে করতে স্থানিক অবস্থান বজায় রাখলেই বিপ্লব হয় না। একাত্তরের মতো বাঙালি জাতির জীবনে এত বড় আর এত মহৎ বিপ্লব আর একটিও হয়নি, সেটিতে অনেক সংগঠনের সঙ্গে উদীচীর অনিবার্য অংশগ্রহণ কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। ইতিহাস সাক্ষী, সবকীছু পাল্টে যায়নি। পাল্টে যায়নি এজন্য যে, যে-জন্য ও যাদের জন্য যুদ্ধটি  হয়েছিল এবং যারা যুদ্ধটি লড়েছিল তাদেরকে তথাকথিত বিপ্লবী নীতিনির্ধারক ক্ষমতাসীনরা ভুলে গিয়েছিলেন। তাদের ‘মনের জানালা’য় গ্রাম ছিল না, জনগণ ছিল না।  এই বিস্মরণের ফলে বিপ্লবের চরিতার্থতাকে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া যায়নি, বিপরীতে বিপ্লবের চরিতার্থতাকে স্বার্থান্বেষীরা চেটেপুটে খেয়ে নিয়েছে, এমনকি বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করতে দ্বিধা করেনি। জানা কথা, উদীচী বিপ্লব বিপ্লব করে চিলচিৎকার পাড়লেই বিপ্লব হয়ে যাবে না। বিপ্লব হতে গেলে যাদের জন্য বিপ্লব করা বিপ্লবী প্রক্রিয়ার সঙ্গে সেই সাধারণ মানুষজনের সম্পৃক্ততা চাই, বিপ্লবী প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতার বাইরে তাদের অবস্থান নির্দিষ্ট হয়ে থাকলে উদীচী কেন কোনও সামাজিক-রাজনীতিক শক্তির পক্ষেই বিপ্লব করা সম্ভব নয়, তার নেতৃত্বে যদি স্বয়ং লেনিন কিংবা মাও সেতুংও থাকেন। বিপ্লব সংঘটনের জন্য আগে চাই সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রস্তুতি, রাজনীতিক পরিপক্কতা, পায়ের তলের মাটির ভিত আরও শক্ত হওয়া চাই। বিপ্লবের পেছনে যে সাংস্কৃতিক শক্তি থাকে সে সাংস্কৃতিক উৎস থেকেও মাঝে মাঝে শক্তি চয়ন করে আনতে হয়, বিপ্লবের প্রস্তুতিকে আরও পরিপূর্ণ করার অভিপ্রায়ে ‘মনের জানালা ধরে উকি’ দিতে হয়, হতে হয় অতীতচারী ঘরকলজিক (নস্টালজিক)। বিপ্লবোত্তর রাশিয়ায় একটি স্কুল পরিদর্শনে গেলে স্কুলের ছাত্ররা যখন লেনিনকে বলে তারা বিপ্লবী কবি মায়াকোভক্সিকে পড়ে তখন তিনি ছাত্রদেরকে বলেছিলেন যে, মায়াকোভক্সির চেয়ে পুশকিন আরও উত্তম। পুশকিনকেও পড়তে হবে। এই সত্যকে অস্বীকার করার কোনও যুক্তি নেই যে, উদীচীকেও প্রয়োজনে পিছন ফিরে তাকাতে হবে, যেতে হবে রবীন্দ্র-নজরুল-বঙ্কিমের কাছে, সামনের কদমটি আরও ঠিকভাবে ফেলাটি নিশ্চিত করার জন্যে পেছনে তাকাতে হবে। আসরের শুরুতেই ‘কী অপরূপ রূপে মা তোমায় হেরিনু পল্লীজননী …।’ গানটি সমবেত কণ্ঠে যখন ছড়িয়ে পড়লো শ্রোতাটইটম্বুর মিলনায়তনের নীরবতায়, তখন মনে হলো, উদীচী তো ‘যে-জন্য ও যাদের জন্য যুদ্ধটি হয়েছিল এবং যারা যুদ্ধটি লড়েছিল’ তাদের কাছেই ফিরে যাচ্ছে, ফিরে যাচ্ছে পল্লীজননীর কাছে, যেখান থেকে তাকে শুরু করতে হবে সেখানে। মনে রাখতে হবে, বিপ্লবের প্রয়োজনেই সেখানে বার বার ফিরে যেতে হবে। এই ফিরে যাওয়াও, যাকে বলে নিছক ঘরকলজিক (নস্টালজিক) নয়, বস্তুতপক্ষেই একটি বৈপ্লবিক প্রয়োজন।  
কিন্তু মনে রাখতে হবে, সাংস্কৃতিক সংগঠন হিসেবে উদীচীর শুরুর পর তার অগ্রযাত্রার  একটা দীর্ঘ অতীত ও ঐতিহ্য আছে। আর সে সত্যকে মেনে নিলে ‘উদীচীর শুরু’ আর ‘সুনাগঞ্জের উদীচীর শুরু’ দুইটি পৃথক প্রপঞ্চের সূত্রপাত করে এবং সঙ্গত কারণেই আমাদের বিবেচনাকে অন্যভাবে আলোড়িত করে এবং মেনে নিতে হয় যে, সুনামগঞ্জের উদীচীকে পরিপক্ক হয়ে উঠার কারণেই সামনে এক কদম রাখার আগে দুইবার পেছনে কদম ফেলতে হবে। প্রত্যন্ত গ্রামের মুক্তময়দানে ভাসান পানির আন্দোলনের উপর ‘ভাসান পানির কথা’ নাট্যাভিনয় করে এসে শিল্পকলা একাডেমিতে গণচেতনাবদলের কোনও সাংস্কৃতিক কর্ম (যেমন ‘সুমতির মুখে সেফটিপিন’-এর মতো কোনও নাটক বা অন্য কোনও অনুষ্ঠান) মঞ্চায়ন চালিয়েই যেতে হবে কিংবা মাঝে মাঝেই  ‘আলোকের ঝর্ণা ধারায়’ ¯œাত হয়ে গেয়ে উঠতে হবে ‘আমায় যে কে পিছু ডাকে …’।  এই পিছু ডাক শুনার অর্থ পিছু হটা নয়, নিজস্ব ঐতিহ্য থেকে আগে বাড়ার শক্তি সঞ্চয় করা। একটাকে ছেড়ে অন্যটাকে ধরা নয়, দু’টিকেই একসঙ্গে চাই। মনে রাখতে হবে, অতীতকে ছেড়ে বর্তমান কিংবা ভবিষ্যৎ কেনওটাই হয় না। তাই বলে ঘরকলজিকতা (নস্টালজিকতা) নিয়ে পড়ে থেকে ভবিষ্যতের স্বাপ্নিকতাকে কিংবা অধিকতর স্পষ্ট করে বললে বলতে হয় নতুন সমাজ বিনির্মাণের স্বপ্নকে পরিহার করাও ক্ষমার অযোগ্য নির্বুদ্ধিতার নামান্তর। তাছাড়া ‘চারদিকে প্রযুক্তিলব্ধ কতরকমের প্রলোভেন, অপসংস্কৃতির নোংরা হাতছানি, সহজ প্রাপ্তিযোগের কত উদাহরণ’ এইসব থেকেও উদীচীকে বেঁচে থাকতে হবে এবং বাঁচিয়ে রাখতে হবে চারপাশের মানবিক পরিবেশকে। সেটা চটজলদি কীছু একটা হয়ে যাবার বিষয়ও তো নয়ই, এমনকি নয় খুব একটা সহজ কীছু, এর একমাত্র প্রতিষেধক অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে অবিরত সংগ্রাম, যে সংগ্রামের কোনও বিকল্প নেই। সুতরাং কেউ যদি বলেন, যেমন কেউ  কেউ বলছেন, ‘আজকের অনুষ্ঠান উদীচী ঘরানার সঙ্গে যায় না বা খাপ খায় না, বরং এটাকে বলা যায় একধরনের সাংস্কৃতিক বৃত্তাবদ্ধতা বা বন্দিত্ব, যা উদীচীর প্রতিষ্ঠিত ঘরানার আদর্শবিরোধী।’ এইরূপ ভাবনা মোটেও ঠিক নয়।  

  • [১]