নয় মাসের যুদ্ধে পাকিস্তানিরা বাংলাদেশকে একটি জনপদের ধ্বংসাবশেষে পরিণত করেছিল, ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছিল দেশের অর্থনৈতিক ভিত। ১৯৭২ সালে দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি শুরু হয়েছিল মাইনাস ১৩ দশমিক ৯৭ শতাংশ দিয়ে। বছর যেতেই তা প্লাসে চলে এসে দাঁড়ায় ৩ দশমিক ৩৩ শতাংশে। আর বিজয়ের ৪৫ বছর পরে সেই প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ১১ শতাংশে। অর্থনীতি ও শিল্পে বাংলাদেশের অর্জনের ক্ষেত্রে যেমন জিডিপি প্রবৃদ্ধি বেড়েছে কয়েকগুণ, তেমনি বেড়েছে জিডিপির আকারও, যা বিশ্বের অনেক উন্নত দেশের চেয়ে বেশি। শিল্প ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য বিকাশ ঘটেছে। তৈরি পোশাক রফতানিতে বাংলাদেশের অবস্থান এখন দ্বিতীয়। একটা সময় ছিল যখন সাড়ে সাত কোটি মানুষের দেশেও খাদ্য সঙ্কট ছিল। এখন ১৬ কোটির অধিক জনসংখ্যার বাংলাদেশ শুধু খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনই করেনি, খাদ্য রফতানিও করছে। মাথাপিছু আয় বেড়েছে, দারিদ্র্যের হার কমেছে।
শিক্ষ খাতে বাংলাদেশের অর্জন আজ বিশ্বের কাছে রোল মডেল হয়েছে। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে দেশের ৮৫ ভাগ নারীই শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত ছিল। এখন নারীদের প্রায় ৫৭ ভাগই শিক্ষিত। দেশে নারীর ক্ষমতায়ন বেড়েছে। স্বাধীনতার পর দেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ছিল মাত্র ৩৮ হাজার। এখন তা এক লাখ ছাড়িয়ে গেছে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশাপাশি বেড়েছে বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ও। মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশে মাত্র ৪টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ছিল, এখন আছে ৩৮টি। তখন দেশে কোনো প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় ছিল না, এখন আছে ৯৬টি।
সরকার সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা এখনও নিশ্চিত করতে না পারলেও এই সেবা গ্রাম পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। সরকারি হাসপাতালের সংখ্যা অনেক বেড়েছে, বেড়েছে বিশেষায়িত হাসপাতালের সংখ্যাও। গড়ে উঠেছে অনেক প্রাইভেট ক্লিনিক ও হাসপাতাল। এখন দেশে উৎপাদিত ওষুধ দিয়ে নিজেদের চাহিদার ৯৮ ভাগ শুধু মিটছেই না, বিদেশে রফতানিও হচ্ছে। মাতৃমৃত্যুর হার কমেছে, কমেছে শিশুমৃত্যুর হারও। বাংলাদেশকে পোলিওমুক্ত করা হয়েছে।
অবকাঠামো এবং বাসস্থান উন্নয়নে যথেষ্ট অগ্রগতি হয়েছে। সড়ক যোগাযোগ এখন গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃৃত। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু হচ্ছে। তৈরি করা হয়েছে অনেকগুলো বড় সেতু। ফলে বাংলাদেশের প্রায় পুরোটাই সড়কপথে যোগাযোগ নেটওয়ার্কের মধ্যে চলে এসেছে। আবাসন খাতে উন্নতি হয়েছে। মানুষের বাসস্থানের অভাব দূর করতে সরকারিভাবে নানা প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। আবাসনে প্রাইভেট খাত এখন বেশ বড়। আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসহ দেশের গ্রামগুলো দিন দিন শহরে পরিণত হচ্ছে।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশের অগ্রগতি আস্থার সঙ্গেই উল্লেখ করার মতো। তবে সাফল্যের সবকিছু আমাদের হাতের মুঠোয়, এ কথা বলার অবকাশ নেই। যেতে হবে আরও দীর্ঘপথ। উন্নয়নের এ ধারা অব্যাহত থাকুক এবং আরও গতিশীল হোক, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।