- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

উপজেলা লকডাউন চান ইউএনও

বিশেষ প্রতিনিধি
প্রবাসী অধ্যুষিত জগন্নাথপুর উপজেলার স্বাস্থ্য কর্মকর্তাসহ প্রশাসনের সর্বস্তরের কর্মকর্তাদের মধ্যে উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে। গত পহেলা মার্চ থেকে শনিবার পর্যন্ত এই উপজেলায় প্রায় ৬০০ প্রবাসী দেশে ফিরেছেন। এদের মধ্যে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের প্রবাসীরা রয়েছেন। রোববার এই উপজেলার পাটলী ইউনিয়নের সাতহাল গ্রামের ষাটার্ধো এক যুক্তরাজ্য ফেরৎ মহিলার মৃত্যুর ঘটনায় এই উৎকণ্ঠা আরো বেড়ে গেছে। এই মহিলা গত চার মার্চ দেশে ফিরেছিলেন এবং গত বৃহস্পতিবার জ¦র, সর্দি ও কাশি নিয়ে সিলেটের শহীদ শামছুদ্দিন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। রোববার ভোরে ওখানেই মৃত্যু ঘটে তার। এই মৃত্যু আতঙ্খ বাড়িয়েছে সকলের মাঝেই। রোববার বিকাল ৩ টায় জগন্নাথপুর উপজেলার সহকারী কমিশনার ভূমি নিহত ওই প্রবাসীর বাড়ীতে গিয়ে পরিবারের অন্য সদস্যদের ১৪ দিন হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকার নির্দেশ দিয়ে এসেছেন। এছাড়া উপজেলার দিঘীরপাড়ে গিয়ে যুক্তরাজ্য থেকে দেশে ফেরা তিন ভাইকে হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকার কঠোর নির্দেশ দিয়ে এসেছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহফুজুল আলম মাসুম। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জানালেন, তিনি মনে করেন ‘জগন্নাথপুর লকডাউন’ হওয়া প্রয়োজন।
সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর প্রবাসী অধ্যুষিত উপজেলা হিসাবে পরিচিত। এই উপজেলার ৮ ইউনিয়নের ৭ টিতেই বিগত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে যুক্তরাজ্য প্রবাসী প্রার্থী জয়ী হয়েছিলেন। জগন্নাথপুর পৌরসভায় সদ্য প্রয়াত মেয়র আব্দুল মনাফও ছিলেন যুক্তরাজ্য প্রবাসী। এখানকার জাতীয় কিংবা স্থানীয় নির্বাচনে আগে থেকেই পরিকল্পনা করে প্রবাসীরা এসে প্রার্থী হবার চেষ্টা করেন। আবার প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণায়ও আসেন শত শত প্রবাসী। ২৯ মার্চ ছিল জগন্নাথপুর পৌরসভার নির্বাচন। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বি ৪ প্রার্থীর ৩ জনই ছিলেন যুক্তরাজ্য প্রবাসী। করোনা ভাইরাসের কারণে এবার অন্য সময়ের চেয়ে কম প্রবাসী প্রচারণার জন্য আসলেও, অসংখ্য প্রবাসী এসে প্রচারণায় যুক্ত হয়েছিলেন। শনিবার নির্বাচন স্থগিত হলেও এরা রয়েছেন যার যার এলাকায়। রোববার সকালে এক প্রবাসী নারী’র মৃত্যু এবং অসংখ্য প্রবাসী’র অবাধ বিচরণ ভাবিয়ে তুলেছে এখানকার বাসিন্দাদের।
জগন্নাথপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্মসম্পাদক লুৎফুর রহমান বলেন, আমরা চিন্তিত উদ্বিগ্ন, কয়েকমাস আগে আমি দেশে ফিরেছি। আমি যুক্তরাজ্য প্রবাসী হলেও যাওয়া-আসার মধ্যে থাকি। আমার মনে হচ্ছে প্রবাস থেকে আসা আমাদের স্বজনদের অনেকেই হোম কোয়ারেন্টাইন মানছেন না। নিজের স্বজনদের জন্যই তো দেশে আসা, নিজে সচেতন থেকে স্বজনদের রক্ষা
করতে হবে।
জগন্নাথপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তা মধূসুদন ধর জানালেন, গত পহেলা মার্চ থেকে ৬০০ জন প্রবাসী দেশে ফিরেছেন। এরমধ্যে ৮৫ জন হোম কোয়ারেন্টাইনে আছেন। অন্যদের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার জন্য নানাভাবে চেষ্টা করা হচ্ছে। বাড়ী বাড়ী স্বাস্থ্য পরিদর্শকদের পাঠিয়ে বলা হচ্ছে, তারা যেন স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলেন।
জগন্নাথপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহফুজুল আলম মাসুম ফোনে জানালেন, যুক্তরাজ্য ফেরৎ যে প্রবাসী রোববার ভোরে মারা গেছেন। তার রক্ত পরীক্ষা করণের জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। নিকট আত্মীয়দের কোয়ারেন্টাইনে রাখার জন্য বলা হয়েছে। জগন্নাথপুরকে লকডাউন করার পক্ষে নিজের মতামতের কথা জানিয়ে এই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফোনে বললেন, মানুষের চলাফেরা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সিভিল প্রশাসনকে সহযোগিতার জন্য অন্যান্য বাহিনীও নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন।
তিনি জানালেন, প্রত্যেক ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও ইউপি সদস্যদের নিয়ে ৫ সদস্যের কমিটি করা হয়েছে। কমিটির লোকজনকে প্রবাসীদের বাড়ী বাড়ী পাঠানো হচ্ছে হোম কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করার জন্য।
এদিকে, রবিবার দুপুরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহফুজুল আলম মাসুম ও উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. ইয়াসির আরাফাত প্রবাসীদের বাড়ী বাড়ী গিয়ে হোম কোয়ারেন্টাইনে ১৪ দিন থাকার জন্য কঠোর নির্দেশনা দিয়ে বলেছেন, এই নির্দেশনা অমান্য করলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সিলেটের শহীদ শামছুদ্দিন হাসপাতালে নিহত প্রবাসী মহিলার বাড়ীতে শিরনী বিতরণ ও দোয়া মাহ্ফিলের আয়োজন করা হয়েছিল। এটিও বন্ধ করে দিয়ে আসেন প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মীরা। ওই বাড়ী’র লোকজনকে ১৪ দিন হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকার নির্দেশনা দিয়েছেন উপজেলা সহকারী কমিশনার ভূমি।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহফুজুল আলম মাসুম একই সময়ে উপজেলার দিঘীরপাড় গ্রামে গিয়ে যুক্তরাজ্য ফেরৎ ৩ ভাইকে ১৪ দিনের হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকার নির্দেশ দেন। নির্দেশ অমান্য করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানিয়ে আসেন।
সুনামগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. শামছুদ্দিন জানালেন, জগন্নাথপুরকে লকডাউন করার ব্যক্তিগত মতামতের কথা ওখানকার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাকেও জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, এই বিষয়টি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের বিষয়। লকডাউন করলে, এর সঙ্গে অনেকগুলো বিষয় যুক্ত হবে।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ বললেন, জগন্নাথপুরের সামগ্রীক পরিস্থিতি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। তাঁরা যে সিদ্ধান্ত দেবেন সেভাবেই ব্যবস্থা নেয়া হবে।

  • [১]