- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

উৎসবই নয় প্রত্যয়েরও

সুখেন্দু সেন
শত সহ¯্র বছরের বাংলা বর্ষ অতিক্রমণের সহ¯্র সূর্যোদয়ের পর বর্ষবরণ বিচিত্র অনুসঙ্গে উৎসবে রূপান্তর বাঙালি সংস্কৃতির সাম্প্রতিক সংযোজন। ভূবনায়নের খোলা দরজায় বাইরের কোন সংস্কৃতির অনুকরণ বা আগ্রাসন নয়। এ উৎসব এদেশেরই মাটির রসে-গন্ধে সঞ্জাত। একান্ত নিজস্ব অনুসঙ্গে বৈচিত্রময়। পার্শ্ববর্তী কলকাতার বাঙালিরা বাংলা নববর্ষ পালন করে থাকলেও উৎসবের এমন রূপ-রস-গন্ধ-বর্ণের স্পর্শ বর্জিতই থেকে গেছে। এক সময় কলকাতা ছিল বঙ্গ সংস্কৃতির কেন্দ্র। ৭১’ এর স্বাধীনতা পরবর্তী ঢাকা কেবল কলকাতার বিকল্প হিসেবেই আত্মপ্রকাশ করেনি, মুক্ত স্বদেশে বাঙালির অনিরুদ্ধ আবেগ সংস্কৃতির বিভিন্ন শাখায় সৃষ্টিশীল সম্ভাবনাকে সম্ভবে রূপান্তরিত করে যথেষ্ট পুষ্টি ঘটাতেও সক্ষম হয়েছে। এমনকি প্রতিনিধিত্বশীল পর্যায়েও নিয়ে গেছে। ঢাকায় সৃষ্ট একুশে ফেব্রুয়ারির আন্তর্জাতিকীকরণ ঘটেছে এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃত হয়ে স্ব-গৌরবে দেশে দেশে উদযাপিত হচ্ছে। একই ভাবে বর্ষবরণে সংযোজিত বিভিন্ন অনুসঙ্গ এখন সাগর পাড়ি দিয়ে আন্তর্জাতিকতার পথে প্রবহমান।
এ উৎসব লোকজ ঐতিহ্যর নগরায়ণ ঘটিয়েছে। কর্পোরেট সংশ্লিষ্টতা দিয়েছে নতুনমাত্রা। এনেছে বৈচিত্র। জাতি-ধর্ম-বর্ণ-পেশা, গ্রামীণ-নাগরিক, লোকজ ও আধুনিক চেতনার অপূর্ব সমন্বয়ের সার্বজনীনতার মাঝেই কেবল পহেলা বৈশাকের স্বার্থকতা নয়, সেই সাথে অর্থনৈতিক ও গ্রামীণ শিল্পবিকাশের সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমেও পেয়েছে অন্য এক মাত্রা।
এক সময় বাংলা নববর্ষের আয়োজন বড় মহাজনদের গদিতে হালখাতা অনুষ্ঠান ও মিষ্টিমুখের মধ্যেই সীমাবদ্ধ  
ছিল। বাল্যস্মৃতি যা যোগান দিচ্ছে, তাতে নববর্ষের শুভেচ্ছা বিনিময়, আত্মীয় স্বজনদের কাছে পত্র লেখন, গুরুজনদের আশীর্বাদ প্রার্থনা এবং আচার্য্য ঠাকুরের মুখে নব পঞ্জিকায় বছরের আগাম শুভাশুভের শ্রবণপূণ্য ব্যতিত আর কোন উপলক্ষের সন্ধান মিলছে না। বছরের প্রথম দিন ভাল কাটলে সারাবছর ভালো যাবে এমন বিশ্বাসে বুদ হয়ে ভালো থাকার কষ্ট সাধনা এবং মাছ-মাংস সহ ভালো খাবার দাবার আয়োজনের প্রতিই ছিল বেশি আকর্ষণ।
সে দিন আর নেই। বর্ষবরণে যুক্ত হয়েছে নতুন মাত্রা। পেয়েছে ব্যাপকতা। সেই সাথে উৎসব প্রিয় বাঙালির আবেগ কখনও ঐতিহ্য ছাড়িয়ে হুজুগ আক্রান্ত হয়ে পড়ে। বর্ষবরণের সাথে পান্তা-ইলিশের ন্যূনতম কোন সম্পর্ক না থাকলেও উড়ে এসে জুড়ে বসে সেই পান্তা ইলিশ সার্বজনীনতার চরিত্রকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে। ইলিশ ধরার নিষিদ্ধ মৌসুমে এ ভ্রান্তি বিলাস পরিত্যাগ করাই শ্রেয়।
বাংলাসনের সাথে বাঙালির সম্পর্ক সুপ্রাচীন এবং গভীরে প্রোথিত। কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের, কৃষিপ্রধান সংস্কৃতি ও লোকাচারের সাথে বাংলা সন ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। জমিতে চাষ দেয়া, বীজ বোনা, ফসল তোলা বাংলা মাস এবং তারিখ অনুযায়ী হয়ে থাকে। গ্রামীণ সামাজিক ক্রিয়া কর্ম, জন্ম-মৃত্যুর দিন তারিখ, বিয়ে এবং অন্যান্য শুভ অনুষ্ঠান বাংলা তারিখ নির্ভর। দলিল-দস্তাবেজ, ভূ-সম্পত্তি হস্তান্তর, খাজনা প্রদানে বাংলা তারিখ ব্যবহার হয়ে থাকে। গ্রামীণ জীবনাচারের সাথে বাংলাসনের সম্পর্ক ব্যাপক হলেও পহেলা বৈশাখ বা বর্ষবরণের উৎসব নাগরিক আগ্রহ থেকে সৃষ্ট। তাই এ উৎসবের আগ্রহ নাগরিক জীবন বা শহরাঞ্চলে যতটুকু গ্রামীণ জীবনে ততটুকু নয়। ভৌগলিক বৈচিত্র্যের কারণে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে লোকাচার ও জীবনধারাও ভিন্ন। ভাটি এলাকার বিস্তীর্ণ হাওর অঞ্চলের এক ফসল নির্ভর জীবনে নববর্ষ উৎসবের আনন্দ নিয়ে আসে না, আসে ফসল তোলার সংগ্রামী আহবান নিয়ে। প্রকৃতির খামখেয়ালির বিরুদ্ধে লড়াই করে হাওর পাড়ের মানুষ বেঁচে থাকে। উৎসবের আমেজ তাদের তেমন প্রভাবিত করে না। বৈশাখের রুদ্ররূপকে বরণ করে নিতেই তারা অভ্যস্ত। কখনও তাপদাহে পুড়ে, ঝড়বৃষ্টি উপেক্ষা করে হাওরপাড়ের মানুষ মেতে উঠে ফসল তোলার অন্য এক উৎসবে। রঙয়ে ভরা বৈশাখের রূপ-রঙ দেখার ফুসরত তাদের হয় না। ধানকাটা, মাড়াই, শুকানো, গোলায় তোলার এক মহাযজ্ঞ। প্রকৃতি সদয় হলে গোলায় ফসল তুলে তৃপ্তিতে ভরে কৃষকের মন। এটিই বৈশাখী আনন্দ। আর যখন অতিবৃষ্টি-শিলাবৃষ্টি অথবা অকালবন্যা-পাহাড়ি ঢলে বাঁধ ভেঙে তলিয়ে যায় সোনার ফসল, তখন কৃষকের স্বপ্নসাধও তলিয়ে যায় একই সঙ্গে। কৃষকের চোখে তখন বৈশাখের অন্য রঙ। সেটি Ñ অন্ধকার।
কয়েক মাসের হাড়ভাঙা খাটুনি এবং সন্তান বাৎসল্যে পরিচর্যা শেষে অন্তিম মুহূর্তে যখন চোখের সামনে নিরুপায় কৃষক দেখে তার সর্বস্ব তলিয়ে যেতে, শেষ সম্বল নিয়ে শেষ সংগ্রামেও পরাজিত হয়ে রক্ষা করতে পারে না ফসল, তখন তার বুকে কেবল সন্তান হারানোর হাহাকার অবশিষ্ট থাকে। এবছরও এই মুহূর্তে যখন হাওরপাড়ের গ্রামগুলি ফসল তোলার উৎসবে মুখরিত হওয়ার কথা সেখানে এখন শ্মশানের নিরবতা। শুধু প্রকৃতির খামখেয়ালিপনাই নয় হাওররক্ষায় নিয়োজিতদের লোভ লালসার কাছেও পরাজিত হয় প্রকৃতির নিরব যোদ্ধা কৃষক। নূতন বছর এলো বুঝি অভিশাপ হয়ে।
বাঙালির সকল সার্বজনীন উৎসবই শুধু মাত্র উৎসবে সীমাবদ্ধ থাকে না। অনেক সময় তা হয়ে উঠে প্রতিবাদ-প্রতিরোধ আর সংকল্পের ভিত্তিভূমি। বর্ষবরণ উৎসবও প্রতিক্রিয়াশীলদের শত বাধার মুখেও রূপান্তরিত হয়েছে প্রতিবাদী প্রত্যয়ে। এবারের পহেলা বৈশাখ হোক লোভ-লালসা-দুর্নীতির বিরুদ্ধে কৃষকের সংগ্রামী প্রত্যয়ে দীপ্ত। ফসলরক্ষার বাঁধ নির্মাণে দুর্নীতি রোধ, হাওর রক্ষার স্থায়ী সমাধানের দাবি সংহত হোক এই বৈশাখে।   

  • [১]