- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

উড়ারকান্দার যুদ্ধ

বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রভাত রঞ্জন তালুকদার
গ্রামের নাম উড়ারকান্দা। পাকিস্তানি সেনাদের আক্রমণের ভয়ে সবাই চলে গেছে ভারতীয় শরণার্থী ক্যাম্পে। তখন অক্টোবর মাস। উড়ারকান্দায় আমি এক সেকশন মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে অবস্থান করছি। গ্রামের ঠিক দক্ষিণ দিকের শেষ সীমানায় আমরা বাংকার তৈরি করলাম। সামনেই ছিলো হাওর। পানি যেন থৈ থৈ করছে। গ্রামের পেছন দিকে বহমান চলতি নদী। গ্রামের বাম দিকে কিছুটা পিছনে মুসলিমপুরে এক সেকশন মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে অবস্থান করছেন আছদ্দর ভাই। ডানদিকে ভাদেরটেকে আরেকটি মুত্তিযোদ্ধাদের বাংকার। সুনামগঞ্জ শহর থেকে পাকিস্তানি সেনারা অক্ষয়নগর হয়ে নদী পথেই আক্রমণ করে। এলএমজির গুলিও প্রায় শেষ। গুলি আনার জন্য কাউকে হেডকোয়ার্টারে পাঠাবো ভাবছিলাম। ঠিক এই সময় শুকুর আলী নামে উড়ারকান্দার এক লোক আমার জন্য একবাক্স এলএমজির গুলি নিয়ে আসে। তখন দুপুর প্রায় তিনটা। আকাশে ঝক্ঝকে রোদ। চারদিকে কেমন যেন নিঃস্তব্দতা বিরাজ করছে। বিধু নামে একজন মুক্তিযোদ্ধাকে গ্রামের উত্তর মাথায় অবস্থান করতে নির্দেশ দেই। কারণ এখান থেকে ব্যাক করার এটাই একমাত্র রাস্তা। হঠাৎ একটি মর্টার গ্রামের উত্তর মাথায় আঘাত হানে। আমরাও তাড়াতাড়ি প্রস্তুতি গ্রহণ করলাম। কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধাকে গ্রামের উত্তর দিকে পাঠিয়ে দিলাম এবং বাকি কয়েকজন বাংকারে অবস্থান গ্রহণ করি। প্রচন্ড গুলাগুলি শুরু হয়েছে। ঠিক এই সময় আমাদের লঙ্গরখানায় একটি মর্টার আঘাত হানলো। মর্টারসেলের আঘাতে লঙ্গরখানার ছনের ঘরে আগুন ধরে গেল। হঠাৎ আমাদের বাংকারের সামনে থেকে প্রায় ৩০০ গজ দূরে পাকিস্তানি সেনাদের বহনকারী একটি স্পিডবোট গুলি করতে করতে আমাদের দিকে এগিয়ে আসতে থাকে। আমি বিলম্ব না করে স্পিডবোটটির দিকে ব্রাশফায়ার করতে থাকলাম। ব্রাশফায়ারের ফলে স্পিডবোটটি ছিটকে পড়ে যায় এবং স্পিডবোটে থাকা সকল পাকিস্তানি সেনাদের সলিল সমাধি হয়। তারপর পাকিস্তানি সেনারা গানবোট থেকে মর্টার শেলিং ও গুলি করতে লাগলো। আমি দেখলাম গানবোটটি ধির গতিতে এগিয়ে আসছে। গানবোটটিকে কোনভবেই যেন প্রতিরোধ করতে পারছিলাম না। মেশিনগানের গুলি যেন গানবোটের গায়ে লেগে ফিরে আসছিলো বার বার। একসময় গানবোটটি মুসলিমপুরের দিকে অবস্থান নেয় এবং মুসলিমপুর দখল করে নেয়। পাকিস্তানি সেনারা কিছু সময়ের মধ্যে ভাদেরটেকও দখল করে নেয়। ভাদেরটেক দখল যুদ্ধে আমাদের কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। একসময় ভাদেরটেক ও মুসলিমপুরের বাংকার থেকে আমাদের দিকে অনবরত গুলি করতে করতে আসতে থাকে পাকিস্তানি সেনা দল। মুক্তিযোদ্ধাদের দুটি বাংকারই পাকিস্তানি সেনারা দখল করে নেয়। বাকি ছিলো শুধু আমাদের বাংকার। আমরা চারদিক থেকে ঘেরাওয়ের মধ্যে পড়ে গেলাম। বাংকারের তিনদিক থেকে আমাদের বাংকার দখল করে নেওয়ার জন্য পাকিস্তানি সেনারা প্রচন্ড আক্রমণ শুরু করে। আমরা কয়েক ভাগে বিভক্ত হয়ে তিন দিকেই প্রতিরোধ গড়ে তোললাম। কিন্তু বিধি বাম। আমাদের সকলের গুলিও প্রায় শেষ হয়ে আসছিলো। এলএমজির ব্যারেলে হাত দেয়ার কোন উপায় ছিলো না। কারণ দুটি ব্যারেলই আগুনের মতো গরম হয়ে পড়েছিলো। আমি প্রত্যেককে তাঁদের অস্ত্রে দুটি করে গুলি রাখতে বললাম। সবাইকে বললাম, পাকিস্তানি সেনাদের হাতে ধরা পড়ার চেয়ে আত্মহত্যা করা অনেক ভাল। তখন আমার কাছে একটি এসএমজি রেখে সবাইকে ব্যাক করতে নির্দেশ দিলাম। তখন সন্ধ্যা প্রায় সমাগত। আমরা কোন মতে গ্রামের উত্তর মাথায় পৌঁছলাম। কিন্তু সেখানে অপেক্ষা করছিলো আরেক বিপদ। প্রায় ৪০০ গজ দীর্ঘ একটি বাঁধ পাড় হতে হবে। সকলকে একজন একজন করে সতর্কতার সহিত ক্রলিং করে বাঁধ পার হওয়ার নির্দেশ দিয়ে আমি একটি এসএলআর নিয়ে কভারিং ফায়ার করতে লাগলাম। প্রায় এক ঘন্টা অতিবাহিত হওয়ার পর আমরা সবাই বাঁধটি অতিক্রম করে পাশের একটি আখখেতে আশ্রয় নেই। ঘন অন্ধকার না হওয়া পর্যন্ত আমরা এই আখক্ষেতেই অবস্থান করি। এভাবেই নিজের জীবনকে উপেক্ষা করে পাকিস্তানি সেনাদের হাত থেকে আমার সেকশনে থাকা সকল মুক্তিযোদ্ধাদের নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করি। আর এদিকে মাইলাম ও বালাট ক্যাম্পে সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে যে, পাকিস্তানি সেনারা আমাদেরকে ধরে নিয়ে গেছে। অন্যদিকে রাতে গভীর জঙ্গলে অবস্থান করে পাকিস্তানিদের প্রতিরোধের জন্য আবার প্রস্তুতি গ্রহণ করি।

  • [১]