এনামুল হক এনি, ধর্মপাশা
হাওরাঞ্চলে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক পরিবার পরিজন নিয়ে গ্রাম ছাড়া শুরু করেছেন। অনেকেই আবার এলাকাতেই বিকল্প কর্মসংস্থান খোঁজে বেড়াচ্ছেন। কিন্তু এলাকাতে বিকল্প কোনো কর্মসংস্থান না পেয়ে হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন কেউ কেউ। ইতোমধ্যে ওএমএস’র মাধ্যমে খোলাবাজারে চাল-আটা বিক্রি শুরু হলেও বরাদ্দ কম থাকায় ক্ষতিগ্রস্ত সকলেই এই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। যারা ধার দেনা করে চাষাবাদ করেছিলেন তারা সব হারিয়ে গ্রামের ফড়িয়া আর এনজিওদের কিস্তির চিন্তায় পাগলপ্রায়।
হাওরাঞ্চলের কৃষকসহ সকলেরই যে সময়ে ধান তোলার কাজে ব্যস্ত সময় কাটানোর কথা সে সময়ে নিজের পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে, খাদ্য যোগাতে দিগি¦দিক হয়ে ছুটে বেড়াচ্ছেন। এখন আর কেউ ধার দেনা দিতে চাইছে না। পাশের ঘরে কেউ না খেয়ে থাকলেও খোঁজ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে না। যেন নিজে বাঁচলেই বাপের নাম।
যদিও হাওরে এখন পানি আর পানি তবুও এখনো মাছ ধরার উপযুক্ত মৌসুম আসেনি। যারা মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন তারা তাদের জাল মেরামতসহ মাছ ধরার সরঞ্জামাদি যোগাড় করতে পারেননি। বৈশাখে ধান ঘরে তোলার পর তা
বিক্রি করে মাছ ধরার সরঞ্জামাদি কেনার কথা ছিল। যেহেতু ফসল উঠেনি সেহেতু মাছ ধরার সরঞ্জামাদি কেনার মতো ক্ষমতা হারিয়েছেন অনেকেই। তবে পুরনো জাল মেরামত করার কাজ শুরু করেছেন কেউ কেউ।
ধর্মপাশা উপজেলার কাইঞ্জার হাওর সংলগ্ন কান্দাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা মো. জাহাঙ্গীর আলম গেল বছরের একটি পুরনো জাল মেরামতের কাজ ইতোমধ্যে শুরু করে দিয়েছেন। তার সাথে গ্রামের আরো নয়জন অংশীদার আছেন। তিনি জানালেন, মাছ ধরার কাজ শুরু হবে আরো মাস তিনেক পরে। নতুন করে জাল কেনার মতো সামর্থ নেই এবার তাদের। তাই পুরনো জাল মেরামত করা হচ্ছে। তবে জালের সাথে একটি নৌকা থাকা আবশ্যক।
তিনি জানালেন, জাল ও নৌকাসহ মাছ ধরার সকল সরঞ্জামাদি সংগ্রহ করতে তাদের লাখ দুয়েক টাকা লাগবে। এবার সেই টাকা যোগাড় করা বেশ কষ্টসাধ্য। এমনিতেই চাষাবাদ করতে গিয়ে অনেক টাকা ঋণ হয়েছে তাঁর। নতুন করে গ্রামের সুদখোরদের কাছ থেকে চড়া সুদে ধার নিচ্ছেন তিনি। এছাড়া বিকল্প কোনো ব্যবস্থা নেই তাঁর জন্য।
জাল মেরামত কাজের সাথে জড়িত একই গ্রামের মো. আলী হোসেন বলেন, ‘জমি জিরাত করছিলাম ভালাই কিন্তু পাইন্যে সব নিয়া গেছে। এহন আল্লাহ যেমনে রাহে হেমনেই থাহন লাগবো। সুদে টেহা আইন্যা জাল ঠিক করতাছি। সবাই মিল্যা নাও (নৌকা) কেমনে কিনাম সেই চিন্তায় আছি।’
এখানে উপস্থিত আরেকজন জেলে হৃদয় মিয়া বলেন, ‘ঋণের চাপে মাথা আর কাজ করেনা। আশা আর ব্র্যাক থাইক্যা ১লাখ বিশ হাজার টেহা ঋণ তুলছিলাম। ফসল তুইল্যা ভালা কইরা কিস্তি চালাইতাম। এহন যে কেমনে কিস্তি চালাই বুইঝ্যা হাইনা। কিস্তির লাইগ্যা বেশি চাপ দিলেতো এলাকা ছাড়ন লাগবো।’
বলরামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রমারঞ্জন সরকার জানালেন, বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির ফার্স্ট র্গাল (প্রথম ছাত্রী) মুক্তামণি তার বাবা মায়ের সাথে গ্রাম ছেড়ে ঢাকায় চলে যাবে। পরে ম্যানেজিং কমিটির লোকজনের সাথে কথা বলে মুক্তামণিকে গ্রামে রাখার ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু তার বাবা মা কাজের জন্য ঢাকায় চলে গেছে।
চন্দ্রসোনার থাল হাওর সংলগ্ন জয়শ্রী ইউনিয়নের বাঘাউছা গ্রামের আসমাউল ইসলামসহ ৩৫ জন ব্যক্তি ইতোমধ্যে উজানে যাওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছেন। তারা সবাই সিলেটে যাবেন কাজের উদ্দেশ্যে। কি কাজ করবেন জানতে চাইলে কেউ কোনো সদুত্তর দিতে পারেনি। আসামাউল জানালেন, সেখানে গিয়ে কাজের সন্ধান করবেন। যে কাজই কপালে জুটে সেই কাজই করবেন তারা।
মধ্যনগর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান প্রবীর বিজয় তালুকদার বলেন, ‘এখনই জরুরি ব্যবস্থা না নিয়ে হাওরাঞ্চলে চরম দুর্ভোগ দেখা দিবে। আমার ইউনিয়নের শত শত মানুষ কাজের জন্য এলাকা ছাড়ছেন। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে পরিচয়পত্র সংগ্রহ করার জন্য প্রতিদিন মানুষজন ভিড় করছে। খোলাবাজারে চাল প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। এর বরাদ্দ বাড়ানোর ব্যবস্থা করতে হবে।’
ব্র্যাকের ধর্মপাশা শাখার ব্যবস্থাপক ফররুখ আহমদ ও গ্রামীণ ব্যাংকের ধর্মপাশা শাখার ব্যবস্থাপক প্রণয় কুমার দাশ জানান, বিষয়টি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। তারা সদস্যদের কাছে মাঠ কর্মীদের পাঠাচ্ছেন। তবে কেউ যেন কিস্তি আদায়ের নামে কঠোরতা না দেখায় তা বলে দেওয়া হয়েছে।
ব্র্যাকের কর্মসূচি ব্যবস্থাপক (ক্ষুদ্রঋণ) বেলায়েত হোসেন বলেন, ‘আমরা দুর্গত অঞ্চলের শাখাগুলোকে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরি করে পাঠাতে বলেছি। তালিকা এলে ব্র্যাকের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির কাছে উপস্থাপন করবো।’
আশা’র পরিচালন বিভাগের প্রধান মো. ফয়জার রহমান বলেন, ‘হাওরের পরিস্থিতি সম্পর্কে তারা অবগত আছেন। সব দুর্গত অঞ্চলেই বলে দিয়েছেন যেন কিস্তি আদায়ের নামে কোনো জবরদস্তি না করা হয়। যেসব সদস্যের অল্প টাকা বাকি রয়েছে, তারা যদি ওই টাকা শোধ করে নতুন ঋণ নিতে চান, সেই ব্যবস্থা গ্রহণেরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. একিউএম মাহবুব বলেন, পরিবেশ বিপর্যয় এবং আকস্মিক দুর্যোগের কারণে হাওরাঞ্চলের মানুষের গ্রাম ছাড়ার ঘটনা নতুন নয়। হাওরের নিম্নবিত্তের মানুষ সব সময়ই বর্ষাকালে হাওর ডুবে যাওয়ার পর কাজের খোঁজে বাইরে যায়। তবে এবার অকাল বন্যার কারণে নিঃস্ব হয়ে গেছে ধনি-গরিব সবাই। তাই গ্রামছাড়া মানুষের সংখ্যা অনেক বাড়বে। বেশির ভাগই আসবে ঢাকার দিকে, কারণ এখানে গার্মেন্টে চাকরি পাওয়াটা অধিকতর সহজ। গত ১০ বছরের জনসংখ্যা পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ঢাকার উপকণ্ঠ কালিয়াকৈর এলাকায় জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার সবচেয়ে বেশি। এখানে বছরে ২১ দশমিক ২৯ শতাংশ হারে মানুষ বাড়ছে। এই এলাকায় গার্মেন্টসহ বিভিন্ন শিল্পকারখানা রয়েছে। তবে হাওরের মানুষ শুধু ঢাকায় নয়, যাবে অন্যান্য কৃষিপ্রধান এলাকায়ও। তাদের হাওরে রাখতে হলে বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে।
পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাসমির রেজা বলেন, বিকল্প কর্মসংস্থান হাওরের মানুষ নিজেরাই অনেকখানি করে নিতে পারবেন, যদি জলমহালগুলো ‘জাল যার জলমহাল তার’ এই নীতি উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। তবে হাওরের পানিতে মাছ পেতে অপেক্ষা করতে হবে আষাঢ় পর্যন্ত। এই কয়েক মাস মানুষকে বাঁচিয়ে রাখতে ভিজিডি, ভিজিএফ ও ন্যায্যমূল্যের মাধ্যমে দুর্গত এলাকার প্রত্যেক পরিবারের জন্য চাল বিতরণের ব্যবস্থা করতে হবে। খোলাবাজার থেকে দুর্গত অঞ্চলের সবাই যাতে ১০ টাকা কেজি চাল কিনতে পারে, সে ব্যবস্থা করতে হবে। কৃষি ঋণ মওকুফ, আগামী অর্থবছরে কৃষি ঋণের ব্যবস্থা করা, সার, বীজ ও অন্যান্য কৃষি উপকরণ বিনামূল্যে দেওয়ার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সর্বোপরি সবার আগে হাওরাঞ্চলকে দুর্গত এলাকা হিসেবে ঘোষণা করে বিশেষ খাদ্য নিরাপত্তার আওতায় আনতে হবে।
অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এমএ. মান্নান বলেন ‘জেলা প্রশাসনের সঙ্গে জেলার সব সংসদ সদস্যকে নিয়ে বৈঠক করেছি। হাওরে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া শুরু হয়েছে। যেন খাদ্যসংকট দেখা না দেয় সে জন্য এরই মধ্যে প্রত্যেক উপজেলায় প্রতিদিন ওএমএসের মাধ্যমে তিন টন আটা এবং তিন টন চাল দেওয়া হচ্ছে। এই চাল-আটা ন্যায্যমূল্যে বিক্রি শুরু করা হয়েছে। হাওরে মাছ ধরা শুরু হওয়ার আগের কয়েক মাস মানুষকে বাঁচিয়ে রাখতে ভিজিডি, ভিজিএফ ও ন্যায্যমূল্যের মাধ্যমে দুর্গত এলাকার প্রত্যেক পরিবারের জন্য চাল বিতরণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। আগামী অর্থবছরের কৃষিঋণের ব্যবস্থা করা, সার, বীজ ও অন্যান্য কৃষি উপকরণ বিনামূল্যে দেওয়া যায় কি-না সে পরিকল্পনা করা হচ্ছে। সর্বোপরি এনজিওগুলো যেন কিস্তি আদায়ের নামে মানুষকে দিশেহারা করে না তোলে এটা বলে দেওয়া হয়েছে।’