বিশেষ প্রতিনিধি
হাওরাঞ্চলের বেশিরভাগ কৃষক এবার জনপ্রিয় ধান বিআর ২৯ জাতের চাষাবাদ থেকে সরে এসেছেন। পানি নিস্কাশনে বিলম্ব হওয়ায় কৃষকরা এর পরিবর্তে বিআর ২৮ ধানের বীজ বপন করেছেন। বিআর ২৮ ধানের প্রতি কৃষকদের এই উৎসাহ মূলত গত বছর থেকেই শুরু হয়েছে। কারণ পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত মৌসুমে কৃষকরা বিআর ২৮ জাতের ধানই বেশি বপন করেছিলেন। তবে সে বছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণে ২৯ জাতের ধানও রোপণ করেন তারা। এবার ২৯ জাতের বীজ ব্যবহারের পরিমাণ আরও কমে এসেছে। বিআর ২৯’এর চেয়ে বিআর ২৮ ধান কমপক্ষে ২০ ধান আগে পাকা শুরু হয়। এজন্যই কেবল কৃষক নয়, হাওরের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা এবার সকলকেই বিআর ২৮ ধান চাষাবাদের জন্য উৎসাহিত করছেন। কৃষকরাও বলছেন,‘এইবার বছর লাইমলা, এর লাগি ২৮ ধান করমু’।
সুনামগঞ্জে গত বোরো মৌসুমে ২ লাখ ২৩ হাজার ৮২ হেক্টর জমির বেশিরভাগেই বিআর ২৮ ও ২৯ জাতের ধান চাষাবাদ হয়েছিল। বিএডিসি বীজ কেন্দ্র থেকে গত বোরো মৌসুমে বিআর ২৮ জাতের ধানের বীজ বিক্রি হয়েছিল ২৫১০ মে.টন এবং বিআর ২৯ জাতের ধানের বীজ বিক্রি হয়েছিল ২২৪২ মে.টন। বেসরকারি বিভিন্ন কোম্পানীর বীজও একই অনুপাতে বিক্রি হয়। এবার সরকার কৃষি পুনর্বাসন কর্মসূচির আওতায় জেলার ১৫৪ টি হাওরপাড়ের প্রায় ৩ লাখ কৃষককে ১৫শ’ মেট্রিক টন বীজ বিনামূল্যে দিয়ে সহায়তা করেছে। এই ১৫শ’ মেট্রিক টন বীজই বিআর ২৮ জাতের। এছাড়া বিএডিসি বীজ কেন্দ্র থেকে আরও প্রায় দুই হাজার মেট্রিক টন বিআর ২৮ জাতের বীজ বিক্রয় হয়েছে। বিআর ২৯ জাতের বীজ বিক্রয় হয়েছে ১৭৬০ মেট্রিক টন। কৃষকরা বলেছেন, অন্যান্য বছর কার্তিক মাসের ১৫ তারিখ বীজ বপন এবং অগ্রহায়ণের ১৫ তারিখ হাওরের জমিতে রোপণ শুরু হতো। এবার বেশিরভাগ হাওরেই পানি নামেনি এখনো। এই অবস্থায় ২৯ জাতের ধানের চাষাবাদ করলে ঝুঁকিতে পড়বেন কৃষকরা। এই ধান পাকতে ১৬০ থেকে ১৬৫ দিন সময় যেতে হয়। অন্যদিকে বিআর ২৮ জাতের ধান পাকে ১৪০ থেকে ১৪৫ দিনে। কৃষকরা মনে করছেন যেহেতু পানি নিস্কাশনে বিলম্বের কারণে এবার রোপণের কাজ করতে বিলম্ব হচ্ছে, সেহেতু ২৯ জাতের ধান করলে আগাম বন্যা বা বৃষ্টিপাত বেশি হলে জলাবদ্ধতার জন্য ফসল ডুবতে পারে।
তাহিরপুরের মহালিয়া হাওরপাড়ের মারালার কৃষক আব্দুর রাজ্জাক বললেন,‘এইবার বছর লাইমলা, এর লাগি ২৮ করমু’। জামালগঞ্জের হালির হাওর পাড়ের মাছুমপুরের কৃষক ফয়েজ উদ্দিন, ঝুনুপুরের কৃষক মুজিবুর রহমানও একই ধরনের মন্তব্য করে বললেন,‘এবার কেউ বেশি ধান পাবার আশায় ২৯ করলে আম-ছালা দুটোই যাবে।’
হালির হাওর ও মহালিয়া হাওরের দায়িত্বপ্রাপ্ত পাউবোর উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী রঞ্জন কুমার দাস বললেন,‘পানি বিলম্বে নামায়, হাওরে ফসল রক্ষা বাঁধের কাজও শুরু করতে বিলম্ব হচ্ছে, তবুও আমরা আশাবাদি।’
বিএডিসি (বীজ) এর সিনিয়র সহকারী পরিচালক আওলাদ হোসেন জানান, গতবছর থেকেই কৃষকদের ২৮ জাতের প্রতি আগ্রহ বাড়া শুরু হয়েছে। বাস্তবতার কারণেই এবার এই চেষ্টা বাড়ানো হয়েছে।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আবু বকর সিদ্দিক ভুইয়া জানালেন, তাঁরা যেখানেই যাচ্ছেন কৃষকদের বলছেন, ২৯ ধান আবাদ করে কেউ যাতে বিপাকে না পড়েন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণে উপ-পরিচালক জাহিদুল হকও একই মন্তব্য করে বললেন, বেসরকারি কোম্পানীর বীজ বিক্রেতাদেরও পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে, তারা যাতে ২৯ জাতের বীজ হাওরাঞ্চলে এনে বিক্রি না করে।